
.
দাদুর বাড়ির অদুরেই সাগর । ঝাউ গাছে সারি এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত । সবুজের বাঁধটি গ্রামটিকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে আজ বহুদিন হলো । এখানকার তটরেখাগুলো কাদাময় , বালু নেই বললেই চলে , ভাটার সময় যতদুর চোখ যায় কাদা আর কাদা । আর এই কাদার পরিধি এতটাই বড় যে , দেখে মনে হয় কাদার বিশাল একটা চাদর গিয়ে বহুদুরের মেঘলা আকাশের সাথে মিশেছে ।
.
হ্যাঁ দৃশ্যটা এমনি ছিল । সময়টা তখন ঝড়ের । গ্রামের এই দিকটা পিকনিক স্পট নয় বলে মানুষের চলাচলটা অনেক কম । আর ঝড়ের সময় বলে মানুষ তো নেই ।বাতাস অদ্ভুত গন্ধ । তখন সবকিছু অস্বাভাবিক , পাখি পযর্ন্ত ডাকছে না । হয়ত বা ঝড়ের কারণে । আর ঠিক এমনই একটা সময়ে আমি ওকে দেখি ।
.
.
.
কুচকুচ কালো গাউনে তীরে হাটছে । সাথে একটা কুকুর । একটু অবাক লাগলো , কুকুরটা যেন একটি নিদিষ্ট দুরুত্ব বজায় রেখে পিছে পিছে হাটছে । বাতাসের তীব্রতা বেড়েছে । কি মনে করে মেয়েটা তার চুলের বাধঁনটা খুলে দিলো । হুস করে ঝলমলে কুচকুচে কালো চুলগুলো বাতাসে উড়তে লাগলো । কি এক আবেদন তার চোখে মুখে । "মেয়ে তুমি কে ?" মনের অজান্তেই কথাটা বেরিয়ে এলো ।
.
.
.
.
মেয়েটা গভীর চোখে তাকিয়ে আছে । চোখগুলোতে তাকাতেই মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেলো । নিজের পায়ে জোর পাচ্ছি না । হাতগুলো অসাড় হয়ে পড়ছে । চোখে ঘুমের আভাস । স্রষ্টা আমাকে এই জীবনে যতগুলো প্রিয়জন বিয়োগের যত ব্যাথা দিয়েছে তাতে আমার নার্ভ নিজেকে ধীরে ধীরে কঠিন থেকে কঠিন করে তুলতে পেরেছে । ফলে আমাকে সহজে কোন ঘটনা বিচলিত করতে পারে না । আর এই ইস্পাত সদৃশ নার্ভের জোরেই আমি নিজের উপর আস্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাই ।
.
মেয়েটার চোখে বিস্ময় ।
"কে তুমি ?"
" প্রশ্নটা তো আমার ছিলো "
" এই এদিকেই আমার বাসা " গম্ভীর । মেয়েটা মিথ্যা বলতে মোটেও পটু না । কথা শুনেই বুঝতে পারলাম ।
" আমি রবি , তোমার নাম ? "
" মায়া "
" কি কর ?"
"একদিনেই কি সব জেনে নিবে ?" বলে একটু হাসলো , তবে হাসিতে প্রাণ ছিল না
" তোমার কুকুরটা কোথায় ?" বলে পিছনে তাকিয়ে দেখি ,নেই !
"চলে গেছে"
.
"আমরা কোথাও কী বসতে পারি ?" সরাসরি তার চোখে দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলাম । প্রথম খেয়াল করিনি মায়ার চোখের কাজল একটু অদ্ভুত ভাবে দেওয়া , রেখাগুলো একটানে কানের উপর পযর্ন্ত এসেছ । উত্তরে মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজলো । এরপর মৃদু ভঙ্গিতে মাথা ঝাকালো ।
.
সময়ের হিসেবে হয়তো ২০ মিনিট কিন্তু মায়ার সাথে কাটানো সময়গুলো যেন অনন্তকাল ধরে চলছিল । মেয়েটা কালো , আমার শরীরের শুভ্র রঙের তুলনায় তো বটে । তবে তার চেহারাটা তার নামের মতই মায়াময় , কোন বিশ্ব সুন্দরীর চেয়ে কম নয় । গায়ে রঙটা যেন মোম পলিশ করা । চুল , কাপড় , চুড়ি এমনি হাতের আংটি পযর্ন্ত কালো । সাদা শুধুমাত্র চোখের সাদা অংশটুকু । এই ২০ মিনিটে আমরা শুধু শান্ত ভঙ্গিতে আমরা শুধু আকাশটাকেই দেখেছি । বৃষ্টি হবে হবে কিন্তু হচ্ছে না । আমাকে শুধু একটি প্রশ্নই করেছে "কি আছে আমার মাঝে ?" উত্তর না দিয়ে উল্টো ওকে বলেছি "কি আছে তোমার মাঝে ? , এত অস্বাভাবিক কেন ? " মাথা নিচু করে ঠোটে কামড়ে বলেছিলো "একটি রহস্য" এরপর এক ব্যাখাতীত র্দীঘশ্বাস ।
.
