somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাধহীন স্বাধীনতার গদ্যকাব্য

২৬ শে মার্চ, ২০১৪ সকাল ৯:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চেতনার স্বীকৃতি না পাওয়া ৭১এর সেই সব সন্তানহারা মায়েদের জন্য উৎসর্গীকৃত

সত্তরোর্ধ দৌলতউন নিসা আজ ভোর থেকেই
অনাহারে , বিছানায় উচু হয়ে পিঠ ঠেকিয়ে
জানালার বাইরে ঝকঝকে আকাশ আর
নতুন পাতা ছড়ানো আম গাছটির দিকে
তাকিয়েছিলেন ছলছল চোখে ।
দৌলতের দৃষ্টিশক্তি বয়েসের তুলনায় অনেক তীক্ষ্ণ
ভোরের অশ্রুর ফোটাগুলি শুকিয়ে গেছে বোঝা যায় ।

বুকের উপর ছোট এক খানি ছবির ফ্রেম উপুড়
করে রাখা । তাতে ৭০ সালে তোলা একমাত্র পুত্র
রাহুলের ছবি । সময়ের বিবর্তনে মলিন
আর লালচে হয়েছে ছবিখানি । দেওয়ালে লাগানো
বড় একটি ছবিতে রাহুলের মুখখানি হালকা
দাড়ি-গোঁফে ভরা , লম্বা চুল । ছবিখানি
টাইমস পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করে বড়
করিয়েছিলেন রাহুলের বাবা । রাহুলের বাবাও
এখন রাহুলের কাছে , বড় একা করে দিয়ে গেছেন
দৌলতকে । তারপর থেকে ভাইয়ের বাড়িতে ওর
ছেলে মেয়ে , নাতি পুতির সমাহারে দৌলত অসম্ভব
আদরে থাকেন সবার । দৌলতও সবার ভিতরে
রাহুলকে খুজে বেড়ান , কিন্তু রাহুল নেই ! রাহুল
কখনো আর ফিরবে জেনেও অপেক্ষায় থাকেন ‘মা’ ।

দৌলত আনমনা হয়ে হাতের তর্জনী দিয়ে
নাভিমূলে কিযেন খুঁচিয়ে দেখছিলেন
তার কোঁচকানো চামড়ার ভাজে নাভিমূল খুজে
পেতে ঝামেলাই হচ্ছিল , তবুও খুজছিলেন এবং
একসময় পেয়েও গেলেন । এই নাভির
ভিতরের অংশে জরায়ুতে রাহুল বাঁধা ছিল
দশটি মাস! তখন বেদনানাশক ছিলোনা
ছিল না নার্সিং হোম । দাই এসে
ধারালো বাঁশের ফালি দিয়ে কেটেছিলেন নাড়ি
আর বিচ্ছিন্ন করেছিলেন দৌলত আর রাহুলের
দশ মাসের বাধন । টুকটুকে ফর্সা আর কোঁকড়ানো
চুলের রাহুল সবার আদর সবার ভালবাসা কেড়েছিল ।

ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক বাবার একমাত্র পুত্র
বি এ সম্পন্ন করেছিল বাংলায় , এম এ তে ভর্তি
হয়েছিল ঢাকা গিয়ে । একাত্তর সালের প্রথম দিকে
ঐ যে ঢাকা গেল সেই থেকে রাহুল গত ৩৩ টি
বছর হয় ঘরে ফেরেনি । একাত্তর সালের মে মাসে
হাতবদল হয়ে আসা চিঠিতে তারা জেনেছিলেন
রাহুল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার ট্রেনিং নিচ্ছে ভারতে
সেই থেকে আর কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যায়নি।
দেশ স্বাধীন হয়েছে , সবাই ফিরেছে , শুধু – রাহুল
রাহুল ফেরেনি । কেউ বলতেও পারেনি তার কি হয়েছে ।
পাগলের মতো ঢাকা গেছেন খুজে ফিরেছেন রাহুলের
ডিপার্টমেন্টে , সম্ভাব্য সবখানে । বড়ভাই আমেরিকা থেকে
টাইমস এর কপিখানি পাঠিয়েছিলেন তাতে রাহুলের ছবি
ছাপা হয়েছিল অচেনা আরও অনেকের সাথে রাইফেল কাঁধে।
কোন সেক্টর , কোন ক্যাম্পে ট্রেনিং কিছুই জানতেন না ।
অনেক পরে জেনেছিলেন তার প্রিয় সন্তানের সম্ভাব্য কাহিনী
যুদ্ধ করতে করতে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে বন্দী
তারপর আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি রাহুলের
দৌলত আর করেন নি খোজ প্রিয় সন্তানের কখনো !

