বিদেশে সবচেয়ে বড় কষ্ট হল আপনজনদের মৃত্যুর খবর। আজ সকালে উঠেই জানলাম নানী আর নেই। আসার সময় দেখাও করে আসতে পারিনি। তার সবচেয়ে আদরের নাতি তার মৃত্যুর সময় তার কাছে নেই। বিদায় জানাতে পারলাম না। ছোট বেলায় কাদার মধ্যে যতবার আছাড় খেয়েছি ততবার ছুটে গিয়ে ধরেছেন। মা আমাকে একুশ দিনের রেখে ইন্দোনেশিয়া যেতে পেরেছিলেন এই নানীর কারণেই। ছোট বেলায় আমার একটা ছোট এলুমিনিয়ামের ট্রাংক ছিল। আমার ছোটবেলার অনেক কিছু তিনি সেটাতে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। একেবারে ছোট বেলার ক্রিকেট ব্যাট, মার্বেল, লাটিম, বই।
তিনি ভীষণ একচোখা ছিলেন যাকে আদর তাকে আদর এবং বাকীরা রীতিমত অনাদর, ম্লেচ্ছ। এরকম মানুষের আদর পাওয়াটা ভাগ্যের। স্বার্থপর আমি আর কষ্টটা এখানেই, আমাকে একচোখা আদরের মানুষটা আর নেই। পরবর্তীতে যাদের আমি ভালোবেসেছি যারা আবার পালিয়ে গেছেন। তাদের সাথে তুলনাটা চলে আসে সহজেই। ফলে একচোখা ভালোবাসাটার অভাব বুঝি খুব ভালোভাবেই। আমাকে ভালোবাসতেন কারণ তার বড় মেয়ের প্রতি তার অপরিসীম নির্ভরতা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা ছিল। আমাকে ভালোবাসতেন কারণ আমাকে তিনি পছন্দ করতেন।
তিনি স্বপ্নবাজ ছিলেন, রূপালী পর্দা খুব টানতো। উত্তম-সূচিত্রা বলতে অজ্ঞান, মিহি সুরে গান গাইতে পারতেন। নানা বিকেলে সিনেমা হলে ঢুকিয়ে দিয়ে আসতো আবার সিনেমা শেষ হলে বাড়ীও নিয়ে আসতো। তিনি তীব্র ছিলেন, ঝাঁঝালোও, অধিকাংশের কাছেই খটমটে। আমার নানা তার সন্তানদের কাছে জনপ্রিয় ছিল; নানী অজনপ্রিয় ছিলেন। নানা মোটেও স্বপ্নবাজ ছিলেন না। নানার শান্তি ছিল। নানীর কখনোই শান্তি ছিল না। নানী প্রতিদিন চাঁদ ভ্রমণ করতেন, প্রায়শই নবীজি তাঁর স্বপ্নে দেখা দিতো। তিনি লোক খাওয়াতে পছন্দ করতেন। তিনি স্বাপ্নিক ছিলেন। আর সেই স্বপ্নই তাঁকে ভীষণ অস্থির রাখতো। পান সুপারি সেই অস্থিরতা নিরসনের একটা উপায় ছিল তবে একমাত্র উপায় ছিল না।
বিদেশে বসবাসের কিছু অমোঘ নিয়তি আছে। দূরত্ব এর মধ্যে সম্ভবত নিষ্ঠুরতম। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম গল্পটার নাম মনে হয় বিচ্ছেদ। যেই মায়ায় আর অশ্রুতে তৈরি এই পৃথিবী সেটা একটা অপারেশনাল টুল মাত্র। প্রবঞ্চনাই মনে হয় বারেবার। যারা অনেক সংযোগ-বিচ্ছেদ, উত্থান-পতন, চড়াই-উৎড়াই পার করেছেন তারা যানেন এর যন্ত্রণাটা কেমন। কেনইবা এত তরঙ্গ কিসের জন্যই বা এই এত অস্থিরতা। আজ আমার মা তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ তার সন্তানের কাছে দিলেন। চক্র বলে একদিন আমিও সেই কাজটাই করবো। আমার সন্তানও। কিন্তু আমার তো কোনকিছু ছাড়তেই ভালো লাগে না। সবাই একসাথে থাকতে পারে না কেন? কেন? কেন?
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০১৫ সকাল ৮:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






