এবার সত্যি সত্যি তিনি অভিনেত্রীর বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। অভিনেত্রীর সর্বজন পরিচিত নামটি তাঁর জানাই ছিল কিন্তু এবার তিনি অভিনেত্রীর ডাকনামটি জানতে চাইলেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন যে এ ধরণের আপাত বিমূর্ত সমস্যাগুলোর দুটো ধরণ বিদ্যমান; হয়ত এগুলো নিছকই সাময়িক মানসিক অস্থিরতা অথবা খুব কম ক্ষেত্রে যদিও, একটি গভীর সমস্যার আংশিক প্রকাশিত রুপ। অনেকটা হিমবাহের সমুদ্রে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র অংশের মত, যেটিকে একবার দেখে এর বিশালত্ব সম্পর্কে কোন ধারনা পাওয়া যাবে না। তবে তিনি এখনি কোন সিদ্ধান্ত নিতে চাইলেন না বরং ডাকনামটির প্রশংসা করে তিনি আলগোছে অভিনেত্রীকে এক কাপ কফি এগিয়ে দিলেন। একই সাথে তিনি জানতে চাইলেন এই মুহুর্তে কোন বিশেষ ধরণের সংগীত তিনি শুনতে চান কিনা। অভিনেত্রী বিশেষ কোন সংগীতের আবদার করলেন না বরং পুরো বিষয়টাকে উপদেষ্টার ইচ্ছের উপর ছেড়ে দিলেন। উপদেষ্টার কাছে এই বিষয়টিও বেশ লক্ষণীয় মনে হল, এ ধরণের আচরণও দুধরণের মানুষ করে থাকেন, প্রথমত যারা সংগীতের বিষয়ে উদাসীন এবং অতিরিক্ত রকমের বস্তুবাদী আর রয়েছেন দ্বিতীয় রকমের মানুষ যারা যে কোন সংগীতের মধ্যেই নিজের আনন্দ খুঁজে পান। তাঁর স্ত্রীটি এই দ্বিতীয় ধরণের মানুষই ছিলেন, উপদেষ্টার মনে হল অভিনেত্রীও হয়ত সেই দলের হতে পারেন। সমস্যার কেন্দ্রটিকে পুরোপুরি চি!ি@@!609309হ্নত করার আগে এবার তিনি আলাপচারিতাকে ঘুরিয়ে দিলেন খানিকটা অন্যদিকে। উপদেষ্টার প্রায় সমবয়সী অভিনেত্রীর কাছে জানতে চাইলেন তার পছন্দের বিষয়গুলোর কথা, জানতে চাইলেন অভিনয় জীবনের কথা। অভিনয়ের প্রসঙ্গ আসতেই অভিনেত্রী এবার যেন গড়গড় করে কথা বলতে শুরু করলেন। উপদেষ্টা বুঝতে পারলেন যে তিনি সঠিক পথ ধরেই এগুচ্ছেন। অভিনেত্রী নিজের অভিনয় জীবনের নানান কথা বলতে শুরু করলেন। উপদেষ্টাকে তিনি জানালেন শৈশবেই পিতামাতাকে হারিয়ে কি কষ্ট করে তিনি অভিনয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে তাকে চলতে হয়েছে তীব্র অর্থ কষ্টের মধ্য দিয়ে, তারপর আস্তে আস্তে জীবনে সাফল্য ধরা দিতে শুরু করেছে, তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, অভিনেত্রী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি জানালেন যখন থেকে অভিনেত্রী হিসেবে তার নামডাক হতে শুরু করেছে তখন অনেকেই তাঁকে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে পাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কারো ডাকেই তিনি সাড়া দেননি। যৌবনের প্রেমিকটির কাছে তিনি জীবনসঙ্গিনী হবার যে কথা দিয়েছিলেন সেটিকে তিনি এখন পর্যন্ত রক্ষা করে চলেছেন। সাধারণত এজাতীয় প্রসঙ্গে অনেক গবেষকই অভিনেত্রীর প্রতি একটু বেশিই সহানুভূতি বোধ করত আর তাঁর সমস্যা সমাধানের বিষয়টিকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিত। কিন্তু প্রজ্ঞাবান উপদেষ্টা গ্রাহকের আবেগ অনুভূতির সাথে ঠিক ততটুকু যুক্ত হন যেটুকু তাঁর সমস্যা সমাধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি সে রাস্তায় গেলেনই না।
