দুটি ভিন্ন ধর্মের ঈশ্বর অনুরাগী মানুষেরা একই ছাদের নিচে আলাদা সময় নির্ধারিত প্রার্থনা করছে গত ৫ টি শতাব্দী ধরে। হিন্দুরা তাদের পুজা অর্চনা করে ছয়দিন আর মুসলমানেরা শুক্রবার তাদের নামাজ আর বিশেষ করে জুম্মার একত্রিত নামাজ আদায় করে।অযোধ্যা বিতর্কে একটি সমাধান সাজেশন হিসাবে অধিকাংশ ভারতীয়র চোখের আড়ালে থাকা গিরিমঠ নামের ছোট্ট জায়গা যা বাগালকোট জেলার কামাথাগি গ্রামে অবস্থিত । বাগালকোট ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত । সম্প্রতি সময়ে ডেক্কান হেরালড এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রার্থনাগৃহের খবর দিয়েছে তাদের পত্রিকায় । তারা গিরিমঠের এই প্রক্রিয়ায় অযোধ্যার সমাধান কামনা করেছেন ।
এবার আসুন ঠিক কিভাবে এই অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছিল তা জানি ।
আদিল শাহ ২ একদিন এই পথে যেতে নামাজের সময় হয়ে গেলে দেহরক্ষীদের আদেশ দিলেন উপযুক্ত জায়গা খুজে নিতে । রক্ষীরা পাশেই একটা উপযুক্ত জায়গা পেল কিন্তু বাদ সাধল সেখানে যোগাসনে ধ্যানমগ্ন মারালু শঙ্কর দেভালু , আল্লামা প্রভুর অনুসারী । দেভালুর কঠিন ধ্যান ভাঙ্গার চেষ্টা ব্যার্থ হলে রক্ষীরা দেভালুকে উঠিয়ে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেবার উদ্যোগ নিতেই সেখানে হাজির আদিল শাহ । তিনি রক্ষীদের সরিয়ে নিজেই বসে রইলেন দেভালুর ধ্যান ভাঙ্গার অপেক্ষায় । ধ্যান ভাঙ্গলে দেভালুর দেওয়া লম্বা ভাষণে জ্ঞ্যান , প্রজ্ঞ্যা পারমিতায় মুগ্ধ আদিল শাহ ওখানেই একটি যৌথ প্রার্থনা গৃহ গড়ার ঘোষণা দেন । আদিল শাহ একটি চুক্তিপত্রে সাক্ষরও করেন যার তাম্রলিপি ঘোড়সওয়ার দিয়ে ধর্মযাজকের কাছে পৌঁছে দেন । ব্যাস এটাই শুরু । গত পাচশ বছর ধরে কোন বিবাদ ছাড়াই স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিমরা এটাকে মন্দির ও মসজিদরুপে ব্যাবহার করছে । সপ্তাহের ছদিন হিন্দুরা এটাকে তাদের মন্দির হিসাবে ব্যাবহার করে এবং শুক্রবার ইবাদতের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় মুসলিমদের জন্য । এই প্রার্থনা গৃহের বাইরের দেওয়ালে শিব , নন্দী ও গনেশ দেবতার মুরাল প্রতিকৃতি এবং ভিতরে দেভালু,আদিল শাহ ও আদিল শাহ্র স্ত্রীর প্রতিকৃতি আকা আছে । বিভিন্ন ধর্মের লোকেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধন, ঐক্য ও সমতা আনার প্রচেষ্টার জন্য আদিল শাহ্র যথেষ্ট সুনাম রয়েছে ।
মুল নাম ইবরাহিম আদিল শাহ -২ । ১৫৫৬-১৬২৭ পর্যন্ত বাহমানি সুলতানদের আদিল শাহ রাজ্যের পঞ্চম রাজা হিসাবে কর্ণাটক ও আশপাশের কিছু এলাকা নিয়ে শাসন করেছেন । তিনি “জগতগুরু বাদশাহ” হিসাবে বেশি পরিচিত । তার লেখা বেশ কিছু কিতাবও আছে যেখানে সরস্বতী ও গনপতির প্রশস্তি গাওয়া হয়েছে ।আদিল শাহ্ একজন গানের ভক্ত ছিলেন এবং মাঝে মধ্যেই যন্ত্রী ও গায়কদের নিয়ে আসর বসাতেন । নিজেও কিছু যন্ত্র বাজানোতে পারদর্শী ছিলেন ।মনে হচ্ছে তিনি সুফিবাদি ও নিজামুদ্দিন আউলিয়ার অনুসারী ছিলেন । হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সেতুবন্ধনের একটি প্রচেষ্টা আদিল শাহ এর লেখার মধ্যে প্রতিফলিত। তার রচিত বইএর মধ্যে কিতাব ই নব রস(নবম রস) উল্লেখযোগ্য।এই কিতাব খুললেই প্রথম শিক্ষার দেবী সরস্বতীর প্রশস্তি পড়ে নিতে হয় । কিতাবটিতে আদিল শাহ রচিত ৫৯ টি কবিতা এবং ১৭ টি বিভিন্ন লেখা আছে ।
গিরিমঠে রথযাত্রা হয় গনেশ পুজার চারদিনের দিন।যদি তা শুক্রবারে পড়ে তবে রথযাত্রা হয় পিছাতে হয় নয় এগিয়ে দিতে হয়।মুসলমানেরা এই রথযাত্রায় প্রচুর অর্থদান করে থাকে । আদিল শাহের তৈরি নিয়ম কানুনে এখনো পর্যন্ত এই প্রার্থনা গৃহ চলছে । তার তৈরি আদেশনামার তাম্রলিপি কোটেকালের দেশাই পরিবারের কাছে সংরক্ষিত আছে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মার্চ, ২০১৬ সকাল ৯:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



