somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আম্মা বললেন, 'তোমার আব্বা তোমারে এই দুনিয়ার সবচাইতে বেশি ভালোবাসে

০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৬ বিকাল ৫:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার মায়ের উপর জীবনভর এক অদ্ভুত রাগ চেপে বড় হয়েছি আমি। সেই রাগের কারণ পুরোপুরি অযৌক্তিক কি না জানি না, তবে খুব সামান্য হলেও যে খানিকটা যৌক্তিক, সে আমি জানতাম। সেই রাগের কারণ আমার বাবা। ছেলেবেলা রঙ্গিন স্বপ্নের ঝলমলে শৈশব। সেই শৈশবে বুকের গহীনজুড়ে না পাওয়ার তীব্রতম তেষ্টা থাকে, আর তাহকে প্রাপ্তির তীব্রতম আনন্দ! কিন্তু সেই তখন, আব্বার সাথে যখন দোকানে যেতাম, আম্মা তখন ফিসফিস করে আমার কানের কাছে বলে দিতেন, 'আব্বু, দোকানে গিয়া কিন্তু তোমার আব্বার কাছে কিছু চাইবা না, কিছু কিনে দিতে বলবানা, কিছু চাইবা না'।
আমি বলতাম, 'কেন?'
আম্মা বলতেন, 'তোমার আব্বার কাছে যদি টাকা না থাকে? যদি তোমারে কিন্যা দিতে না পারে? তখন তোমার আব্বায় অনেক কষ্ট পাইব না?'
আমি কোন কথা বলি না। আমার খুব কষ্ট হয়। বুকের ভেতর সেই কষ্ট ফোঁটা ফোঁটা চুইয়ে জমা হয়। জমা হয়ে গলা ভার হয়। কত কিছু চাইব ভেবে রেখেছিলাম, অথচ আম্মা...!
আম্মা আবার বললেন, 'তোমার আব্বা কি তোমারে কম ভালোবাসে?'
আমি ডানে বায়ে মাথা নাড়ালাম, 'না'।
আম্মা বললেন, 'তোমার আব্বা তোমারে এই দুনিয়ার সবচাইতে বেশি ভালোবাসে। এখন যে তোমারে দুনিয়ার সবচাইতে বেশি ভালোবাসে, সে যদি তোমার কোন একটা ইচ্ছা পূরণ করতে না পারে, তাহলে তার কাছে কেমন লাগবে? খারাপ লাগবে না? খুব খারাপ লাগবে না?'

আমি কোন কথা বলি না। আমার ছোট্ট শিশু মন, সে এতো হিসেব নিকেশ বুঝতে চায় না। সে চায়, সে তার বাবার সাথে দোকানে যাবে, গিয়ে রঙ্গিন খেলনা কিনবে, পকেটভর্তি চকলেট কিনবে, নানান রঙের জিনিষ কিনবে। এতসব ভাবনা, হিসেব নিকেশ তার বুঝতে ইচ্ছে হয় না। তার বুঝতে ইচ্ছে হয় না, তাদের টানাটানির সংসার। তার বাবার আয় রোজগার কম, তার সামর্থ্য ভয়াবহরকম সীমিত। তার এসব কিছুই বুঝতে ইচ্ছে করে না, একদম না। তারও আর সকলের মত দোকানে গিয়ে বাবার কাছে রাজ্যের আবদার করতে ইচ্ছে করে।

কিন্তু আম্মা রোজ রোজ তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলতেই থাকেন, 'আব্বা যখন নিজে ইচ্ছে করে কিছু কিনে দিবে, তখন সেইটা নিবা। তখন ভাববা, আব্বার কাছে টাকা আছে। আর তুমি কিছু চাইলা, আর আব্বা দিতে পারল না, তখন আব্বা তোমার কাছে ছোট হইয়া যাইব না? দোকানদারের কাছে ছোট হইয়া যাইব না? অনেক কষ্ট পাইব না? তোমার আব্বা কষ্ট পাইলে, অন্য মানুষের কাছে ছোট হইলে কি তোমার ভালো লাগবে? লাগবে ভালো?'

