somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যন্ত্রনাময় বার্ধক্য

২৭ শে আগস্ট, ২০২২ সকাল ১০:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ট্রেনে উঠে জানালার পাশে সিটটা পেয়ে গিয়ে বসে পড়ে মোবাইলটা বের করে হেড ফোনটা কানে দিয়ে গান শুনছিলাম । আমার সামনের সীটে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসেছিলেন । দুপুরের সময় ট্রেন এ যাত্রী খুব কমই ছিল । হঠাৎ ট্রেন এ টিটি টিকিট চেক করতে আসতে দেখে বয়স্ক ভদ্র লোকটি বেশ ভয় পেয়ে গেলেন । তাঁর হাবভাব দেখে আমি জিজ্ঞাস করলাম ," টিকিট কি কাটা হয়নি আপনার ?"
ভদ্র লোকটি খুব শান্ত স্বরে বললেন ," ট্রেন স্টেশনে ঢুকে যাওয়ায় টিকিট কাটার সময় পাইনি।আর আমার কাছে ফাইন দেওয়ার মতো টাকাও নাই । "
আমি তাঁকে অভয় দিয়ে বললাম , "চিন্তা করবেন না , ফাইন এর টাকাটা আমি দিয়ে দেব । "
আমার কথাটা শুনে দেখলাম, তিনি খুব আনন্দিত হলেন ।
কিন্তু টিটিকে দেখলাম কোন কারন বশতঃ আমাদের কাছে টিকিট চেক করতে না এসে হিজলি স্টেশনে নেমে পড়লো ।
যাই হোক আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম ,"কোথায় যাবেন ?"
বয়স্ক লোকটি একটু ভাবনায় যেন পড়ে গেলেন । তারপর বললেন "হাওড়া যাব ভেবেছিলাম , কিন্তু এবার ভাবছি বাঁকুড়া যাব ।"
তাঁর কথা শুনে আমি একটু অবাক হলাম ।
তিনি বললেন , জানো মা ," আমার নাম বীরেন মণ্ডল , আমি একটা কোম্পানিতে কাজ করতাম । দুই ছেলে আর এক মেয়ে রেখে আমার স্ত্রী মারা যায় । আর বিয়ে করি নি এই ভয়ে যে , সতীন মা এসে আমার বাচ্চাদের উপর অত্যাচার করতে পারে । বাবা হয়েও আমি তাদের মায়ের মতো খুব আদর যত্ন দিয়ে বড় করেছিলাম । যা টাকা রোজগার করতাম ছেলে দুটোর পড়াশুনার পেছনেই খরচ করে ফেলতাম । বড় ছেলে এখন স্কুল মাস্টার, আর ছোট ছেলে ইঞ্জিনিয়ার । মেয়েটাও আমার পড়াশুনায় অনেক ভাল ছিল । কিন্তু তিন জনের পড়ার খরচ চালাতে পারছিলাম না বলে মেয়েকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলাম । বড় ছেলে দাঁতন এ থাকে আর ছোট ছেলে হাওড়া তে । "
আমি বললাম , "তাহলে আপনি ছোট ছেলের কাছে যাবেন ?"
কথাটা শুনে তিনি খুব করুন সুরে বললেন ," দুই ছেলে বিবাহিত , তাদের ছেলে- মেয়ে নিয়ে থাকে । আমাকে তারা ভাগ করে নিয়েছে ।"
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ‘ ভাগ করে নিয়েছে মানে’ ?
মাসে ১৫ দিন বড় ছেলে আর ১৫ দিন ছোট ছেলের বাড়ীতে থাকি, তারা ভাগ করে এই বৃদ্ধ বাবার প্রতি ছেলে হওয়ার দায়িত্ব পালন করছে ।
ছোট ছেলের বাড়ীতে ছিলাম । শরীরটা খুব খারাপ ছিল , কিন্তু ১৫ দিন হয়ে গিয়েছিল । বউমাকে বললাম একদিন পরে যাব । কিন্তু বউমা শুনল না , চলে যেতে বলল বড় ছেলের বাড়ীতে, তা নাহলে আর খাবার মিলবে না । অসুস্থ শরীর নিয়েই আমি বড় ছেলের বাড়ীতে এসে দেখি দরজায় তালা মারা । তারা জানে আমি আসবো ,তবুও কোথাও বেড়াতে চলে গিয়েছে পরিবার নিয়ে । আসলে তারা কেউ এই অসুস্থ বুড়োটার দেখভাল করার দায়িত্ব নিতে চায় না ।
কথা গুলো বলতে বলতে বীরেন বাবুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল ।
আমি তাঁকে সান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না ।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে দুঃখ প্রকাশ করে বললেন , ছেলে দুটোর পরিবর্তে মেয়েটা কে যদি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতাম তাহলে খুব ভালো হতো । মেয়ে বাঁকুড়াতে থাকে । জামাই এর একটা ভুসিমাল দোকান আছে । আর্থিক অবস্থা ভালো নয় । মেয়ে আমার অঙ্গনওয়ারীতে একটা কাজ করে । অনেক বার ডেকেছে , বাবা তুমি আমাদের বাড়ীতে এসে থাকো । ছেলে থাকতে মেয়ের বাড়ীতে গিয়ে থাকা সমাজ ভালো চোখে দেখে না । তবুও মেয়ের বাড়িতেই যাব ভাবছি । আমার কাছে ভালো খাওয়া দাওয়ার চেয়ে একটু ভালোবাসাই অনেক বেশি মুল্যবান । মেয়ের কাছে গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইব প্রথমে ... তার ভাইদের পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য তার পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়ে তার জীবনের স্বপ্ন গুলো ধ্বংস করে দিয়েছি । তখন ভাবতাম , মেয়েরা তো বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়ী চলে যাবে । বুড়ো বয়সে দেখাশোনা তো ছেলেরাই করবে । তাই মেয়েকে আর পড়ালাম না । তার স্বপ্ন গুলো ধ্বংস করে দিয়েছিলাম ।
বীরেন বাবুর কথা গুলো শুনে খুব কষ্ট হচ্ছিল , মনে মনে বললাম , ‘ বাবা মা এর দায়িত্ব ছেলে মেয়ে যতদিন না সমান ভাবে বহন করতে শিখবে ততদিন হয়তো সমাজে নিজেদের ছেলে- মেয়ের প্রতি বাবা মা এর ধারনা বীরেন বাবুর মতই থাকবে।


সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম থেকে সংগৃহীত ( কপি পেস্ট)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০২২ সকাল ১০:৩২
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোরআন , হাদিস ও ফিকাহ মতে ইসলামে সঠিক পথ অনুসরণ প্রসঙ্গ কথামালা ( সাময়িক পোস্ট)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:১৫


“আল্লাহ অভিন্ন ফিকাহ মানার কথা বললে রাসূল (সা.) কোরআন ও হাদিসের মানার কথা কিভাবে বললেন? “ এই শিরোনামে গতকাল সামুতে প্রকাশিত ব্লগার মহাজাগতিকচিন্তার একটি বিশালাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বাসী মানব মনের উপর বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণে ক্বোরান পাঠের ঐশ্বরিক প্রভাব

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:০৯

আমি গত প্রায় ১৮ বছর যাবত আমার বর্তমান এলাকায় বসবাস করছি। স্থানীয় মাসজিদটি আমার বাসা থেকে প্রায় চার মিনিটের মত হাঁটা পথে অবস্থিত বিধায় চেষ্টা থাকে দিনে যতবার সম্ভব, মাসজিদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেঁচে আছি, বেঁচে আছি!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

নতুন জেনারেশনের জ্ঞানগরিমায় যুগপৎ মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে নিজেকে মনে হয় নিতান্তই জেনারেল!
তাহারা কতকিছু যে জানে, জানে না তাহারা যে জানে! তাবৎ দুনিয়ার খবর তাহাদের তালুর চিপায় নিদ্রামগ্ন!
গুগলাব্বার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ ২০২৪: অস্থিরতার অন্তরালে কী ছিল? লেখকীয় বিশ্লেষণ | সমসাময়িক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩৫

ছবি

বাংলাদেশে ২০২৪: ক্ষমতার পালাবদল নাকি গোপন সমন্বিত পরিকল্পনা?

২০২৪ সালের আগস্ট- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অস্থির ও বিতর্কিত অধ্যায়। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে অনেকের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি র‍্যাপ সং কীভাবে সপ্তম শ্রেণীর বইয়ের কবিতা হলো ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:২৭


আজকে জুলাই আন্দোলনের একটা কবিতা পাঠ করলাম যেটা পড়ে মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। এই কবিতা নাকি সপ্তম শ্রেণীর ‘সপ্তবর্ণা’ বইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কবিতার নাম ‘সিঁথি’, লেখক হাসান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×