একরকম পাথর হয়ে কাটিয়েছিলেন দুই যুগ
রাহুলের বাবাও আগেভাগে চাকরি ছেড়েছিলেন
সন্তানের শোঁকে । অর্থ কষ্ঠ ছিলোনা ধনাঢ্য
পূর্বপুরুষদের কারনে । রাহুলের বাবা আগেই
চলে গেলেন দৌলত কে সম্পূর্ণ একা করে দিয়ে ।
বিশাল বাগান, গাছপালা আর পুকুর ওয়ালা বাড়ীটি
ভাড়া দিয়ে ভাই দৌলতকে নিয়ে এলেন ঢাকায় নিজের
বাড়িতে । প্রায় তিন যুগের কাছাকাছি এসে অনেকে
হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল শহীদ মাতা , বীর খেতাব
দেয়া হবে , আসুন জলদি চলুন বলে । মাসিক
ভাতাগুলোও পাওয়া যাবে আর মিডিয়াতে যা দারুন
কাভারেজ হবেনা , একেবারে ফাটাফাটি । দৌলত
স্তম্ভিত , মৃত ছেলের চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে
আহারাদি হবে? এতদিন বাদে হটাত রাহুলকে
বাদ দিয়ে তার খোজ পড়ল কেন ?

স্বামীর বিশাল সম্পত্তি রাহুলের নামে ট্রাস্ট
করেছেন । দৌলতের ভাই ই যথেষ্ট দৌলতকে
দেখাশুনা করার । পুত্র হত্যাকারীদের দোসরদের
কাছ থেকে অনুকম্পা , সাহায্য ?

কক্ষনোই নয় !!

বছরের দুটি দিন এলে দৌলত ভেঙ্গে পড়েন
অনাহারে থাকেন , সবাই তাকে এ দুটি দিন
সকালে একা কাটাতে দেন , তিনিও তাই ভালবাসেন
বিকালে নাতি পোতারা প্রায় চ্যাং দোলা করে
দৌলতকে নিয়ে বেরুলেন মেঘনা নৌ ভ্রমনে ।
ঈষৎ তাপ মেশানো চৈত্রের হাওয়া মেঘনা
নদীতে ভালোই লাগছিল । হটাত ছোট্ট একটি
জায়গায় দেখলেন খুব উচু উচু বাঁশে
চল্লিশ পঞ্চাশটি পতাকা পতপত করে উড়ছে
এই গ্রামাঞ্চলে , বোধকরি হাটবাজার হবে ।
ওদের স্বাধীনতার প্রতি ভালবাসার প্রকাশ
পতাকা উর্দ্ধে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় মুগ্ধ দৌলত,
তিনি ছোট্ট নাতিটিকে কোলে টেনে নিলেন
অন্য সবাইকে বললেন তাকে ঠাণ্ডা ডাবের পানি দিতে
নাস্তা দিতে , তার খুব খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে -----
সারাদিনে এই প্রথম তার খেতে ইচ্ছে করছে ।

প্রিয় পতাকা ধন্য তুমি রাহুলের মায়ের আঁচলেতে !!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১৬ সকাল ৯:১৭
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লবের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনটা বোধহয় সরকারে নয়- আমাদের আচরণে!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫

৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লবের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনটা বোধহয় সরকারে নয়- আমাদের আচরণে!

আমাদের মধ্যে বৃহত্তর একটা অংশের বদ্ধমূল বিশ্বাস- আইন মানতে হবে না, নিয়ম মানা বোকামি, সরকারের সবকিছুই মানুষের মৌলিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমাম মাহদী আসার আগে নেতৃত্ব দাবী করা সকল দলই গোমরাহের পথে আছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৭

সেক্যুলার দলকে সমর্থন ততো দিন পর্যন্ত দিয়ে যেতে হবে, যতো দিন ইসলামী দলগুলো 'যোগ্য' না হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের কোন ইসলামী দলই দেশ চালাতে সক্ষম নন।

ইসলামে বলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেগা মিয়া

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০



সকাল ৭ টা। আশ্বির্নের মাঝামাঝি।
হাজী শারাফত আলীর ছেলে মন খারাপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। তার ভাই বোনদের কথা মনে পড়লেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ চোরের উপরে বাটপারি!!!!!

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৭



টুং করে একটা নোটিফিকেশান আসলো।

ফাৎনার নড়াচড়া দেখে বুঝলাম, বড়শিতে একটা 'ব্রাউন ফিস' ধরা পড়েছে। এখন টেনে তোলার আগে খানিকটা খেলতে হবে। মৎস্য শিকারীরা জানে, এই কাজটা খুবই রোমাঞ্চকর... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাওরাত ও যুক্তি দিয়ে কথা বলুন - ইহুদীরা আত্মসমর্পন করবেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:০০

গানঃ 'My Name Is Palestine' - Garth Hewitt
লিংকঃ Click This Link



জ্ঞানী মানুষ যুক্তি পছন্দ করেন। জ্ঞানী মানুষ অজ্ঞানতার বেড়াজাল থেকে নিজেকে বের করে যুক্তির মাপকাঠিতে নিজের জীবনকে সাজায় বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×