পৃথিবীর শতকোটি ডায়াবেটস বন্ধুদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত
১৯৯৯ এর নভেম্বরে এক দুপুরে হটাৎ করেই বা দিকটা অচল হয়ে গেল। সামনেই ক্লিনিক আর তাই মাত্র ১০ মিনিটে চিকিৎসা পেলাম নিজের বিছানাতেই শুয়ে । ১৫/১৬ মিনিটে প্যারালাইজ হওয়া হাত পা সচল হল। ঘুমিয়ে গেলাম ইঞ্জেকশনের প্রভাবে। রুটিন চেকআপে ডায়াবেটিস ধরা পড়ল। দুর্ঘটনার সময় রক্তচাপ ২০০/১১০ ছিল।
খুলনাতে তখনও স্ট্রোক বিষয়ক ডাক্তার ছিলনা। একজন সিনিয়র ডাক্তার প্রেসার ও রক্ত জমাট না বাধার ওষুধ দিলেন।সিগারেট খেতাম খুব সাথে সীমিত পরিমান শক্ত পানীয় ।সব বিসর্জন দিলাম এবং মানসিক দিক দিয়ে ভেঙ্গে পড়লাম। কলকাতায় বিড়লাতে চেকাপ হল। টি এম টিতে সাধারন মাত্রার সমস্যা ধরা পড়ল। আমি টার্গেটের ৯০% পরিপূর্ণ করেছিলাম। কিন্তু ডাক্তার আমার মাথার কোন চিকিৎসা করলেন না । প্রেসক্রিপশনে লেখা রিসেন্ট হাইপারটেনশন ক্রাইসিস। ওই ওষুধ বহাল রইল । উপদেশ একটি “লবন খাওয়া যাবেনা”। পাতে লবন নিষিদ্ধ । ফিরে এলাম। কিন্তু রক্তচাপ মাঝে মধেই চাড়া দিয়ে উঠে। একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ পাওয়া গেল। তিনি আমায় ওষুধ বদলে দিলেন । নিফিন ছেড়ে অ্যামডোকল আর নাইট্রোমিনট আমার বিপদমুক্ত করল। ডায়াবেটিক সমিতিতে যাই আর রক্ত দিয়ে আসি। প্রতিদিন বিকালে হাটি । রক্তের সুগার স্বাভাবিক। খাদ্যখাবার , ঘুম তথা তাবৎ জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলো।মানসিক আঘাত থেকে পরিত্রান পেতে ডাক্তার আমায় একজন মানসিক চিকিৎসকের কাছে পাঠালেন। বয়স্ক ডাক্তার সব দেখলেন,শুনলেন এবং আমায় একটি বেডে শুইয়ে দিয়ে হাত মুঠ করে কি ভাবে নিজ পেশির ব্যায়াম নিজে করে পেশিতে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি আর ক্লান্তি ভর করার কায়দা শেখালেন। হাত থেকে পা, উরু, তলপেট , বুকের মাসল , মুখ, চোখ,কপাল সব ওই শোয়া থাকা অবস্থাতেই রক্ত সঞ্চালন করিয়ে দিলেন। এর মধ্যে তিনি মৌখিক থেরাপি দিচ্ছিলেন। তিনি আমায় বললেন ভাবুন আপনি ভাগ্যবান, অনেক কোটি লোক পৃথিবীতে অচল হয়ে আছে, যন্ত্রনা পাচ্ছে , আমার তোঁ তেমন কিছু নেই, আমি চলছি ,খাচ্ছি এবং কর্মক্ষম । ওদের অনেকের তা নেই। কথার প্রতিধ্বনি আর সেলফ মাসল ব্যায়াম চলছে। তিনি আমায় সেন্ট্রাল নার্ভ সিস্টেমকে বিশ্রাম দেবার ওষুধ দিলেন এবং বললেন আপনাকে আর আসতে হবেনা।রাতে ঘুমানোর আগে ও ভোরে বিছানাতে শুয়েই এই ব্যায়াম কাজে দিল। ডায়াবেটিকে মেনটাল শক খুব তীব্র এবং এতে নতুন ভাবে আক্রান্তরা ভেঙ্গে পড়েন।একটা মৃত্যু ভীতি কাজ করে এবং গত ১৪ বছরে প্রতিদিনই একবার করে মরি।ব্যাস্ততা ভীষণ দরকার একজন ডায়াবেটিক রোগীর। প্রথম চিকিৎসাই হওয়া উচিত মানসিক দৃঢ়তা ফিরিয়ে আনা সাথে ঔষধ যদি লাগে । ১ বছরের মাথায় কাজে লেগে গেলাম চীনাদের প্রকল্পে বাড়ির কাছেই। বেশ ব্যাস্ততা আমায় ভুলিয়ে দিল আমার অসুস্থতা।