আর তখনই ভুতের মত উদয় হল কুকুরটি ।
.
কুকুরটিকে এক নজর দেখে "যেতে হবে" বলে বিদায় না নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো ।
"কাল দেখা হবে মায়া ?"
" হতে পারে"
সংক্ষিপ্ত উত্তর
.
.
.
.
সে রাতে আমার ঘুম হল না । স্বপ্ন দেখছি আমি একটা বিশাল ময়দানে দৌড়াচ্ছি , পিছনে হাজারে হাজারে কালো কুকুরের দল । পিপাসায় আমি হাসফাস করছি । এমন সময় কোথা থেকে মায়ার উদয় হয় । ঠিক আমার আর কুকুরগুলোর মাঝখানে দাড়িয়ে গেলো । কুকুরগুলো তাকে অতিক্রম করে আমার কাছে আসতে পারছে না । ভয় পেয়ে মায়াকে ধরলাম ।
.
হাসলো
.
আমি আছি না ? বলে তার ঠোট দুটি আমার ঠোটে চিপসে দিলো । কোমল ভেজা ভেজা সে অনুভুতি ।
.
এরপরই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো । ঘামে সারা শরীর ভিজে ঝপঝপ করছে । জানালায় তাকিয়ে দেখি । তখন সকালের আলো ফুটছে ।
.
.
.
.
.
.
ঝড়ের প্রকোপ বেড়েছে । বাতাসের সাথে বৃষ্টি ছিটে নিচ্ছি । কিছুটা দুরেই সমুদ্র উত্তাল ভঙ্গিতে গর্জন করছে । স্কুল জীবনে ভূগোলের কিছু কথা মনে পড়ছে । প্রশান্ত মহাসাগরে একটা জায়গা আছে , যাকে বলা হয় গর্জনশীল চল্লিশা ওখানে নাকি বাতাসের গতিবেগ সর্বোচ্চ থাকে , ভাবছি এর গতিবেগ কি এই ঝড়ের চেয়ে বেশি ? যদি বেশি হয় তাহলে কতটুকু বেশি ? আর এই অবস্থায় যদি সমুদ্রে ঝাপ দিই তাহলে আমার বেঁচে থাকার চান্স কতটুকু ?
.
নিজের প্রশ্নে নিজেই হাসলাম । জীবনে এতটা মৃত্যু দেখেছি যে নিজের কাছে নিজের জীবনেরই কোন মুল্য নেই ।
.
.
ঝাঁপ দিবার কথা ভাবছো ?
কথাগুলো যেন একদম কানের কাছে । একটু চমকে উঠলাম । "মায়া ! " এত ঝড়ে যে মেয়েটা আসবে বুঝে উঠতে পারিনি ।
.
কথা উত্তর দিলো । শুধু একটা কথায় বলল " আমারও মরতে ইচ্ছা করে " উত্তরে ঠিক কি বলব বুঝছি না ।
.
"কিছু বলবে ?"
.
"আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি " শব্দ করে হাসলো । অবাক দেখলাম এই হাসিতে প্রাণ আছে !
.
"তুমি জানো আমি কে বা কি ?"
.
"জানতে চাচ্ছি না"
.
"জানা উচিত"
.
"তাহলে বলো কি জানাবে ?"
.
"তাহলে শোনো ,আমি ঠিক মানুষ নয় , এমনি আমার ক্যানের কেউ না , আমরা প্রেত পুজারী , শয়তানের আজ্ঞাবহ দাসী । মানুষের বলি আর রক্ত আমাদের খাদ্য , আমাদের অমৃত । শতশত বছর ধরে আমরা বেঁচে আছি । তবে এই বেঁচে থাকাটা যেন কোন বেঁচে থাকা নয় । প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে আমরা অমর হয়েছি তাই প্রকৃতিও আমাদের প্রতি অদ্ভুত প্রতিশোধ নিয়েছে , আমরা ঘুমাতে পারি না , মানুষের খাবার খেতে পারি না , আমরা সন্তান ধারণের সক্ষম না বিধায় আমরা বংশবৃদ্ধি করতে পারি না শুধু একটাই কাজই করতে পারি , আর তা হচ্ছে বেঁচে থাকতে "
.
গলার সুরে কি ছিল জানি না তবে ভয়ের একটা শীতল স্রোত যেন আমার মেরুদন্ড বরাবর নেমে গেলো
.
."ভয় পেয়েছো ?"
.
"পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক"
.
"এত গোপন কথা বলে ফেললে , সমস্যা হবে না ?"
.
