
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের খাদ্য, রেশন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারা অধিদপ্তরের অধীনে প্রতি বছর ৬০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকে। কারাগার অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে মোট বন্দির সংখ্যা প্রায় ৯৮ হাজার, যা নির্ধারিত ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। দেশের ৭৫টি কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার হলেও অতিরিক্ত বন্দির কারণে সেখানে তীব্র আবাসন সংকট বিরাজ করছে। এই যখন অবস্থা, জনগণের এই ৬০০ কোটি টাকা বাঁচানো যেতো আমরা যদি ইসলামের শেষ নবী'র বন্দী ব্যবস্থাপনা আমাদের রাষ্ট্রে প্রয়োগ করতে পারতাম।
ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ আদায়, গৃহস্থালি ও কৃষিকাজে নিয়োগ করা হতো। এছাড়া শিক্ষিত বন্দীদের মুক্তিপণ বা উপকারের বিনিময়ে মুসলমানদের শিক্ষাদানের কাজেও লাগাতেন।
ইসলামের সেই যুগে বন্দীদের প্রধান কাজ ও দায়িত্বঃ
গৃহস্থালি কাজ: অনেক বন্দীকে সাহাবিদের পরিবারে গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজে রাখা হতো।
কৃষিকাজ ও শ্রম: নারী ও পুরুষ বন্দীদের কেউ কেউ কৃষিকাজ এবং শারীরিক পরিশ্রমের কাজে অংশ নিতো।
শিক্ষাদান: বদর যুদ্ধের সময় যেসব বন্দী শিক্ষিত ছিল, তাদের মধ্য থেকে যারা মুক্তিপণ দিতে পারেনি, তাদের প্রতি ১০ জন মুসলিম শিশুকে লেখা ও পঠন শেখানোর শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
বন্দীদের সাথে আচরণের নিয়মঃ
রাসূল (সা.) বন্দীদের সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও পোশাক দিতে বলা হতো। এছাড়াও, বন্দীদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা বা কষ্টদায়ক কাজ চাপানো নিষেধ ছিল।

ইসলামের এই কারাগার ব্যবস্থা বাংলাদেশে প্রয়োগ করলে কী হবে?ঃ
ইসলামের প্রাথমিক যুগের যুদ্ধবন্দীদের মানবিক আচরণ ও পুনর্বাসন নীতি আধুনিক কারাগার ব্যবস্থায় প্রয়োগ করলে সমাজ ও রাষ্ট্রে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানের বন্দিশালা ও কারাগার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ উঠিয়ে দিয়ে যদি সেই নীতিসমূহ (যেমন: মানবিক আচরণ, শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন, শিক্ষাদান ও সমাজিকীকরণ) বাস্তবায়ন করা হয়, তবে নিম্নলিখিত উপকার ও ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো দেখা দিতে পারে:
ক) অপরাধীদের স্থায়ী সংশোধন ও সামাজিকীকরণ
অপরাধীদের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি না রেখে পরিবারের অধীনে রাখলে তারা স্বাভাবিক আচরণ করতে শেখে। অপরাধের গ্লানি ভুলে তারা সমাজে নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পায়। নিয়মিত মানবিক সংস্পর্শ ও ভালো ব্যবহারের ফলে তাদের অপরাধপ্রবণতা স্থায়ীভাবে দূর হতে পারে।
খ) অর্থনৈতিক মুক্তি ও উৎপাদনশীলতাঃ
বন্দীদের অলস বসিয়ে না রেখে কৃষিকাজ, শিল্প উৎপাদন বা অবকাঠামো নির্মাণে কাজে লাগানো যাবে। এতে করে, কারাগার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং বন্দীদের বিশাল খাবারের পেছনে রাষ্ট্রের যে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, তা সম্পূর্ণ বেঁচে যাবে। বন্দীরা সমাজের জন্য বোঝা না হয়ে সরাসরি জিডিপিতে (GDP) অবদান রাখতে পারবে।
গ) নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিঃ
শিক্ষিত অপরাধীদের জ্ঞান ও মেধা নিরক্ষরদের শিক্ষাদানের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়াও, অদক্ষ বন্দীদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কাজে নিয়োজিত করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যাবে।
ঘ) মানবিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠা ও অপরাধের হারঃ
বন্দীদের মৌলিক অধিকার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান) নিশ্চিত হওয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা শূন্যে নেমে আসবে। প্রতিশোধের মানসিকতা লোপ পাবে। কারাগারের নিষ্ঠুরতা মানুষের ভেতর আরও বড় অপরাধী হওয়ার হিংস্রতা তৈরি করে। এই ব্যবস্থা তুলে দিলে অপরাধীদের মন থেকে সমাজের প্রতি ক্ষোভ দূর হবে।