দু বছর বাদে ঢাকা এলাম এবং একাকী জীবন শুরু হল। ভয় ব্যাপারটা আগেই দূর হয়েছিল এবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম। নতুন কাজে চীনে যাতায়াত বেড়ে গেল এবং বেশ ভালো লাগলো। ২০০৫ এ নিজেদের বাড়ি ভাড়া দিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে আমার স্ত্রী ঢাকা চলে এলেন । আমরা নতুন জীবন শুরু করলাম কারন খুলনাতে তখনও ও লেভেল এক্সাম সেন্টার হয়নি আর কন্যার ইংরেজি অত ভালো ছিলনা কারন ভালো ইংরেজির শিক্ষক নেই। বাচ্চাদের কাছে পেয়ে আরও ভালো লাগলো। যদিও ২০০২তে আমার এন জিও করে বিপজ্জনক কিছু পাওয়া গেলনা তবে ডাক্তার বেশ কিছু সতর্ক বানী দিলেন । ২০০৮এ মনে হল শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা। হার্ট ফাউনডেশন আর বারডেম করলাম।হার্ট ফাউনডেশন ইকোতে ওয়াল মোশন থিক বলে জানাল। বেটা ব্লকার শুরু হল এবং ওষুধের মাত্রা বাড়ল। বারডেম আমায় ইন্সুলিন ধরিয়ে দিল। কেউ যদি হেটে, খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন তবে ইনসুলিন নেবেন না । আমার অভিজ্ঞতা খুব বাজে। এখন উচু মাত্রার ইনসুলিন আর অন্যান্য ঔষধে চলছি কারন আমার শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তা নাকি কাজে দিচ্ছেনা। ওজন বেড়েছে ২০ কেজি।এজন্যেই মনে হয়েছে র্যাঠনডোম টেস্টে ১১.৭ মাত্রার সুগারে ইনসুলিন ঠিক হয়নি।ক্রিয়েটিনিন ও ইউরিন নরমাল কিন্তু ডিসচার্জ রিপোর্টে ইউরিন ইনফেকশন লেখা আছে, কাকে কি বলব।ইনসুলিন প্রপোস করলে একমাস সময় নিন , তিন বেলা গম ভাঙ্গানো রুটি সব্জি চালান, বিকাল বা সন্ধ্যায় হেটে ঘামুন । একমাস বাদে আবার পরীক্ষা করুন , আমার বিশ্বাস আপনি মেডিকেশন ছাড়াই চলতে পারবেন।আমিষ কম খেয়ে ক্রিয়েটিনিন নিয়ন্ত্রণে আনুন।যাদের কিডনিতে, লিভার,ইউরিনে সমস্যা তাদের জন্য ইনসুলিন মাস্ট।কেনা আটা বাদ দিন কারন আমাদের ব্যাবসায়িরা আটাতে আলুর স্টার্চ মেশাচ্ছে যা নিউজিল্যান্ডে বিনি পয়সায় পাওয়া যায়।২০১৩ তে কিছু ডাক্তার মিলে আটা পরীক্ষার এই আকামটি করেছিলেন।১৯৯৯ তে ওজন ছিল ৭৩ কে জি । কারো উপদেশে তেলাকচুর পাতা মাছের সাথে খেলাম এবং ১ বছরেই ১৩ কে জি ওজন কমিয়েছিলাম। আবারো শুরু করব ভাবছি।শাকসবজি এবং সামুদ্রিক মাছ খাই। ডাল বন্ধ ইউরিক এসিড বাড়ার জন্য। খাচ্ছি খুব সিম্পল এবং কম কিন্তু হাটাতে অনিয়ম হচ্ছে।ওজন কমাতে পারলে উপকার পাব তবে তা হেটে হবেনা প্রমান হয়ে গেছে। ঘুমের ওষুধ খাই এবং চেস্টা করি কোথাও গেলে দুচার কিলো হেটে যেতে। ওষুধ খরচ বেড়েছে ।মিষ্টি খাই অ্যাস্পারটেম দিয়ে সেমাই,জরদা, পায়েস ইত্যাদি, আসল মিষ্টি কদাচিৎ খাই । একসময় রিচফুড খেতাম না , এখন খাই সতর্ক হয়ে মাঝে মধ্যে । বিদেশ থেকে চকলেট আসে, দারুন তার স্বাদ। করলা প্রধান খাদ্য সাথে মাছ। সিজনাল সব সব্জি খাই , যেটাতে শর্করা আছে সেটা বাদ দেই। করল্লাতে শর্করা আছে জানলাম সেদিন ।সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকছেই। ওটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়না। কন্যা ভালভাবেই মাস্টার্স শেষ করেছে ফারমাসিতে এখন ওয়েটিঙে একটি ভালো কোম্পানিতে জয়েন করার। ছেলে ও এবং এ লেভেল এক্সট্রাঅরডিনারী ফলাফল নিয়ে আহসানুল্লাহতে পড়ছে।আমার স্ত্রী শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন বেইজিং থেকেই , এখনো করছেন । আমার জেনেটিক ধারায় ডায়াবেটিস হয়েছে অর্থাৎ বাবার ডায়াবেটিস ছিল।