somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানবতা

০৬ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ১২:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ফেসবুকের হোমপেইজে ভেসে আসা একটি মর্মান্তিক ভিডিও দেখলাম।

একটি মেয়েকে জনসম্মুখে মেরে রক্তাক্ত করা হয়েছে। নাকমুখ মাথা থেকে রক্ত ঝরছে… পা খুঁড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে ঢলে।
তবুও পাবলিক নির্দয়ভাবে তাকে অনবরত মেরে যাচ্ছে।
মেয়েটি এদিক সেদিক ছুটে পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। অনেকগুলো মানুষ চতুর্দিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে তার উপর নির্মম অত্যাচারের দৃশ্য উপভোগ করছে। কেউ বা হুইসেল বাজিয়ে হাততালি দিচ্ছে। কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও করছে।

কিল ঘুষি, লাথি... যে যার ইচ্ছেমত মেরেই চলেছে।
সজোরে লাথি মেরে নিচে ফেলে দিয়ে একজন মেয়েটির গায়ে পেট্রোল ঢেলে দিলো। এরপর আরেকজন পাশ থেকে দৌড়ে এসে আগুন ধরিয়ে দিলো...

দৃশ্যটির ভয়াবহতা লিখে প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই।
মাটিতে গড়িয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে সে ব্যর্থ... সে জ্বলছে...
জ্বলেই যাচ্ছে আর বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে।

মনে মনে ভাবছি হয়তো কোনো একজন সহৃদয়বান ব্যক্তি দৌড়ে এসে আগুন থামাতে সাহায্য করবে। সবাইকে বলবে অনেক হয়েছে... এইবার থাম।
ভাবতে ভাবতেই দেখলাম একজন ড্রাম হাতে নিয়ে দৌড়ে এলো।
এখনও মেয়েটির বাঁচার সম্ভাবনা আছে !!

কিন্ত সে দৌড়ে এলো ঠিকই... আগুন থামাতে নয়, আরও আগুন জ্বালাতে।
তার ড্রামভর্তি পেট্রোল মেয়েটির গায়ে ঢেলে দেয়ার পর দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো ডেথ ভ্যালীর আগুন।

উৎফুল্ল জনতা হাততালি দিচ্ছে। কেউ ইট পাটকেল ছুঁড়ে মারছে। কেউ ছবি তুলছে।
একজন মেয়ে মানুষের মৃত্যু আনন্দ উপভোগ করছে উৎফুল্ল জনতা।

ঘটনাটি ঘটেছিলো গুয়েতেমালার রাজধানীর নিকটস্থ একটি স্পটে।
যতদুর জেনেছি ১৬ বছর বয়সী এই মেয়েটির মোটর বাইকের আঘাতে ৬৪ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার নিহত হওয়ার পর পালানোর সময় ঘটনাস্থলেই পাবলিক তাকে ঘিরে ফেলে।
কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মারধর শুরু করে কয়েকজন উঠতি বয়সী ছেলে।
এরপর আরো মানুষজন দূর থেকে এসে হত্যাকান্ডে অংশ নেয়।
গায়ে আগুন দেয়ার অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই মেয়েটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

একজন নারী যতই অপরাধ করুক না কেনো, পুরুষ কতৃক তাকে শাস্তি দেয়াটা অমানবিক।
নারী অপরাধীদের জন্য নারী পুলিশ আছে। পুরুষদের জন্য রয়েছে পুরুষ।
নিয়মতান্ত্রিকভাবে নারীদের জন্য নারীই হওয়া উচিত।
একজন নারীকে পুরুষকতৃক শাস্তিপ্রদান রাষ্ট্রসংবিধানের খেলাফ।

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন এমন লোমহর্ষক নির্মম হত্যাকান্ড অন্ততঃ আমাদের দেশে কখনো ঘটবেনা। ঘটতে পারেনা।
মাছ ভাত খাওয়া উদারমনা বাঙ্গালী জাতি এতোটা হিংস্র হতে পারেনা।

আপনার ধারণাটি সত্য নয়। বরং অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গনপিটুনিতে মানুষ মারার ঘটনা বেশি ঘটে থাকে।

বলছিঃ
কুমিল্লা সদরের দক্ষিন উপজেলায় এক ডাকাতকে ধরা হয়েছে।
গনপিটুনি দিয়ে তাকে হত্যা করা হবে।
সেজন্য মসজিদের ইমামকে বলা হলো মাইক বাজিয়ে গ্রামবাসীকে ডেকে আনা হউক। ইমাম সাহেব গ্রামে ডাকাত ধরা পড়ার খবর মাইকের মাধ্যমে ঘোষনা করে দিলেন।
যে যার সাধ্যমত দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে ডাকাত পেটাতে চলে এলো।
ডাকাতকে আগে থেকেই হাত পা মুখ বেঁধে রাখা হয়েছিলো। গ্রামের লোকজন এসেই শুরু করলো গনধোলাই।
পাতলা গড়নের শরীর। পাবলিকের বেধড়ক পিটুনিতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় ডাকাত শেখ ফরিদ।

