somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি অসহায় বন্ধুত্ত্ব!.................. অত:পর নিষ্ঠুর বেঁচে থাকা!

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বছর তিনেক আগে আমি ফেনীতে গিয়েছিলাম একবার। ব্যাক্তিগত কারনে আমাকে সেখানে থাকতে হয় কিছু দিন। স্কুল জীবনের দুই বন্ধু রুপম আর সোহাগের বাসায় থাকি।

অপ্রত্যাশিত ভাবে কামরুল নামের এক মোটাসোটা ছেলের সাথে পরিচয় হয়। ক্লাস নাইন থেকে পড়া লিখা বন্ধ তার। ফেনী শহরের ট্রাংরোড এলাকায় একটি বিপনী বিতানে নিজের ফটোস্ট্যাট মেশিন ছিল কামরুলের।এর পর যতবারই ফেনীতে যেতাম ছেলেটার সাথে আমার দেখা হত। কারন নানুর বাড়ি,খালার বাসা,আন্টি আংকেল আর আম্মুর দিকের মোটামুটি আত্মীয়রা ফেনীতেই থাকেন।

আমি যতবারই যেতাম কামরুলের অসাধারন সৌহার্দ্য আমাকে মুগ্ধ করতো। এক সাথে নাস্তা করে বিল দিতে গেলে দোকানদার কে চোখ টিপে দিত। দোকানদার আমার কাছ থেকে বিল নিতোনা। লোকে জিজ্ঞেস করলে বলতো আমার বন্ধু,চিটাগং থেকে আসছে।যদিও আমরা একে অপরকে ভাই বলে সম্মোধন করতাম।

গতবার যখন হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে ফেনী শহর উত্তাল তখন আমি ফেনীতে। আলিয়া মাদ্রাসার সামনে হেফাজতে ইসলামের এক কর্মী পুলিশের গুলিতে মারা গেলে পুরো ফেনী শহরে গন্ডগোল ছড়িয়ে পড়ে।কামরুল জানতো আমি ফেনীতে তখন। মহিপালে একটা কাজে গিয়ে কামরুলকে ফোন দিয়েছিলাম। কামরুল দোকান বন্ধ করে সোজা মহিপাল এসে আমাকে জোর করে বাসায় নিয়ে যায়। আমাকে কোনো কাজ করতে দেয়নি ঐদিন। সারাক্ষন কানের কাছে একই বকাবকি আমি কেন এ অবস্থায় বের হলাম! খুব অস্থির লাগছিল কাজ অসুম্পূর্ণ রেখে চলে এসেছি তাই। তবে কামরুলের জন্য আমার হৃদয়ে সেদিন প্রবল ভালবাসায় খোদাই হয়ে গিয়েছিল।

তাঁরপর থেকে কামরুলের সাথে ঘনিষ্ঠতা আমার আরো বাড়লো। আরো বেশি চিনলাম কামরুলকে। কোনো ভিক্ষুক সামনে এসে হাত বাড়ালে কামরুল নিরাশ করতো না। আমি বলতাম কামরুল ভাই-এইভাবে দিতে থাকলে তো তুমি নিজেও ওদের জায়গায় নামতে হবে থালা হাতে''!আমাকে হাত চেপে ধরে এক গাল হাসি দিয়ে বলতো-গার্লফ্রেন্ডের সাথে না হয় আজ দশ মিনিট কম কথা বলবো!

একদিন ফেনী রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে খোলামাঠে কামরুল ভাইকে নিয়ে বসেছিলাম। আমি ফোনে কথা বলে মাত্র মোবাইল পকেটে রাখছি তখন কামরুল বলেছিল ''যদি থেমে থাকতো এই সময়টা,আমি বেঁচে যেতাম।" আমি হাসছিলাম শুধু। এ কথা,সে কথা অনেক কথাই বলেছি।কামরুলের কথা আর শুনা হয়নি।


আমি জানতাম কামরুল মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে যেত। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতাম কেন যায় ডাক্তারের কাছে।হেসে বলতো ''লাইফের মেয়াদ বাড়ানোর দরকার আছে''।মায়ের অনেক সপ্ন এখনো পূরনের বাকি।তাড়াতাড়ি যদি মরে যাই আবার! তারপর প্রসংগ ঘুরিয়ে দিত।আমার আর জানা হলোনা কামরুলকে!

এর পর কামরুলের সাথে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিলোনা! কয়েক দিন আগে জানতে পারি কামরুলের জন্য রক্ত দরকার। মাসুদ ভাই (কামরুলের বন্ধু) হঠাৎ আমাকে ফোন করে বলে আর্জেন্ট রক্ত জোগাড় করতে! আমি শুনেই থ! জিজ্ঞেস করতেই বলে কামরুলের ব্লাড ক্যান্সার তুমি জানোনা?!

আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলোনা। নীরবে ফোনটা রেখে দিলাম। আমার সময়টা সত্যিই থেমে গিয়েছিল।রক্ত প্রবাহ মাথার পিছনের দিকে স্পষ্ট জমাট বেঁধে আছে আমি বুঝতে পারছিলাম। কত স্মৃতি ওলট পালট হচ্ছে মাথায়! পিছনে যা রঙিন ছিল আজ তা সাদাকালো!

শেষ তার সাথে দেখা হয় হাসপাতালে। সেদিনো সে খুব হাসছিল।তার সেই হাসি হাতুড়ির মত আমার কলিজায় আঘাত করছিল সেদিন।আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিল-মরবো আমি,তুই না।আমি কান্না চেপে রাখতে পারিনি।

কিছুক্ষন আগে শুনলাম আমার বন্ধু মারা গেছে। আমি একটুও বিচলিত হইনি। আমি নিষ্ঠুর ভাবে বেঁচে আছি! এখনো হাতে কলম ধরে আছি। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে কিন্তু আমি লিখে যাচ্ছি। আমি ক্ষমাপার্থী বন্ধুর কাছে,আমি ক্ষমা পার্থী আমার বন্ধুত্ত্বের কাছে। খুব কাছ থেকেও আমি আমার বন্ধুকে চিনতে পারিনি। আমি হয়তো কিছুই করতে পারতাম না কিন্তু চেষ্টা চালয়ে যেতাম-নিজেকে বলতে পারতাম,

"দেখ বন্ধু-আমি তোকে আরো কিছুদিন ধরে রাখার সংগ্রাম করছি।আমরা আবার মাঠে গিয়ে একসাথে গল্প করবো। আবার আমি গোলযোগপূর্ণ রাস্তায় বের হলে তুই আমাকে কুড়িয়ে আনবি,আগলে রাখবি। আমি তোর ভিতর বাঁচতে চাই! "

আমি বেঁচে আছি ঠিকই।কিন্তু কামরুলের সাথে বেঁচে থাকা হলোনা।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×