
ভালো মানের নতুন বাংলা লে-আইটে ইউএসবি কি-বোর্ড কিনলাম ৬০০ টাকায় । এখন থেকে মোস্তফা জব্বার সাহেবের পকেটে যাচ্ছে - বেশি না মাত্র ১০-২০ টাকা (বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে কিনলে আরো বেশি) । ওয়েল ১০-২০ টাকা দিলেও আমিও বিজয় ব্যবহার করি না । আমি অভ্রতে লিখি । তবে ব্যক্তিগতভাবে মোস্তফা জব্বার সাহেবকে ধন্যবাদ দিতেই হবে তিন দশক আগে বিজয়ের মাধ্যমে কি-বোর্ডে বাংলা অক্ষর সংযোজন করে বাংলাকে বিশ্বের দরবার তুলে ধরার জন্য । এই বিজয়ের কল্যাণে ম্যানুয়েল টাইপরাইটারদের সোনালী যুগ শেষ হয়েছে । এরপর একচেটিয়াভাবে বিজয়ের রাজত্ব চলেছে । বাংলাতে তার বিজয় সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি পুরো বিশ্বে । কলকাতার দাদারাও এই বিজয়ের গুণমুগ্ধভক্ত । তবে বিজয়ের এই বিস্তৃতি ছিল শুধুমাত্র পেশাজীবী পর্যায়ে । সর্বসাধারণের কাছে বিজয় কখনো পৌছেনি ।

এরপর তার সাম্রাজ্যের ভাগ বসাতে এলো এক মেডিকেল স্টুডেন্ট মেহদী হাসান খান । নিতান্ত শখের বসে বাংলা'কে পেশাজীবী সম্প্রদায় হাত থেকে বের করে সকলের জন্য উম্মুক্ত করে দিলেন । সফটওয়্যারটির নাম রাখা হল 'অভ্র'। এর অর্থ আকাশ। ছেলেটিও হয়তো জানতো না এই অভ্রের জনপ্রিয়তা একদিন আকাশ সমান হবে ।
.
বিজয়ের প্রধান অসুবিধা বিজয় জীবনের বহু মূল্যবান ঘন্টা নষ্ট করে শিখতে হয়। আর অভ্র বাচ্চারাও ঘন্টাখানেক মোবাইল টিপাটিপি করেও শিখতে পারে । আরেকটা সুবিধা হলো অভ্র একদম ফ্রি । যেখানে বিজয় সফটওয়্যার কিনতে হয় (পাইরেটেড কপির হিসাব আলাদা) । তাছাড়া অনলাইনে অভ্র টু বিজয়, বিজয় টু অভ্র কনভার্টার অপশন তো আছেই । কোথাও লিখা পাঠাতে হলে সব সময় অভ্রকে রেফার করা হয় । অনলাইনে লেখা পোস্ট করার ক্ষেত্রে অভ্র এর বিকল্প নেই ।
.
আর্থিকভাবে এই অভ্র আমাদের কতটা উপকারে এসেছে তার একটা ছোট উদাহারণ দিচ্ছি - জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়নে নিবার্চন কমিশন 'বানিজ্যিক বিজয়' এর পরিবর্তে বিনামূল্যে অভ্র ব্যবহার করে । বেঁচে যায় রাষ্ট্রের ৫ কোটি টাকা । ৫ কোটি টাকা হাত ছাড়া হওয়ায় বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি হিসেবে জব্বার সাহেব তীব্র প্রতিবাদ করে জনকন্ঠে বলেন -'বানিজ্যিক বিজয় এর পরিবর্তে বিনামূল্যের অভ্র ব্যবহার করাতে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বিজয়ের ।
.
জব্বার সাহেব স্বাভাবিকভাবে অভ্রের উপর ক্ষেপেছেন। উনি যুগের সাথে তাল না মিলিয়ে টমাস আলভা এডিশনের পথে হাঁটচ্ছেন । টমাস আলভা এডিশন তার বিদ্যুৎ সরবরাহ পদ্ধতির উন্নয়ন না ঘটিয়ে নিকোলাস টেসলারের সরবরাহ পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা ও দোষ ধরতে উঠে পড়ে লাগেন । যুগের সাথে তাল মিলাতে না পেরে তার পদ্ধতি হারিয়ে যায় যেখানে নিকোলাস টেসলার এর পদ্ধতি আজও রাজত্ব করছে ।
.
