somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শুভ জন্মদিন অজান্তা

০৫ ই মে, ২০২৫ সকাল ১১:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ অজান্তার জন্মদিন। অমিত তার সারা ঘর সাজিয়ে রেখেছে। রুমের চারদিকে রঙবেরঙের বেলুন, পশ্চিম পাশের দেয়ালে কর্কশিটে লেখা, 'শুভ জন্মদিন অজান্তা'। টেবিলে ৪ টি গোলাপ রেখেছে অজান্তাকে দিবে বলে। 'ভালোবাসা'র চার অক্ষর আর গোলাপের সংখ্যাও চার, এটি ভালোবাসার প্রতীক। আজ অজান্তা আসবে সে জানে। অমিত রাত জেগে অপেক্ষা করছে তার জন্য। রাতের গভীরতা বাড়ে, সেই সাথে অমিতের অপেক্ষার গভীরতাও বাড়ে।

অজান্তার সাথে কাটানো শেষ জন্মদিনে ওরা দু'জন পাশাপাশি বসে কেক কেটেছিলো। অজান্তার জন্য অনেকগুলো কাঁচের চুড়ি নিয়ে গিয়েছিলো অমিত। দোকানে যত রঙের চুড়ি আছে সব রঙ। অজান্তার যখন যে রঙটা ইচ্ছে করবে তাই পরবে। চুড়িগুলো পেয়ে সে কি যে খুশি হয়েছিলো! বাচ্চাদের মত সেগুলো হাতে লাগিয়ে নাড়াচাড়া করছিলো, হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে বারবার, অমিত মুগ্ধ হয়ে অজান্তার এই খুশির দৃশ্য দেখে। সামান্য কাঁচের চুড়ি পেয়ে যে মেয়ে এত খুশি হতে পারে তাকে নিশ্চিন্তে বিবাহ করা যায়। সেদিনের সেই দৃশ্য, অজান্তার মায়াবী মুখটা এখনো অমিতের চোখে ভেসে উঠে।

রাত দুটা নাগাদ অপেক্ষার অবসান হয়। অজান্তা অমিতের পাশে এসে চুপটি করে বসে। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর অমিতের হাত জড়িয়ে ধরে, কাঁধে মাথা রাখে। অমিত অজান্তার পাশে চুপ করে বসে থাকে। কিছু বলতে চেয়েও পারেনা। অজান্তা অমিতের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে;
- কেন এমন পাগলামি করো? এত আয়োজন কেন করেছো?

আমিত তার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়;
- তোমার জন্য। তোমার এই বিশেষ দিনে তোমাকে অনেক শুভেচ্ছা।

অজান্তা কিছুটা অস্থির হয়ে বলে;
- তোমার এই কল্পনা থেকে বের হতে হবে অমিত, বাস্তবতা হলো আমি আর তোমার সাথে নেই। আমরা অনেক আগেই আলাদা হয়ে গেছি।

অমিত মৃদু হেসে উত্তর দেয়;
- জীবন থেকে আলাদা হলেই মন থেকে আলাদা হয় কে বললো তোমায়?

অজান্তা উঠে দাঁড়িয়ে যায়, অমিতের হাত ছাড়িয়ে বলে;
- তুমি সবকিছু যতটা সহজ করে নিতে পারো আমি পারিনা। আমার যে এসব দেখলে প্রচন্ড কষ্ট হয়।

অমিত উঠে গিয়ে অজান্তার পিছনে দাঁড়ায়। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে;
- আমার এই যন্ত্রণা থেকে তোমার মুক্তি নেই। যদি তোমার আগে মরে যাই তবেই মুক্তি।

অজান্তা পেছন ঘুরে অমিতের দিকে তাকায়। তারপর কথা ঘুরিয়ে বলে;
- বাজে বকার অভ্যেস তোমার এখনো গেলো না। চলো কেক কাটি।

অমিত অজান্তার হাত ধরে টেবিলে রাখা কেক কাটলো। অমিত শব্দহীন হাততালি দিতে দিতে অজান্তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। ওকে আজ ভীষণ অন্যরকম লাগছে। মেরুন রঙা শাড়ি পরেছে, কপালে মেরুন টিপ, হাতে অমিতের দেয়া একটা মাত্র কাঁচের চুড়ি পরেছে। মেরুন রঙের শাড়িতে মেয়েদের ভীষণ সুন্দরী লাগে। অমিত প্রশ্ন করে;
- তুমি আমার সব স্মৃতি মুছে ফেলেছো?

