somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

[গল্প] বার্তাবাহক

২১ শে জুলাই, ২০১৪ দুপুর ১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[এক]

অনেক কাল আগের কথা।

তখন পৃথিবীতে খুব খারাপ অবস্থা।মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে না,ঠগ জোচ্চোরে ভরপুর।

খুন,রাহাজানি,ব্যভিচার এসব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।এমন অবস্থার সৃষ্টি হল যে মানুষ আর পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকল না! তাদের ধারনাই থাকল না যে তাদের কোন সৃষ্টিকর্তা আছেন!এভাবে দুর্নীতি,বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষেরা নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনতে লাগল।

এদিকে সৃষ্টিকর্তা পড়ে গেলেন মহা দুশ্চিন্তায়!

অবুঝেরা করে কি!!! এখুনি কিছু না করলে এরা তো দুনিয়াতে কিছু অবশিষ্টই রাখবে না।ভৃত্যদের ডাকলেন তিনি।তাদের সাথে মাঝেমধ্যেই আলাপ-আলোচনা করেন তিনি,অবশ্য তার মানে এই নয় যে তাদের পরামর্শ তাঁর দরকারই! তাঁর একান্ত ভৃত্যদের বেশীরভাগই পৃথিবীতে মানুষদের থাকা নিয়ে আপত্তি করে,তাদের মতে এমন অবুঝ জাতি কিজন্যে দরকার যারা 'যার খায়,যার পরে' তাকেই ভুলে যায়!এদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি!

একথা শুনে ভৃত্যদের অজ্ঞতায় সৃষ্টিকর্তা মনে মনে শুধু হাসেন।

সৃষ্টিকর্তা অর্থাৎ ঈশ্বরকে অনেক ভৃত্যই অনুরোধ করল মানুষদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেবার অনুমতি দিতে।ঈশ্বরের এক ইশারাতেই মানবজাতির অহংকার ধূলিসাৎ করে তাদের অবস্থা পালটে দেবে তারা,শিখিয়ে দেবে মনিবকে ভোলার পরিনতি!

কিন্তু সৃষ্টিকর্তা দয়াবান।উনি এমন একটা পরিকল্পনা করলেন যাতে মানুষদের শাস্তিও না পেতে হয় আবার তারা তাঁকে যেন স্মরণও করে।যে ভাবা সেই কাজ!! নিজের কথা বলার জন্য ঈশ্বর এবার একজন মানুষ বানালেন যে তাঁর কথা সবাইকে জানাবে,মনভোলাদের ভুল ভাঙাবে,দুনিয়ার আঁধার সরাবে।

মানুষদের মধ্যে গিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করবে।

তিনি এই বার্তাবাহকের নাম দিলেন 'প্রশংসাকারী',আর তাকে স্বর্গ থেকে পাঠিয়ে দিলেন অন্ধকার ধরায়!

[দুই]

ধুলি ধূসরিত দুনিয়াতে তখন অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে!

মানুষের অবস্থার চরমতম অবনতি হয়েছে।পৃথিবীতে যখন গরীবদের জীবন রাস্তার ময়লার সমান ধনীদের কাছে,মেয়েদের সম্মান যখন সর্বজন বিস্তৃত তখনই ঈশ্বরের বার্তাবাহক জন্ম নিলেন মরুভূমিবেষ্টিত এক স্থানে।জন্মেই বাবা মাকে হারিয়ে ফেলেন শিশুরুপি বার্তাবাহক।দাদা চাচাদের কাছে মানুষ হতে থাকা শিশুটি ধীরে বালকে পরিনত হলেন।চারপাশের জঘন্য পরিবেশ,খুন,যুদ্ধ,রক্ত তাঁকে নাড়িয়ে দেয়।নানাভাবে চেষ্টা করেন যাতে এই খুনখারাবী,অনিয়ম ঠেকানোর ব্যাপারে কিছু করা যায়!!ঈশ্বরের বার্তাবাহক হলেও পরিনত ও বিপদের মুখোমুখি হবার জন্য উপযুক্ত বয়স না হলে তাঁকে কিছু জানাবেন না এমন অভিপ্রায় ছিল ঈশ্বরের।তাই স্বাভাবিক বুদ্ধি দিয়েই অন্যায়কারীদের ঠেকাবার প্রয়াস করে যেতে হচ্ছিল বালককে।