মোস্তাফা জব্বার অভ্র সম্পর্কে নিয়মিত অভিযোগ - অভ্রের মদদে হ্যাকাররা তার ‘বিজয়’ সফটওয়্যারটি চুরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে (ক্লোজড সোর্স প্রোগ্রাম হওয়ায় যা সম্ভব না)। তিনি অভ্র কীবোর্ডকে পাইরেটেড সফটওয়্যার হিসেবে অভিহিত করেন। কেবল তাই নয় মোস্তাফা জব্বার বিভিন্ন পর্যায়ে ও গণমাধ্যমে অভ্র কর্তৃপক্ষকে চোর বলেন। মোট কথা -কম্পিউটারে বাংলা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য মোস্তফা জব্বার সাহেবের উকিল নোটিশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে আক্রমণের হুমকি ইতাদি স্বাভাবিক ব্যাপার । তবে একটি ঘটনা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে একবার জব্বার সাহেব অভ্রকে বাগে পেয়েছিলেন অভ্র ৪.৫.১ সফটওয়্যারের সাথে ইউনিবিজয় নামে একটি কীবোর্ড লেয়াউট সরবরাহ করার জন্য । মোস্তাফা জব্বার কপিরাইট অফিসে কপিরাইট আইন ভঙ্গের জন্য মেহদী হাসান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর ভিত্তিতে কপিরাইট অফিস খানকে কারণ দর্শাও নোটিশ পাঠায়। পরবর্তিতে মেহদী হাসান খান ও মোস্তাফা জব্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। অভ্র কীবোর্ড সফটওয়্যার থেকে ইউনিবিজয় লেআউট সরিয়ে নেওয়া হয়।
.

বর্তমানে মোস্তফা জব্বার সাহেব প্রতিযোগীতায় টিকতে না পেরে বিজয় প্রকৃত বাংলা ভাষার ধারক ও বাহক, বাংলা ভাষার প্রকৃত বিজ্ঞানসম্মত লেখনি মর্মে প্রচারণা চালাচ্ছেন , রোমান হরফে বাংলা লিখাকে ভাষা শহীদদের অমর্যাদা বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন । সেক্ষেত্রে আমার মতে বিজয় মান্দারিন (চাইনীজ) ভাষার সমগোত্রীয় ।
.
আমি লিখে দিতে পারি- বিজয় সময়ের সাথে তাল মিলাতে না পারলে ৫টা বছর পর বিজয় কেউ শিখবে না । যারা অলরেডি শিখে ফেলেছে কেবল তারাই এত চর্চা অব্যাহত রাখবে । সময় আরো গড়াবে । এক সময়ে সর্বস্তরে বিজয়ের ব্যবহার উঠে যাবে । তবে এর কিছুটা অস্তিস্ত্ব থাকবে আদালত আঙিনায়। টাইরাইটার হাতে সেই বৃদ্ধ জেনারেশনের কাতরে । ঐতিহ্যের নিভু প্রদীপ হাতে ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা জব্বার সাহেব,
বর্তমানে আপনি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ মন্ত্রী হয়েছেন । আপনাকে সাধুবাদ জানাই । আমি জানি এই সুযোগে অভ্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া আপনার জন্য অনেক সহজ । তবে আমি চাই আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হোক । আপনার মাধ্যমে বাংলা ভাষা সামনে এগিয়ে যাক । সর্বস্তরে বাংলা ভাষা পৌঁছে যাক। আপনি বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারণের মাধ্যম হন । শত বছরের জরাজীর্ণ ঐতিহ্যের বটগাছ হয়ে পথ রুদ্ধ করে সকলের ঘৃণার পাত্র না হওয়াই উত্তম ।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




