somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাবার সেবা

১৯ শে জুলাই, ২০২২ রাত ৯:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডাক্তার আমায় ফানেল হোল্ডারে চেপে ধরে স্পিরিট ল্যাম্প জ্বালিয়ে বললেন পটে বাবার ইউরিন ধরতে । ফানেল আধা ভরে একটা তরল জাতীয় কিছু বোতল থেকে মিশিয়ে জাল দেওয়া শুরু করলেন । মিনিটেরও কম সময় জ্বালিয়ে ল্যাম্প নিভিয়ে ফানেল ঠাণ্ডা করে এবার আমায় বললেন প্রস্রাব কেমন রঙ হয়েছে দেখেছ ? এবার সব ফেলে ধুয়ে একটা কাগজে টিক দিতে হবে ঠিক কি রঙ হবে । গাড় ইট , হাল্কা লাল , সবুজ ইত্যাদি । সকালে এবং বিকাল ৩টায় দুদফা এটা করতে হবে । বাবা প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় । ডাক্তার প্রতিদিন সকালে আসেন বাবার প্রেশার , তাপ মেপে বাবার সাথে কথা বলেন বাবা হাউমাউ করে কিছু বলেন কিন্তু তা কারো বোধগম্য নয় । আমি ভোরে এমনিতেই উঠি কারন ৭টায় আমার স্কুল । প্রথম কাজ বাবার পেসাব কালেক্ট করা । বাবার পেসাব কালেক্ট করতে প্রথম প্রথম খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম , আস্তে ধীরে সহজ হয়ে এলো ব্যাপারটা । দ্রুত খেয়ে ছুট লাগালাম স্কুলের দিকে । ক্লাস সেভেনের ছাত্র আমি । ক্লাস সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হয়ে ছুটি । আগে রাস্তায় কিছুক্ষন আড্ডা মেরে বা পশ্চিমের মাঠে বল খেলে বাড়ি ফিরতাম । এখন প্রায় সব কিছু বন্ধ । ফিরে গেলে মা বাবার পাশে গিয়ে তাকে দুজন মিলে টেনে ওঠালাম , তারপর আবার দুজন মিলে দাড়া করিয়ে বাবার পুরো ভর আমাদের উপর নিয়ে টুক টুক করে হেটে বারান্দায় একটা চৌকির উপর বসিয়ে মা তাকে হাল্কা গরম পানিতে শরীর ধুয়ে দিলেন । আমি সাবান দিয়ে পিঠটা ডলে দিলাম । এভাবেই বাবাকে গোসল করিয়ে আবার কসরত করে বিছানায় । গৃহকর্মী বিছানার চাদর পাল্টে দিয়েছে । আমার ছোট ভাই , মেজ ভাই কেউই আসেনা এইকাজে হাত দিতে কারন আমি তার অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত একান্ত সঙ্গী ছিলাম । আমাকে নিয়ে তিনি বাজারে লুকিয়ে মিষ্টি খেতেন , আমিও খেতাম , তারপর আমার হাতে ৪ আনা দিয়ে বলতেন কাউকে না বলতে । তার কি হয়েছে আমি জানতাম না তবে এসব অসুখে মিষ্টি বন্ধ , ভাতের বদলে রুটি ইত্যাদির ফরমায়েশ ডাক্তার আগেই দিয়েছেন । তিনি শোনেননি । তারপর একদিন তিনি আমার উপর এলিয়ে পড়ে বললেন আমাকে ধর । কুলি আর বাজারের দোকানদাররা সবাই উচু করে ঐ বিশাল শরীরটা রিকশায় তুলে দিল । সেই থেকে জানলাম বাবার ডায়াবেটিস হয়েছে । বাবা ক্রমশ ক্ষিপ্ত স্বভাবের হয়ে গেলেন । বাহাত দিয়ে আমার মুখে খামচাতেন এবং আমার মুখ রক্তাক্ত হতো । তিনি পরে কাছে ডেকে বা হাত দিয়ে বুলিয়ে দিতেন এবং উচ্চস্বরে কাঁদতেন । বিকাল ৩টায় আবারো পেসাব চেক এবং আমার ছুটি । আমি একটা গনতান্ত্রিক আবহ পেয়ে গেলাম এবং বড় মাঠ আর পার্কে গিয়ে ম্যাজিক দেখতাম বা বল খেলতাম । তবে সন্ধ্যা হলেই বাসায় ফিরে অজু করে মাগরিবের আজান দিয়ে বাবার পাশে বসে নিয়ত পড়তাম এবং স্বর উচু করে নামাজ আদায় করতাম । বাবা আমার সাথে সাথে ইশারায় নামাজ আদায় করতেন । আজানের ডিউটিটা বেশ আগেই পালন করতাম এবং একসাথে নামাজ আদায় বাধ্যতামুলক ছিল । আগে বাবা ইমামতি করতেন এখন আমি করি বাবা আমার সাথে নামাজ আদায় করেন । মা ই বাবার খাবার দাবার সামলাতেন । সন্ধ্যার পর আমি বাবার দু পা টিপে দিতাম যা বাবা সুস্থ থাকতেও করতাম ।
আস্তে ধীরে বাবা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং ৯ মাস ভুগে একদিন আমাদের দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন । আমরা তার মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে তার ইচ্ছা মত জায়গায় দাফন করলাম । বাবাকে কবরে শুইয়ে এতো কেঁদেছিলাম যে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল । আজ ৫২ বছর পরও বাবা আমার কাছে সজীব এবং অমলিন ।


কপিরাইটঃশাহ আজিজ । জুন ২০২২ গল্প কবিতা ডট কমে প্রকাশিত ।।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০২২ রাত ৯:৩২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পেটে লাথি মারলে, স্লোগান তো উঠবেই !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৬


ভয়ের কিছু নেই। এখনো পরিস্থিতি খারাপ হয়নি । তবে সাধু সাবধান। দেশ জুড়ে স্লোগান দেওয়া শুরু হলে সবকিছু ভেঙে পড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না।সরকার এখন ঢাকা সহ দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামের জ্ঞানদীপ : যুক্তির আরব্য-ফারসী নবযাত্রা প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য -৩য় পর্ব

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:১৭

জাতীয় জন্মসনদে ভুলের ভূত আর সাভারের জালিয়াতি চক্র: সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কি কোনোদিন থামবে না?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০০



আজ ৬ অক্টোবর, জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে—‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। অথচ বাস্তবতা যেন এই স্লোগানের একদম উল্টো! সরকারি নথিতে যখন সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ, উদ্বাস্তু এবং রোহিঙ্গা

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪২



দেশভাগের অনেক পরে আমার জন্ম।
আমি দেশভাগের ইতিহাস জানি। দেশভাগের পরে যা হয়েছে, অতি মন্দ সব ঘটনা ঘটেছে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজার হাজার নারী নির্যাতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এদেশে এখন শেখ হাসিনা প্রয়োজন- নাকি আমরা তাঁর সময়ের কিছু বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করছি?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৭


এদেশে এখন শেখ হাসিনা প্রয়োজন- নাকি আমরা তাঁর সময়ের কিছু বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করছি?

একটা সময় ছিল- শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করলেই কারও চোখে ক্ষোভ, কারও মনে শ্রদ্ধা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×