আমরা গুষ্টিশুদ্ধ ভোজনরসিক এবং আমাদের খাবার ব্যাপারে লোভ খুব বেশী এবং জিহ্বাটা লম্বা । ডায়াবেটিক রোগীরা খুব মিথ্যাবাদী হয় বিশেষ করে খাওয়া দাওয়ার খবর লুকানোর ব্যাপারে। ডায়াবেটিসের সাথে হার্টের অসুখ বেশ ভয়ঙ্কর । খাবার নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সময়ে খাওয়া ও ঘুমানো এবং ঔষধ আপনাকে ভালো রাখবে। অসামাজিক হয়ে যেতে হয় এ সব অসুখ হলে। সন্ধ্যার মধ্যে বাসায় ফিরে হাটতে বেরুনো , ঠিক সময়ে খাওয়া আপনাকে সন্ধ্যার সব অনুষ্ঠান উপভোগ বঞ্চিত করবে। দাওয়াতে গেলে দেরিতে খাবার হাইপোতে নিয়ে যাবে, মরন আমার, কি জ্বালা !আমরা অবশ্য ব্যাগে সব সরঞ্জাম নিয়ে যাই। বিস্কিট ও একবোতল পানি নিত্য সঙ্গী । আমি দুরের গ্রামে প্রকল্পতে কাজে যাই এবং বেশ ভালই থাকি। গা হাত পায়ের ব্যাথা হতো ।গত কিছুদিন আয়ুর্বেদিক খেয়ে মনে হল আরথারাইটিসের ব্যাথা আর নেই। আয়ুর্বেদিকে বেশ কাজে দিয়েছে সাথে ওজন কমানোর যে গাছগাছড়া দিয়েছিল তাতে আমার প্রস্টেটের ব্যাথা নিরাময় হয়েছে । আমার কেরালার ডাক্তার আমায় বেশ সেবা দিলেন, এই ডাক্তার কিন্তু আয়ুর্বেদিকে মাস্টার্স । উনি আমায় ঔষধ দেবার সময়ে দুটো জিনিস নিষেধ করলেন । আলু এবং চা পান। কি বিপদ। আলুতে বিপজ্জনক মাত্রার শর্করা থাকে আর চায়ের ক্যাফেইন গাছগাছড়ার ওষুধের গুনাবলি নষ্ট করে ।গত ১৪ বছরে ফ্রোজেন শোলডার দুহাতেই হয়েছে এবং দ্বিতীয়বার সি আর পি তে থেরাপি আর আলট্রা ভায়োলেট রে নিয়ে সুস্থ হয়েছি । সবচে দুর্ভাবনার বিষয় হচ্ছে আমার হাড়ের ক্ষয় খুব তীব্র। সি আর পি মিরপুর আমায় এক্সরে দেখাল পিঠের হাড়ের বিপজ্জনক ক্ষয় আবার নতুন হাড়ের জন্ম। মাঝ বরাবর ডিস্ক ফাকা হয়ে গেছে যার কারনে কাঠের চেয়ার ছাড়া উপায়হীন , সোফা, বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসা নিষেধ। ওরা ভালো কিছু ব্যায়াম শিখিয়ে দিল । ভালো আছি , থাকতে হবে ছেলেটির জন্য। মেয়ের বিয়ের পরিকল্পনা আছে সামনেই, পাত্র ঠিক হয়ে আছে। বয়স আর অসুখ এই দুটো এইসব দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়।তারপরও জীবন থেমে থাকে না । কাজের ভিতর থাকলে আরামে থাকা যায় । ঝামেলার মধ্যে যাইনা।ডায়াবেটিসের জীবন সরলিকরন করতে হয় , হাসির বন্ধু জুগিয়ে আদিরসযুক্ত আলাপে প্রান খুলে হাসতে হয় আর কার কত অসুখ বেশী আছে তার নিকেশ চলে।গান শুনি এবং রাতে শোবার সময় অল্প আওয়াজে টাইমার দিয়ে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাই, দারুন একটা পন্থা।কতশত রোগ শোকের ওয়েব সাইটে সমাধান খুজে বেড়াই কিন্তু প্রয়াত ডঃ ইব্রাহিমের দিয়ে যাওয়া উপদেশ যা বারডেমের বইতে আছে ,মনে হয় ওটাই সর্বোত্তম । উষ্ণ মণ্ডলীয় এলাকার সবচে বড় রতনরাজি হচ্ছে শতপ্রকার সবুজ সব্জি ।
এভাবেই জীবন পার হবে এবং একদিন ঘুমিয়ে পড়তে হবে কোন সকাল আসা ছাড়াই, সূর্য আর উদিত হবেনা আমাদের আকাশে !!
দূরে কোথাও বাজবে বিটোফেনের সিম্ফনি, বিদায়ের সুরে !!!
https://www.youtube.com/watch?v=De1NCk3hhqw
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৫:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