"হবে , তারপরও তুমিই একমাত্র যে আমাকে এই গতানুগতিক জীবন থেকে বের করতে পারবে"
.
"কি ভাবে "
"ভালোবেসে"
"তা তো বাসিই"
"আর সেটাই আমি চাই । মানুষ আমাদের সামনেই আসলে সম্মোহিত হয়ে পড়ে , তবে তুমিই একমাত্র যে আমাকে দেখে সম্মোহিত হওনি , আর তখনই বুঝেছি তুমি আলাদা কিছু "
.
হাসলাম । কি অদ্ভুত ! আমি এক প্রেত সাধককে ভালোবাসি ! প্রেত কন্যাকে ভালোবাসি
.
.
.
এরপর থেকে আমরা প্রায় দেখা করতে লাগলাম সৈকতের নির্জন তীরটিতে । আমরা আকাশের কথা বলতাম , ভালোবাসার কথা বলতাম , কখনো বা সন্ধ্যার সময় ছেয়ে যাওয়া লাল কাঁকড়ার দলকে তাড়াতাম । মায়া হাসতো মন খোলা সে হাসি যা সে বহুদিন ধরে হাসতে পারিনি । প্রায় সে আমার হাতটা বসে থাকতো ।
.
হাত ধরে থাকতো যতক্ষণ না ঐ কুলক্ষুণে কুকুরটা এসে হাজির না হত ।
.
.
একদিন হঠাৎ বলল
"আমাকে একটা সন্তান দাও , তোমার সন্তান , আমাদের ভালোবাসার নিদর্শন , তুমিই পারে এই প্রেত কন্যাকে সন্তান দিতে" চমকালাম । মায়া আমার দিকে টলটল চোখে তাকিয়ে ।
.
আস্তে করে ঠোঁটগুলো এসে পড়লো আমার ঠোঁটে । ক্রমশ পিষতে থাকলো শরীর । আর পারলাম না । আমিও তো পুরুষ । তার সুমিষ্ট গিরিখাদে মাঝে মুখ গুঁজে দিলাম । উত্তাপ বেরুতে শুরু করলো শরীর থেকে । দুই নরনারী সেই প্রবাহমান কাল থেকে আসা ঢেউতে গা ভাসিয়ে দিলাম ।
.
.
একসময় থেমে গেলো ঝড় । মায়া মাথাটা আমার বুকে রেখে আকাশ দেখছে । আস্তে করে বললো ভালোবাসি । প্রত্তুস্বরে জবাব দিলাম আমিও বাসি ।
.
হঠাৎ হাজার হাজার কুকুরের শব্দ । চারদিকে থেকে আসছে । মায়া আমাকে জড়িয়ে ধরলো ।
"আমি আছি ,আমি আছি" কোথা হতে ৪টা ছায়ামুর্তি এসে উপস্থিত ।
.
"ছেলেটাকে মরতে হবে"
"তুমি নিয়ম ভেঙ্গেছো"
.
হঠাৎ আমার মাথা ঘুরতে লাগলো । চোখ ঝাপসা আসছে , পড়ে গেলাম । কানে মায়ার চিৎকার শুনছি ।
.
"ওকে ছেড়ে দাও । ওর কোন দোষ নেই "
"মরতে হবে"
"আমি মিনতি করছি ছেড়ে দাও"
" মরতে হবে "
"আমার জীবন থাকতে না"
.
এরপর আমার কিছু মনে নেই । আঁধারে হারিয়ে গিয়েছিলাম ।
.
.
.
.
.
.
.
আজ অনেকদিন পর আবার সে তীরে । ঝড় উঠবে । এমনই একটা দিনে মায়ার সাথে আমার দেখা । মায়া কোথায় গেলো জানি না হয়তো মরে গেছে । সেদিনের পর আমার কবজিতে গোল করে একটা কালো দাগ পড়েছে । হয়তো সেটা রক্ষা কবজ । যার বিনিময়ে সে তার জীবন দিয়ে প্রায়চিত্ত করেছে ।
.
.
.
ঝড় বাড়ছে । বৃষ্টির ফোঁটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে । কিছুটা দুরেই সমুদ্র উত্তাল ভঙ্গিতে গর্জন করছে । স্কুল জীবনে ভূগোলের কিছু কথা মনে পড়ছে । প্রশান্ত মহাসাগরে একটা জায়গা আছে , যাকে বলা হয় গর্জনশীল চল্লিশা ওখানে নাকি বাতাসের গতিবেগ সর্বোচ্চ থাকে , ভাবছি এর গতিবেগ কি এই ঝড়ের চেয়ে বেশি ? যদি বেশি হয় তাহলে কতটুকু বেশি ? আর এই অবস্থায় যদি সমুদ্রে ঝাপ দিই তাহলে আমার বেঁচে থাকার চান্স কতটুকু ?
.
সমুদ্রের পথে এক পা বাড়ালাম .....

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১০:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




