somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরামর্শকেন্দ্র (ছোট গল্প) পর্ব 1

২২ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ১২:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পরামর্শ কেন্দ্রের মসৃণ দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা শুভ্র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল উপদেষ্টার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। প্রতিবারই এমন হয়, আত্মতৃপ্তি আর আস্থা মিলেমিশে একাকার হয়ে তৈরী করে এক সুষম ব্যাঞ্জনা। দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাবার পরও দেয়ালগুলোর অবিচল মসৃণতা ইমারত নির্মাণকারীর পরিশ্রমী একনিষ্ঠতাকে দ্বিধাহীনভাবে প্রমাণ করে চলেছে। প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে, কর্মব্যাস্ত শহর যখন ক্ষণস্থায়ী নিদ্রা শেষ করে প্রস্তুত হয় নতুন আরেকটি অভাবিত দিনের জন্য। এবং বরাবরের মত ঘড়ি ধরে উপদেষ্টা উপস্থিত হন নিজের কামরার সামনে। তবে নিজের কামরায় প্রবেশের পূর্বে পরামর্শ কেন্দ্রের প্রাণ হিসেবে চিহি্নত, শব্দ নিরোধক সাক্ষাৎকার কক্ষটির দিকে তাকিয়ে উপদেষ্টা দেখতে পান একটি সম্ভাবনার সুগঠিত রূপ এবং অনেক নতুন সম্ভাবনার সূতিকাগারটিকে। তাঁর আশপাশের মোটামুটি ঘনিষ্ট পরিচিত জনেরা সবসময়ই উপদেষ্টাকে দেখে এসেছেন একজন নিয়মানুবর্তি ভবিষ্যৎবাদী মানুষ হিসেবে। কিন্তু তাদের অনেকেই ধারণাও করেতে পারবেন না যে, প্রতিদিনকার সকালের ঘুম জাগা সি্নগ্ধতায় উপদেষ্টা হয়ে ওঠেন খুব বেশি অতীতপ্রবণ এবং ক্রমাগতভাবে রোমন্থন করতে থাকেন নিজের সম্মৃদ্ধ স্মৃতিগুলোকে। নিজের ও চারপাশের ধারাবাহিক পরিবর্তনকে তিনি গ্রহণ করেন সহজভাবেই এবং পূর্বের যে কোন সকালের চাইতে আরো স্পষ্টতর বোধগম্যতায়। বর্তমানের অবিচল গতিতে নিজের অতীতকে যিনি কখনোই ভুলে যাবার চেষ্টা করেননি এমন একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে খুঁজে পেতে উপদেষ্টা কখনোই ক্লান্ত বোধ করেন না। সকালের এই সময়টায় চারদিকের কোলাহল জেগে ওঠার সাথে সাথে তাঁর পরিশীলিত দ্রুত গতির মগজটিও সচল হতে শুরু করে, নিজের মধ্যে তিনি বোধ করেন একটি ক্ষয়হীন সচেতনতা, যেন কোন সৃষ্টিশীল বিশ্লেষণী যন্ত্রের চাপা গুমগুম শব্দ। যদিও মানুষের চিন্তা পদ্ধতি আর উপযুক্ত দিক নির্দেশনার বিষয়টিকে তিনি কখনোই যন্ত্রের সাথে তুলনা করেন না, অবশ্য এজন্য অনেকে তাকে প্রাচীনপন্থী বলে গালাগাল দেয়, কিন্তু মানুষের রহস্যময়তাকে তিনি কখনোই সম্পূর্ণরুপে যন্ত্রের বিশ্লেষণের উপযুক্ত বলে মনে করতে পারেন না। হয়ত এ কারণেই তাঁর বিশ্বজোড়া নামডাক।

পরামর্শ কেন্দ্রের ফাঁকা অফিসটাতে পায়চারী করতে করতে তিনি সুস্থিরভাবে নিজেকে অনবরত মনে করাতে থাকেন অতীতের দিনগুলির কথা; যখন প্রথম তিনি সহপরামর্শক হিসেবে পরামর্শ কেন্দ্রে যোগদান করেন এবং নিজের স্বতন্ত্র উদ্ধাবনী পদ্ধতি আর পরিশ্রমের একনিষ্ঠতার কারণে প্রধান পরামর্শক পদে অধিষ্ঠিত হন। এরপর স্বীয় যোগ্যতা বলেই তিনি তাঁর চারপাশে এমন একটি আবহ তৈরী করতে সমর্থ হন যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের সরাসরি হস্তক্ষেপে তাঁর উপযুক্ত একটি নতুন পদের সৃষ্টি হয় এবং তিনি উপদেষ্টা পদে অভিসিক্ত হন। কিন্তু এই অর্জন আর আনন্দকে ভাগাভাগি করার সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষটি ততদিনে লোকান্তরিত; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনে তিনি যার দ্বারা সবচেয়ে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর প্রিয় শিক্ষক, ছাত্রের এই অভাবিত অর্জনকে দেখে যেতে পারেননি বলে একটা যুবকোচিত বেদনাও উপদেষ্টার মনে কাজ করে। প্রিয় শিক্ষকের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং কৃতজ্ঞতাবশত তাঁর পোট্রেট আকারের একটি তৈলচিত্র তিনি সযতনে নিজের কামরায় ঝুলিয়ে রেখেছেন।

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোর আগে নিজের অতীত রোমন্থনের সাথে সাথে তৈলচিত্রটিকে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। সফলতার চূড়ান্ত শিখরে অধিষ্টিত হবার পর এই তৈলচিত্রটিই যেন তাকে নতুন নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখবার অনুপ্রেরণা যোগায়। তবে মাঝেমধ্যে প্রচলিত ধারণার বাইরের যেসব মানুষ তাঁর পরামর্শ কেন্দ্রে আসে তারাও নানাভাবে তাঁকে উৎসাহিত করে, কখনো সখনো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবার চেষ্টাও করে। বিশেষত সেইসব ক্ষেত্রে, প্রিয় শিক্ষকের কাছ থেকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করার যে শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন সেজন্য মনে মনে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন। প্রতিটি অভাবিত নতুন কেইস যে তাঁকে নতুন অনেক কিছু শেখায় সে জন্য পরামর্শকেন্দ্রে আসা ভিন্ন রকমের মানুষগুলোকেও তিনি মনে মনে পছন্দ করেন। তবে দীর্ঘদিনের পেশাদ্বারীত্ব তাঁকে শিখিয়েছে কিভাবে নির্লিপ্ত থেকে একটা চির ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির গুরু সমস্যাগুলোকে মোকাবিলা করতে হয় এবং সেটি থেকে গ্রাহকের উপযোগী তথ্যগুলোকে বাছাই করে সম্ভাব্য সমাধানের একটি পথ তৈরী করতে হয়। যদিও প্রাচীন গ্রীকদের মধ্যেই পরামর্শ কেন্দ্রের ধারণা প্রথম চালু হয়েছিল কিন্তু এই একবিংশ শতকে পরামর্শকেন্দ্রের যে প্রভাব ও বিস্তৃতি এবং সেটিতে যে তাঁর নিজের অবদান অনেক বেশি তা তাঁর অতিবড় নিন্দুকও স্বীকার করবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ১২:২৯
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×