
যখন গাজা সীমান্তের কাছে ফিলিস্তিনের নিরস্ত্র বেসামরিক লোকজনকে হত্যার জন্য ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে খোদ জাতিসংঘ মহাসচিব স্বাধীনভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার ওপর থেকে ইসরাইলি অবরোধের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোগেরিনি। ঠিক এমন সময় ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়েছে সম্প্রতি সময়ের তাদের অন্যতম বন্ধু রাষ্ট্র সৌদি আরব।

গত শুক্রবার ফিলিস্তিনের ভূমি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে ইহুদিবাদী ইসরাইলের সেনারা গুলি চালালে ২০ জন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি শহীদ হন এবং প্রায় দেড় হাজারের ওপর আহত হয়। ইসরাইল এসময় নিষিদ্ধ একপ্রকার বিষক্ত গুলি ব্যাবহার করেছে বলে প্রমান পাওয়া গিয়েছে।


১৯৪৮ সালে ইসরাইল নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনি ভূমি জবর দখল করে চলেছে। এক্ষেত্রে ইসরাইলের নিরাপত্তার নামে এ পর্যন্ত হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রটি। প্রতি বছর ৩০ মার্চ ফিলিস্তিনিরা নিজ ভূমিতে ফেরার দাবিতে ভূমি দিবস পালন করে থাকে।

১৯৭৬ সালের ওই দিনে ইহুদিবাদী ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ২১ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি নতুন করে দখলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এরপরই ফিলিস্তিনিরা ওই দিনটিকে ভূমি দিবস হিসেবে নামকরণ করে।

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা সীমান্তে ইহুদিবাদী ইসরাইলের গণহত্যার বিষয়ে তদন্ত চেয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তোলা একটি খসড়া প্রস্তাব আটকে দিয়েছে আমেরিকা। গাজার নিরস্ত্র জনগণের ওপর ইহুদিবাদী সেনাদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তের জন্য কুয়েত এ প্রস্তাব তুলেছিল। ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা বা পিএলও’র সদস্য হানান আশরাভি মার্কিন এ পদক্ষেপের নিন্দা করে বলেছেন, ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞে আমেরিকা ও ব্রিটেন সহযোগিতা করছে।

ভূমি দিবসে ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে হত্যা করায় ইহুদিবাদী সেনাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরাইলি যুদ্ধমন্ত্রী এভিগদোর লিবারম্যান বলেছেন গাজায় ভূমি দিবসের হামলা তদন্তে আন্তর্জাতিক কোনো কমিটিকেই সহযোগিতা করা হবে না। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করে লিবারম্যান উল্টো বলেছেন ইসরাইলি সেনারা ওই হামলার জন্য পদক পাবার উপযুক্ত। ইসরাইলের বামপন্থি সংগঠনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা গতকালের গাযা হামলার ঘটনা তদন্তের আগ্রহ দেখায়। লিবারম্যান তাদের ওই আগ্রহে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন আন্তর্জাতিক কোনো তদন্ত কমিটিকেই ইসরাইল সহযোগিতা করবে না।
যদিও জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও শুক্রবারের রক্তক্ষয়ী ওই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোগেরিনি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইসরাইলের বামপন্থি সংগঠনের প্রধান মেরেৎসও গাযা বিপর্যয় তদন্তের আহ্বান জানায়।

আমেরিকার সবুজ সংকেতে সৌদি আরবসহ আরো কয়েকটি আরব দেশের সমর্থন নিয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নতুন করে নৃশংসতা শুরু করেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে আনিত প্রস্তাবে ভেটো প্রদানের মাধ্যমে ইসরাইলের নিসংসতার প্রতি মার্কিন সমর্থন প্রকাশ করবার পর সৌদি যুবরাজও এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি ইসরাইলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। তিনি বলেছেন, বসবাসের জন্য নিজেদের আলাদা ভূখণ্ড রাখার অধিকার ইসরাইলিদের রয়েছে।দি আটলান্টিক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মুহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, "ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে এবং আমরা যদি ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও শান্তি স্থাপন করতে পারি তাহলে মিশর, জর্দানসহ পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত আরব দেশগুলো ব্যাপক লাভবান হবে।"
মুহাম্মদ বিন সালমান এখনো সৌদি আরবের রাজা না হলেও তিনিই মূলত সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। পরবর্তী রাজা হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছেন। ক্ষমতার লড়াইয়ে অ্যামেরিকার সমর্থন পাওয়ার জন্য যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান আমেরিকার আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন যার অংশ হিসেবে মার্কিন মিত্র ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সৌদি যুবরাজ এর আগেও গত ডিসেম্বরের পর থেকে ইসরাইলের পক্ষে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডিসেম্বরে দখলিকৃত বায়তুল মোকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি আগামী মে মাসে মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার বিরুদ্ধে সারা মুসলিম বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও ট্রাম্পের ওই ঘোষণার নিন্দা জানাতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ওআইসির বৈঠকে সৌদি আরব যোগ দেয়নি। এমনকি সৌদি এই যুবরাজ সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরকালে ইহুদিবাদী লবিং গ্রুপের বেশ ক'জন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রকাশ্য কোনো ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুতগতিতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। দুটি দেশই ইরানকে তাদের উভয়ের হুমকি বলে মনে করে। সৌদি আরব যখন ইসরাইলের সাথে মাখামাখি করছে ঠিক একই সময়ে মুসলিম দেশ কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে, আর এক দেশ সিরিয়ায় সরকার পতন ঘটাতে কথিত ইসলামপন্থী জঙ্গিগ্রুপগুলোকে সহায়তা করছে এবং তিন বছর ধরে আরব দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে হামলা চালাচ্ছে।
বিদ্রঃ মোহাম্মদ বিন সালমানের আগে কোনো সৌদি কর্মকর্তা ইসরায়েলের ভূমি অধিকারের বিষয়টি মেনে নেননি। ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় আরব ভূখণ্ড দখল করে নেয়। ওই ভূমি ফেরত দেওয়ার ওপর ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক নির্ভর করবে—এমন নীতিই রিয়াদ এত দিন বজায় রেখে এসেছে।
এদিকে সৌদি যুবরাজ খুব শিগগিরই বাগদাদ সফর করবেন বলে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তথ্য প্রকাশের পর গত শুক্রবার জুমা নামাজের পর বিক্ষোভকারীরা বাগদাদে মিছিল বের করেন এবং বিন সালমানকে তারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করেন। বিক্ষোভের মুখে আপাতত সৌদি যুবরাজের ইরাক সফরের পরিকল্পনা বাতিল হয়েছে।
এই বিষয়ে আমার পূর্ববর্তী পোষ্টগুলো পড়তে পারেন।
সুন্নি রাষ্ট্র সৌদি আরব যখন ইসরাইলের বিশ্বস্ত বন্ধু!!
ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেয়নি সৌদি আরব, সৌদি যুবরাজ পেলেন ইসরাইল সফরের আমন্ত্রণ! ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভ।।
বায়তুল মুকাদ্দাকে ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি দিবে না ইউরোপ, ইসরাইলের সাথে মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে সৌদি আরব!!
ইসরাইল ও সৌদি আরবের প্রকাশ্য মাখামাখি বিমানবন্দরের দায়িত্ব দেওয়ায় পর সৌদি আকাশে উড়ল ইসরাইলগামী বিমান!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