তবে, এক্ষেত্রে, কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। কুখ্যাত বা উগ্র অপরাধীদের উন্মুক্ত সমাজে রাখলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে। তাছাড়া, আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সাথে এর প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য করা কঠিন। বন্দীদের দেখভালের জন্য বিপুল পরিমাণ সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিকের প্রয়োজন, যা বর্তমান সমাজে পাওয়া দুষ্কর।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে যা করা প্রয়োজনঃ
ক) ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও স্মার্ট নজরদারিজিপিএস ট্র্যাকার-
অপরাধীদের পায়ে বা হাতে আধুনিক স্মার্ট জিপিএস অ্যান্কলেট (Anklet) পরিয়ে রাখা।ভার্চুয়াল বাউন্ডারি: নির্দিষ্ট এলাকা বা কাজের জায়গার বাইরে গেলে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম বাজবে। এর ফলে কোনো বড় নিরাপত্তা কর্মী ছাড়াই তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
খ) অপরাধের ধরন অনুযায়ী স্তরভিত্তিক পুনর্বাসন-
অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা (লঘু, মাঝারি, উগ্র) অনুযায়ী আলাদা দলে ভাগ করা। লঘু অপরাধীদের সরাসরি গৃহস্থালি বা কৃষি সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, নিয়ন্ত্রিত পুনর্বাসন করে গুরুতর অপরাধীদের প্রথমে কঠোর রাষ্ট্রীয় বিশেষ খামারে রেখে মানসিক সংশোধনের পর সাধারণ সমাজে ছাড়লে ভালো পাওয়া যাবে।
গ) প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান ও কর্পোরেট স্পন্সরশিপ-
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে দায়িত্ব একক ব্যক্তির ওপর না দিয়ে নিবন্ধিত কোম্পানি বা কৃষি খামারের ওপর দেওয়া যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্দীদের কাজ দেবে, বাসস্থান দেবে এবং তাদের আচরণের আইনি গ্যারান্টি নেবে। সরকারি পরিদর্শকরা নিয়মিত এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করবেন।
ঘ) মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও বাধ্যতামূলক কাউন্সেলিংঃ
পুনর্বাসনকালীন সময়ে বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মীয়, নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আচরণ পরিবর্তনের জন্যে অপরাধের পেছনের মূল মানসিক কারণ (যেমন: রাগ বা হতাশা) দূর করার থেরাপি দেওয়া উচিৎ হবে।
ঙ) বিশেষ আইনি কাঠামো ও 'প্যাট্রন' জবাবদিহিতাঃ
আধুনিক সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি বিশেষ 'সংশোধন ও পুনর্বাসন আইন' তৈরি করা যেতে পারে যাতে অপরাধী কোনো ক্ষতি করলে তার তত্ত্বাবধানকারী ব্যক্তি বা সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।
চ) প্রণোদনা ও সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধিঃ
যেসব নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান অপরাধীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেবে, তাদের রাষ্ট্রীয় কর মওকুফ করা উচিৎ। এছাড়াও, এই মানবিক কাজে অংশ নেওয়া নাগরিকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত বা সম্মানিত করা যেতে পারে।
ছ) কাজের বিনিময়ে মুক্তি ও পারিশ্রমিক ব্যবস্থাঃ
বন্দীদের শ্রমের একটি অংশ তাদের থাকার খরচ বাবদ কেটে বাকি অংশ তাদের নামে ব্যাংকে জমানোর ব্যবস্থা করা যাবে। এতে করে তারা ভবিষ্যতের জন্যে সঞ্চয় করতে পারবে।। মুক্তির পর তারা যেন এই জমানো টাকা দিয়ে নতুন ব্যবসা বা জীবন শুরু করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ভালো আচরণ এবং দ্রুত কাজ শেখার ওপর ভিত্তি করে তাদের সাজা কমানোর নিয়ম রাখা উচিৎ।
আর এভাবেই সম্ভব জনগণের বার্ষিক ৬০০ কোটি টাকা বাঁচানো। শুধু তা-ই নয়, এই ইসলামী নিয়ম প্রয়োগ করা গেলে বন্দীদের মাধ্যমে জিডিপিতে শত কোটি টাকা যোগ হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