এবার সমবয়সী বন্ধুর মত তিনি অভিনেত্রীর কাছে জানতে চাইলেন তার একান্ত শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে। তবে অবশ্যই খুব মার্জিতভাবে এবং প্রসঙ্গটিকে তিনি উপস্থাপন করলেন সামপ্রতিক কালের আবেগগত সম্পর্ক ও সেটির টানাপোড়েন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাকে ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে। সরকারী কর্তব্যাক্তিটির নাম উল্লেখ না করেই তিনি ছেলের বান্ধবীর প্রতি পিতার আকর্ষণের সেই কেইসটিকে অভিনেত্রীর সামনে পেশ করলেন এবং তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। অভিনেত্রী খুব আরামদায়ক আসনটিতে বসে থেকে উপদেষ্টাকে জানালেন যে আকর্ষণ অত্যন্ত বিচিত্র একটি বিষয়। এটির নানান ধরণ থাকা খুবই স্বাভাবিক। তবে ঘটনার কয়েক বছর পর ছেলেটির মৃতু্য সংবাদটি অভিনেত্রীকে বেশ বিচলিত করে তুলল। তিনি এ নিয়ে আর কোন মন্তব্য করতে চাইলেন না। অভিনেত্রী নিজের ঘনিষ্ট শারীরিক অভিজ্ঞতার কথা অকপটে উপদেষ্টাকে বলে চললেন। উপদেষ্টা বুঝতে পারলেন যে যৌনতা বিষয়ক অনেক ধারনাই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বেশ কাছাকাছি এবং সেদিক দিয়েও অভিনেত্রীর কোন অভিযোগ নেই। সম্পর্ক নিয়ে নানান কথা বলতে যেয়ে অভিনেত্রী জানালেন যে তিনি সবসময়ই নতুন নতুন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের চেষ্টা করেছেন। আর অভিনয় করতে যেয়েই তিনি জীবনের অনেক কিছুকে বুঝতে পেরেছেন। অভিনেত্রীর মধ্যে দার্শনিক উপলব্ধির কোন রেশ দেখতে পাবেন তা উপদেষ্টা কখনোই মনে করেন নি। তিনি কিছুটা বিস্মিতও হয়ে উঠলেন। তবে তিনি সবচেয়ে বিস্মিত হয়ে উঠছিলেন নিজের প্রাক্তণ স্ত্রীর সাথে অভিনেত্রীর বসার ভঙ্গি, কথা বলার ধরণ, দার্শনিকতা এসবের মিল খুঁজে পেয়ে।
উপদেষ্টা এবার অভিনেত্রীর সমস্যার সামাজিক ধরণটিকে বুঝতে চাইলেন, কেননা উপদেষ্টার উদ্ভাবনী পদ্ধতির একেবারে মূল জায়গাটি ছিল কোন সমস্যাকে পৃথক পৃথকভাবে তুলনামূলক বিচার করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া। যদিও ইতিমধ্যেই তিনি জেনেছিলেন যে দীর্ঘদিন যাবৎ অভিনেত্রী একজন বিশ্বস্ত চাকরকে নিয়েই বসবাস করছেন এবং তার নানা বয়সী প্রচুর বন্ধু বান্ধবও রয়েছে। তবুও এবার তিনি সরাসরি অভিনেত্রীর দৃষ্ঠিভঙ্গিটা জানতে চাইলেন। একা একা বাস করার ফলে নিরাপত্তাহীন বোধ করেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অভিনেত্রী উত্তর দিলেন একটু ভিন্নভাবে; তিনি বললেন, " এসময়ে সকলেই আসলে নিরাপত্তহীনতার মধ্যেই বসবাস করছে। ফলে তারটিও তেমন ব্যাতিক্রম কিছু নয়। সবাইকেই নিজের রাস্তা বের করে টিকে থাকার বন্দোবস্ত করতে হয়।"
অভিনেত্রীর শারীরিক রিপোর্টটি উপদেষ্টা নিজের কক্ষেই দেখে এসেছিলেন এবং সরকারী গোয়েন্দা রিপোর্টটিতেও তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিপক্ষে কোনকিছুতে যুক্ত হবার অভিযোগ ছিল না। তবুও সরকারী রিপোর্টের উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তিনি অভিনেত্রীর কাছে জানতে চাইলেন কখনো তিনি কোন আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা। পরামর্শক হিসেবে গ্রাহকের কাছে নিজের বিশ্বস্তার বিষয়ে তিনি এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে তেমন কিছু হলে এবার অভিনেত্রী নিশ্চয়ই তা স্বীকার করবেন। কিন্তু উপদেষ্টাকে খানিকটা হতাশ করে দিয়েই যেন অভিনেত্রী কিছু না বলে কেবল একটু হেসে উঠলেন।
উপদেষ্টার অনুমানের চাইতে দীর্ঘ সময় ধরেই সাক্ষাৎকারটি চলছিল। এর মধ্যে দুবার কফির মগ খালি হয়েছে এবং তৃতীয় বারের মত পূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপদেষ্টা অভিনেত্রীর সমস্যাকে অনেকখানি আঁচ করতে পারছেন ঠিকই তবে পুরোপুরি পারছেন না। তবে তিনি অধৈযর্্য হলেন না। অধৈর্য্য অবস্থা মাত্রই তাঁর বিচারবোধকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এছাড়া মানুষের গোপনতম সমস্যাটিকে খুঁজে বেড়ানোর খেলায় তিনি কখনোই ক্লান্ত বোধ করেন না।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