আমি আবারও মাথা নাড়াই, আমার ভালো লাগবে না। আব্বা একবার টরকি বন্দর থেকে পাইকারি দরে একবস্তা চাল কিনেছেন। সেই চাল ট্রলারে করে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু দোকান থেকে ট্রলার অবধি অনেক পথ! এই পথ এক মণ ওজনের চালের বস্তা আনতে হবে কুলি ডেকে। কিন্তু কুলিকে দেয়ার টাকাটা আব্বা সাশ্রয় করতে চান। তিনি সেই বস্তা নিজের মাথায় তুলে নিলেন, প্রায় আধা কিলোমিটার পথ তিনি সেই বস্তা মাথায় হেঁটে এলেন।কিন্তু ট্রলারে উঠাতে যেতেই কুলিরা দলবল নিয়ে ছুটে এলো। কুলি ছাড়া মাল বহনের নাকি নিয়ম নেই ঘাটে। কিন্তু আব্বাও নাছোড়বান্দা! ওই ক'টা টাকাই তার কাছে অনেক কিছু। ওই ক'টা টাকায়ই তিনি আমাকে হোটেলে নিয়ে এক প্লেট ভাত, আর একখানা ভুনা তরকারির ডিম দিয়ে ভাত খাওয়াতে পারবেন! আমার কতদিনের ইচ্ছে হোটেলে একবেলা ভাত খাবার। হয়তো সেইজন্যই আব্বা...

কিন্তু সেই আমার জন্য কুলিরা সকলের সামনে আব্বাকে কত কিছুই না বলল! কত সব পচা পচা কথা! সেসব শুনে সেই ছোট্ট আমার কেমন যে লাগল! কান্নায় গলা আঁটকে এলো। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আমি আব্বার কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম, 'আব্বা, আমি হোটেলে ভাত খামু না। আমার হোটেলের খাওন ভাল্লাগে না। কেমুন হলুদ দেয়া বেশি, ঝাল, আর গন্ধ...'

আব্বা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার সেই চোখজুড়ে ছলছল নদী। কিন্তু তিনি সেই নদীতে বাঁধ দিয়ে রেখেছেন। আমার সামনে তিনি সেই নদীর বাঁধ ভাঙতে চান না। একদম না।

আমি চাই না, আমার জন্য আব্বাকে আর কেউ কিছু বলুক, ছোট করুক, আব্বা আমাকে কিছু না দিতে পেরে কষ্ট পাক, আমি চাই না। সেই শৈশব, স্বপ্নময় ইচ্ছের শৈশবে আম্মা আমাদের বুকের ভেতর এই বোধ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, রোজ রোজ বুঝিয়েছিলেন, বাবা মা সন্তানকে কিছু দিতে না পারলে কি প্রবল আক্ষেপ, কী অবর্ণনীয় কষ্ট তারা বুকে বয়ে বেড়ান। পুড়ে যান অহর্নিশ। দহনের দীর্ঘ দিবস রজনী! সেই কষ্টের যন্ত্রণার অন্তত খানিকটা হলেও যদি তার সন্তান বুঝতে পারে, খুব সামান্য হলেও। তবে তারচেয়ে আনন্দের আর কী আছে!

কিন্তু তখন আম্মার ওই কথা শুনে খুব অভিমান হত, রাগ হত, বিদ্রোহ হত।

খানিক আগে পত্রিকায় দেখলাম, ফরিদপুরে সতের বছরের এক ছেলে তার বাবা মায়ের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, তার বাবা মা তাকে নতুন বাইক কিনে দেয় নি বলে! সংবাদটা দেখে খানিক চুপ করে বসেছিলাম। প্রথমে আঁতকে উঠলেও পরে ভেবে দেখলাম, একদম অবিকল এমন না হলেও আজকালকার সন্তানদের এমন আচরণ খুব একটা বিরল কিছু নয়। আমার চারপাশে অহরহই এমন অজস্র ঘটনা দেখেছি, একটা আইফোন, একটা ল্যাপটপ, আইপ্যাড, দামী মোবাইল, পোশাক, ট্যুরের টাকা, বাইক, ক্যামেরা, আরও কত কিছু! কতকিছুর জন্য এমন অগ্নিশর্মা সন্তানদের দেখেছি!

