somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রামগোলাম - বুক রিভিউ

২৪ শে নভেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৪:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক নিশ্বাসে শেষ করলাম হরিশঙ্কর জলদাসের লেখা ‘’রামগোলাম’’ । এ এমন এক কাহিনি যা আমাদের চোখের সামনে থেকেও সামনে ছিল না, দৃষ্টির আড়ালে থেকে গেছে সব সময়। তাদের দেখে নাই এমন মানুষ পাওয়া ভার কিন্তু তাদের সম্বন্ধে জানে এমন মানুষ পাওয়াও দুষ্কর।এখন মনে হচ্ছে সাম্যের কথা বলে, সমান অধিকারের কথা বলে গণত্রন্ত্রের কথা বলে যখন গলা ফাটাই আমরা তখন এরা বোধহয় আমাদের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি দেয়। কারন আমাদের সাম্যের বানীতে, আমাদের সমান অধিকারের প্রশ্নে কখনই তাদের কথা থাকে না।তাদের চোখে আমরা প্রত্যেকে এক একজন আপদমস্তক ভণ্ড।আপনি আমি তুই তুমি সবাই। হরিশঙ্কর জলদাস এমন এক শ্রেণী নিয়েই লিখেছেন। বলেছেন সমাজের অচ্ছুৎ, যাদের ঘৃণা করতে হিন্দু মুসলিম এক হয়ে যায় তাদের কথা, মেথরদের কথা। যাদের আমরা মানুষ বলে মনে করি না।

লেখক মেথরদের আদি থেকে বর্তমান সব কথাই প্রায় সমান ভাবে বলে গেছেন। হিন্দু পুরাণ মতে ব্রহ্মা নাকি শুধু বিষ্ঠা সাফ করানোর জন্য নিজের শরীরের ময়লা থেকে মহীথর সৃষ্টি করেছিলেন । তাদের নিযুক্ত করলেন মানুষের ময়লা পরিষ্কারের কাজে। সেই থেকে তারা এই কাজ করে যাচ্ছে। আর তারা হয়ে রইল অচ্ছুৎ হিসেবে। বইয়ের পাতায় পাতায় এসেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে কিভাবে তাদের কে বন্দি করে রাখা হয়েছে তার বিবরন। মনুসিংহতায় কিভাবে তাদের ছোট করা হয়েছে তা বর্ণনা হয়েছে দারুন সুনিপুন ভাবে। মনুসিংহতার প্রতি তীব্র কটাক্ষ করে গুরুচরনের জবানীতে লেখক লিখেছেন - “ওই মনু লিখেছে ব্রাম্মণের ঘর থাকবে পাঁচটা, ক্ষত্রিয়দের ঘর হবে চারটা, বৈশ্যরা তিনটি ঘর বাঁধতে পারবে, ইচ্ছে করলে বা সামর্থ্য থাকলেও দুইটার বেশী ঘরের মালিক আমরা হতে পারবোনা ’’। কি অব্যাক্ত কষ্ট ফুটে উঠেছে এ কথায় তা হয়ত আমাদের মত তথাকথিত ভদ্র সন্তানরা বুঝে উঠতে পারব না।
ময়লা পরিষ্কার করার জন্য কানপুর, এলাহাবাদ প্রভৃতি জায়গা থেকে এই সম্প্রদায়কে মোগল নবাব আর ইংরেজরা এ দেশে এনেছিল।কর্ণফুলী নদির তীরে পাঁচ তালা দুইটা বিল্ডিং। মেথর কলোনি। আর এই কলোনি ঘিরেই উপনাসের কাহিনী এগিয়েছে। তাদের আবাসন সঙ্কট,তাদের ধর্মের উপরে হস্তক্ষেপ, তাদের মদে চূর হয়ে থাকা, বঞ্চনা, প্রতারণা প্রেম সব উঠে এসেছে উপন্যাসে। তাদের জীবনের কাহিনী বর্ণনা হয়েছে দারুন মুনশিয়ানায়। মেথরদের সঙ্গে থেকে, একদম কাছ থেকে দেখে লিখেছেন লেখক হরিসঙ্কর জলদাস।

উপন্যাসে বর্ণনা হয়েছে তিন প্রজন্মের কথা।এদের কথার মাঝেই উঠে এসেছে মেথর সমাজের ক্ষোভ ঘৃণা ভালবাসার কথা। দাদা গুরুচরন মেথর সমাজের সর্দার ছিলেন।তিনি তার ক্ষমতা হস্তান্তর করেন নাতি রামগোলামের হাতে। কর্পোরেশনের চাকরি সবার জন্য উম্মুক্ত করে দেওয়া হবে, এই কথা যখন প্রচার হয় তখন যে আন্দোলন তৈরি হয় তার মাঝেই রমাগোলাম কে দেখা যায় নেতৃত্ব দিতে।কিন্তু রামগোলামের আন্দোলন বা গুরুচরন যে আন্দোলন করছে তা অন্য কোন আন্দোলনের সাথে তুলনা করা চলে না। এখানে যাদের নিয়ে আন্দোলন, যাদের অধিকারের জন্য আন্দোলন তারা অতি সহজেই সব ভুলে যায়, ভুলিয়ে দেওয়া যায়, অতি সহজেই গলায় পা দিয়ে মেরে ফেলা যায় ন্যায্য আন্দোলন কে।ধর্মের আফিম এখানেও চলে দারুন ভাবে, এর ব্যাবহার সমান ভাবে কার্যকর । আরেক হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে সারা জীবন যে মেথরদের কে অচ্ছুৎ বলে দূরে দূরে রাখা হলো তাদের কাজ কে যখন উম্মুক্ত করে দেওয়া হলো তখন হিন্দু মুসলিম সবাই ঝাপিয়ে পরল এই চাকরি নিতে।শেষ পর্যন্ত তথাকথিত ভদ্রলোকরা তাদের চাকরিতে যোগ দিয়েছে কিন্তু এক অদ্ভুত নিয়মে। অর্ধেক বেতন নিয়ে নেয় আমাদের এক শ্রেণীর ভদ্রলোক আর মেথররা নেয় অর্ধেক বেতন।কাজ মেথররাই করে, কলোনিতে মেথররাই থাকে কিন্তু বেতন পায় অর্ধেক!! ঘৃণা আসলে কাদের করা উচিত?

রামগোলাম বইটি ২০১২ সালে একুশে বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছিল। সিটি - আনন্দ আলো পুরস্কার প্রাপ্ত এই বইটি পাঠক মাত্রই অবশ্যই পাঠ্য বলে মনে করি।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ১২:০৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২


একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা
শুধু ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলাই নয- বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১৯৮৮ সাল থেকে আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×