অতঃপর জানা গেলো নিহত ডাকাত ছিলো একজন প্রবাসী। আবুল কালাম নামে এক ব্যক্তির কাছে ভিসার বাকী টাকা চাইতে আসলে কালাম তাকে টাকা না দিয়ে ডাকাত বানিয়ে দেয়। তার বাড়ি অন্যজেলায় হওয়ায় গ্রামের লোকজন তাকে চিনতে পারেনি।

একই ধাঁচের আরেকটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে সাভারে।
২০১১ সালের ১৮ জুলাই শবে বরাতের রাতে ডাকাত সন্দেহে সাভারের আমিনবাজারে মসজিদের মাইকে ঘোষনা দিয়ে কতিপয় পুলিশের সহায়তায় এলাকাসী গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছিলো টগবগে ছয় তরুণকে। পরে প্রমাণ হয়েছিলো নিহত ওই ছয় তরুনরা ছিলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র।
ডাকাতি কিংবা কোন রকম অপরাধের সাথে তারা জড়িত ছিলোনা। ঘটনায় পুলিশ প্রথমে ডাকাত সন্দেহে রিপোর্ট দিলেও পরে তদন্তে বের হয়ে আসে প্রকৃত সত্য।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিলো। কিন্ত নির্দোষ সেই ছয় তরুনের জীবন কেউ ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

সম্প্রতি সিলেটের শিশু রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও ফুটেজ হত্যাকারীদের মধ্য থেকেই কেউ একজন ফেসবুকে আপলোড দেয়ায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি দেশবাসী জেনেছে।
প্রতিবাদ করেছে দেশ বিদেশের অসংখ্য বিবেকবান মানুষ।
.

প্রতিদিন পৃথিবীজুড়ে এমন হাজারো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে থাকে। তন্মধ্যে দুচারটা ঘটনা ভাইরাল হয়ে আমাদের নজরে এসে পড়ে। কিছু ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। অতি আকর্ষনা না থাকায় কিছু ঘটনা হারিয়ে যায় নিমিষেই...

ফেসবুক/ব্লগে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা এমন ইস্যু নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করে থাকে।
অন্যায় অপরাধের প্রতিবাদ করে পোস্ট দেয়।

এই প্রতিবাদ শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ না রেখে যদি সামাজিকভাবেও করা হতো,
তাহলে দেশে অন্যায় অপরাধকর্মের ঘটনা অনেকাংশে কমে যেতো বলে আমি মনি করি।

আপনার আশেপাশে প্রতিদিন কত রকম অন্যায় অপরাকর্ম ঘটছে। সরাসরি সেসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন।
আপনি আজ তনু ধর্ষনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ব্যাপক সমবেদনা জানাচ্ছেন, দেখা যাবে দুদিন পর আপনার পাশের বাড়ির আরেক তনু ধর্ষিত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

বাস কিংবা ট্রেনে কোনো নারী লাঞ্ছিত হওয়ার খবরে আপনি যতটা প্রতিবাদী হয়ে ফেসবুকে জ্বালাময়ী পোস্ট লিখেন, ঠিক ততটা জ্বালাময়ী মনোবল নিয়ে আপনার সামনে ঘটতে থাকা এমন অন্যায়ের সরাসরি প্রতিবাদ করুন।

কাউকে ডাকাত কিংবা ছিনতাইকারী সন্দেহে মারপিট করা হচ্ছে। আপনি নিজেও মারপিটে অংশ না নিয়ে বরং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দিন। আপনার সামান্য মানবিক সহযোগিতায় বেঁচে যেতে পারে একটি জীবন। এমনও তো হতে পারে, ব্যক্তিগত আক্রোশে কেউ নিরপরাধ কাউকে ডাকাত/ছিনতাইকারী সাজিয়ে পাবলিকের হাতে ছেড়ে দিয়েছে !

নগর পতিতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে আপনি ঘৃনাভরে অনেক বড় প্রচ্ছদ না লিখে বরং কোনো দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে পতিতাদের সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে দিন।

ইভটিজারদের ফেসবুকে গালাগালি না করে ইভটিজারদের পরিচয় নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।

দেশে অপরাধ কমবেই...
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ১২:০৫
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×