দেখেছি সেই নানান কিছুতে বাবা মায়ের কান্না, আক্ষেপ, হতাশা লুকিয়ে লুকিয়ে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু তাদের বুকের ভেতর একবারও কি ভেসে বেড়ায়, এই সন্তানদের শৈশবে আদরে আহ্লদে, বায়না পূরণে দিনের পর দিন তারা সীমানা ভেঙ্গেছেন! তাদের বোধের জায়গায় স্পর্শময়তা, সংবেদনশীলতার ক্ষমতা লুপ্ত করেছেন! সেই সন্তানদের কখনও বুঝতে দেননি, এর চেয়েও ঢের বেশি কিছু তারা তাদের বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছেন। সেই বেশি কিছুরা এই ঠুনকো প্রাপ্তির কাছে ক্রমশই আড়াল হয়ে গেছে, যাচ্ছে। বোধ! বোধের প্রগাঢ় স্পর্শ ক্রমশই বিলীন হয়ে গেছে। সেই বোধ স্পর্শ করবার ক্ষমতা তারা নিজেরাই নষ্ট করে দিয়েছেন, দিচ্ছেন।

আজ, আমার হঠাৎ, আমার মায়ের প্রতি সেই রাগ, সেই অভিমান, সেই ক্ষোভ, প্রবল ভালোবাসায় পরিণত হল, কৃতজ্ঞতায় পরিণত হল। কারণ তিনি আমাদের বোধ স্পর্শ করতে শিখিয়েছিলেন, সংবেদনশীল হতে শিখিয়েছিলেন, শিখিয়েছিলেন পরিমিতি বোধ। তিনি শিখিয়েছিলেন, জগতে কেবল আমার পাওয়ার, আকাঙ্ক্ষার ভাবনাই একমাত্র ভাবনা নয়, একমাত্র সত্য নয়। এর বাইরেই, এর চেয়ে মূল্যবান, এর চেয়ে গভীরতম অজস্র জিনিষ রয়েছে। সেইসকল কিছুর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হল ভালোবাসা। জগতের শ্রেষ্ঠতম মমতায়, আদরে, ঐশ্বর্যে মোড়ানো ভালোবাসা।

যে সন্তান সেই ভালোবাসার মূল্য বুঝবে, সেই সন্তান জানে, হয়তো একদিন পিতা হয়েও সে তার সন্তানদের ভেতর সেই ভালোবাসার মূল্য বোঝার বোধ ছড়িয়ে দিতে পারবে, স্পর্শ করতে পারবে, পারবেই...
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৬ বিকাল ৫:৫২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

থাক অহমিকায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


তোমার রঙিন আকাশে নেই
যে অমাবস্যার- অন্ধকার
ঝলমল করছে শুধু চাঁদ-
ডুবছ ডুবছ সুখমারী রাত!
উড়ছ শঙ্খচিলের ডানায়;
তোমার আকাশে অমাবস্যা নাই।

আমি মাটি বন্দি হয়েছি
মরার আগেই- মরার আগেই-
স্বপ্ন দেখি শুধু হুতুম পেঁচা হব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০



বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন[

শেখ মুজিব ইতিহাসের খলনায়ক।
জাতীয় বেইমান।
পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী।
- এই কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করেন?
তাহলে আজ আপনাকে একটা অনুরোধ করব- একবার শুধু থামুন।

রাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৫

ফারাজা তাবাসসুম খান-
অনেকদিন তোমাকে নিয়ে লিখি না। খুব ব্যস্ত আছি। আমার সব সময় নিয়ে নিচ্ছে অফিস। আমি অফিস থেকে তোমাকে ফোন করলে তুমি কথা বলতে চাও না। আবার আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Mystic River – জোয়ারে ফিরে আসে সবকিছু

লিখেছেন রাজসোহান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩১



১৯৭৫ সালের বোস্টন। শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ পাড়া। রাস্তায় হকি খেলছিল তিনটে বাচ্চা ছেলে। হঠাৎ বল গড়িয়ে পড়ল ড্রেনে। খেলা ওখানেই শেষ। ফুটপাতের একপাশে তখন সদ্য ঢালা ভেজা সিমেন্ট। ছেলেগুলো কাঠি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলাপী এখন বাসে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২০


দেশে আজ থেকে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকা সহ আরও তিনটি বড় শহরে এই বাস চলবে। খবরটা শুনে মনে হলো, দেশ যেন হঠাৎ করেই এক ধাপ আধুনিক হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×