

চারুকলায় ক্লাসে যাওয়া আসা হলে বসে আড্ডা মারা চলছে । এতদিন বাদে প্রায় ৪৫ বছর হল মনে পড়ছে না , কে আমায় কাজি আলাউদ্দিন রোডে হাজির বিরিয়ানি খাওয়াতে নিয়ে গেল । সম্ভবত আমার বড় ভাই । একদিন মনে হল আরেকবার যাওয়া উচিত তবে কাউকেই পেলাম না সঙ্গী হিসাবে । কেউ ১৪ আনা দিয়ে এক প্লেট বিরিয়ানি খাবে না । আমায় বাই সাইকেল কিনে দিয়েছেন বড় ভাই । ওটা নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরি । নভেম্বরের সন্ধ্যায় সাইকেল চালিয়ে কাজি আলাউদ্দিন রোডে হাজির । তখনো ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশন দালান ছিল , ছিল রেল লাইন । তবে আলাউদ্দিন রোড থেকে নীলক্ষেত হয়ে সোনারগাঁ মোড় হয়ে তেজগাঁ পর্যন্ত লাইন তুলে ফেলেছে কিন্তু রাস্তা তৈরি হয়নি । মানুষ হেটে চলাচল করত খোয়া ভরা রাস্তা দিয়ে , গাড়ি যেত না । আমি হাইকোর্ট হয়ে ডানে গিয়ে পৌছুলাম হাজির বিরিয়ানির সামনে । দোকান ভর্তি মানুষ বসে কিন্তু খাবার খাচ্ছেনা কেউ । বারান্দায় দাঁড়ানো সাদা পিয়নের পোশাক পরা একটি লোক আমায় বলল এই ব্যাচ খাইয়া শেষ করলে আপনি বইসেন । রাস্তার অপর পারে সাইকেল রেখে তালা দিলাম । একজন টুপি মাথায় লোক এসে বারান্দায় রাখা ডেগের সামনে বসে ঢাকনা উচিয়ে ধোয়া ওঠা বিরিয়ানি বাড়তে লাগলো প্লেটে । খুব দ্রুত তা টেবিলে সারভ হতে লাগলো । একজন উঠে আসতেই আমি বারান্দায় দাঁড়ালাম । আমাকে বলা হল বসতে । আমার টেবিলে বাকি তিনজন খাচ্ছে তখনো । ওদের শেষ হতেই টেবিল সাফ করল একজন । হাত ধুয়ে নিলাম বেসিনে সাবান দিয়ে । আহা কি মজার বিরিয়ানি ! সাথে কাচা পেয়াজ এক টুকরো আর কাচা মরিচ আছে । সব মিলিয়ে না খেলে বিরিয়ানির স্বাদ বোঝা মুশকিল । বিরিয়ানি , পিয়াজ, কাচা মরিচের ঐকতান মুখের ভেতরে মাড়িতেই টের পাওয়া যায় । কেউ কেউ দুই প্লেট খাচ্ছে । আমার এক প্লেটেই পেট ভরে গেল । খাসীর হাড়খানা চুষে চিবিয়ে ক্ষান্ত হলাম । হাত ধুয়ে হাজি সাহেবের সামনে দাড়িয়ে একটি টাকা বাড়িয়ে দিলাম , তিনি আমায় দু আনা ফেরত দিলেন । পাশেই পানের দোকান । মিষ্টি পান মুখে দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম । মিষ্টি পানটা দারুন ছিল । আমি রাস্তার অপর পারে দাড়িয়ে ধোয়া উড়াচ্ছি আর দোকান খানা দেখছি । লোহার কাস্টিং এর ডিজাইন করা খাম্বা আর ওপরে টিনের ঘর । জনা বিশেক লোক বসতে পারে । মাগরিবের নামাজ শেষ হলেই ডেগ খুলবেন হাজি সাহেব । পরে অবশ্য অন্যরাই বিরিয়ানি তোলে আর হাজি সাহেব পেমেন্ট নেয় । মাস দুয়েক পরে আমার সহপাঠীকে পটিয়ে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে হিজ হিজ হুজ হুজ সিস্টেমে খেতে এলাম । এবার হাজি সাহেব চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন আপনেরা তো ইনভারসিটির না ? হ্যা সুচক জবাব দিলাম । উনি চেচিয়ে বয়স্ক বয়কে বললেন এই ছাত্ররা আইলে আগে বয়াইয়া দিবি । গম্ভীর বয় মুখে হাসি টেনে মাথা নাড়লেন । ইনভারসিটির স্টুডেন্টগো আলাদা প্রেস্টিজ পুরান ঢাকায় ।
অনেকদিন যাওয়া হয়না ওদিকে । শ্বশুর বাড়ি ওদিকে হওয়ায় মাঝে মধ্যেই একগাদা বিরিয়ানি নিয়ে যেতাম । ততদিনে হাজি সাহেবের ছেলে বসেছে , দোকান পাল্টে দালান বানিয়েছে । পিকিং থেকে ফেরত এসে শেষ কবে গিয়েছি মানে পার্সেল এনেছি মনে নেই তবে এখনো মিস করি । হাজি সাহেব প্রয়াত , তাকে খুব মনে পড়ে আমাদের মর্যাদা দেবার জন্য ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০২০ রাত ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