- হুম সব ফেলে দিয়েছি, তোমার টি শার্ট পুড়িয়ে দিয়েছি, চিঠিগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছি এক সন্ধ্যায়, আর সব চুড়ি ভেঙে ফেলেছি এক এক করে।

- তাহলে হাতের ওই একটা চুড়ি?

- এটিই শেষ স্মৃতি, এটা ভাঙার সাহস পাইনি।

- আমার দেয়া ভালোবাসার স্মৃতি?

- সেটা নতুন করে জীবনে আসা মানুষটার ভালোবাসায় ঢাকা পড়ে গেছে।

অমিত টেবিলে রাখা চারটি গোলাপ অজান্তার হাতে দিয়ে বলে;
- তোমার জীবনের সবকটি জন্মদিনে আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো।

অজান্তা গোলাপগুলো বুকে জড়িয়ে বলে;
- আমাদের প্রথম দেখার চারটি গোলাপ।

অমিত অজান্তার গালে হাত লাগিয়ে বলে;
- নতুন পুরুষ গোলাপ দেয়?

অজান্তা আর চোখের জল আটকে রাখতে পারেনি। মাথা নীচু করে বলে;
- আমেরিকায় এরকম দেশী গোলাপ পাওয়া যায়না। তাই হয়তো দেয়না।

"যাই হোক, আমি আজ আসি। নিজের জীবনকে এবার গুছিয়ে নাও।"
এ কথা বলে অজান্তা দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

দরজার মুখে হঠাৎ থেমে যায়, তারপর অমিতের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে,
– একটা কথা বলি?
– বলো।
– আমার মৃত্যুসংবাদ শোনা পর্যন্ত তুমি বেঁচে থেকো।

অমিত স্তব্ধ হয়ে যায়। এই কথার ওজন তার বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসে। সে কিছুই বলতে পারেনা, শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।
অজান্তা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

অমিত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে—অনড়, নিঃশ্বাসহীন। চারপাশে নিস্তব্ধতা। কেবল দেয়ালে ঝুলতে থাকা রঙিন বেলুনগুলো একটু একটু দুলছে বাতাসে।

সে নিজের দিকে ফিরে তাকায় না। পা বাড়ায় না রুমের ভেতরে। তার মনে একটাই প্রশ্ন—
অজান্তা কি সত্যিই এসেছিলো? নাকি এই পুরোটা তার একা থাকার দীর্ঘ অপেক্ষার জন্ম দেওয়া বিভ্রম?

সে দাঁড়িয়ে থাকে দরজার চৌকাঠে,
একটি জন্মদিনের রাত, যেখানে কেক কাটা হয়, গোলাপ দেওয়া হয়, আর ভালোবাসা বলে কিছু যদি থেকে থাকে—তা হয়তো কেবল স্মৃতিতে।

(অপেক্ষা সিরিজ থেকে)
© শামীম মোহাম্মদ মাসুদ

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০২৫ সকাল ১১:৩৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধূসর ওয়ালেট

লিখেছেন মোহাম্মদ সজল রহমান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

একটা ধূসর রংয়ের ওয়ালেট
সবুজাভ ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের হলো নীরবে
তার শান্ত হাতের উপর চেপে ধরতেই প্রশ্ন -
এটা আমার জন্য ?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেখেই চঞ্চলতা ছুঁয়ে গেলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১

কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×