কিন্তু কে ঠেকাবে ওদের! মানুষ যে পৃথিবীতে তখন প্রায় নেই।সব ত ইন্দ্রীয়সর্বস্ব আর বিবেকবর্জিত জানোয়ার।রক্তস্নান যেন তাদের আনন্দ,বাচ্চা মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলা তাদের খেলা!!!!!

গরীব মানুষ,দাসদের মরুভূমিতে তপ্ত বালুতে পুড়ানো ওদের অবসর যাপন।

আর্তনাদ ওদের সঙ্গীত,মৃত্যু ওদের বিনোদন।

নিজে থেকে ছোট ছোট ভাল কাজ ,মানুষকে সাহায্য করতেন বার্তাবাহক।কিন্তু তাতে কি!!!

এক পেয়ালা পানিতে কি আর মরুভূমি ভেজে!!!!!!

চলতে থাকল অনিয়ম,যুবক বয়সে ব্যবসা বানিজ্যেও একই ব্যাপার দেখলেন সেই বার্তাবাহী।সততা কোথাও নেই।এমনি এক ব্যবসায়িক যাত্রার সময় এক পাদ্রী তাঁকে দেখে অদ্ভুতভাবে বলেছিলেন,'তোমাকে তিনি পাঠিয়েছেন।তুমি এক বার্তাবাহক।' শুনে খুবই অবাক হয়েছিলেন তিনি!

যাইহোক,মানুষের আচরন দেখে উনি ভাবলেন এই কি জীবন !ভাবলেন এভাবে থেকে লাভ কি!! আর আমাদের যদি কোন প্রভু সৃষ্টি করেই থাকেন তাহলে এসব দেখে কেন কিছু করছেন না!!কেন তিনি চুপ আছেন!! এসব ভেবে মনমরা থাকতেন তিনি।তার সততা দেখে তাঁর ব্যবসায়িক মনিবের[যে মহিলার ব্যবসা সংস্থার জন্য কাজ করতেন] সাথে তাঁর বিয়েও হয়ে গেল!! কিন্তু কোথায় সংসার,তাঁর মনোযোগ নেই!! একবার জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণায় তিনি সংসার ছেড়ে এক পর্বতে চলে গেলেন।একমনে বসলেন ধ্যানে।কোথায় স্রষ্টা,তাকে এবার দেখা দিতেই হবে!!

দশ বছর হল!!চিন্তায়,স্মরনে সৃষ্টিকর্তাকে না জেনে,না বুঝে হলেও ডাকলেন তিনি।

তবে শেষ পর্যন্ত নড়ে উঠল দয়ার সাগর...।সাড়া দিলেন প্রভু।

[তিন]

তাঁর প্রধান আর সর্বাপেক্ষা প্রিয় ভৃত্যকে ডাকলেন ঈশ্বর ।বললেন,

'যাও ,আমার বার্তাবাহকের কাছে যাও...জানাও আমার কথা,সেই বার্তা শুনিয়ে দাও যা সে পৌছে দেবে সমগ্র ধরায়।'

ঈশ্বরের প্রিয় ভৃত্য,কি বিশাল তাঁর কায়,সত্তর হাজার ডানা তাঁর।

দানবের চেয়ে বিকট আবার অদ্ভুত সুন্দর দেবদূত তিনি।মনিবের আজ্ঞায় ভীষন বেগে মর্ত্যে নামলেন তিনি।স্বর্গ থেকে অসহ্য আলো নেমে আসল মরুভুমির আধার পাহাড়ে!!

অতিকায় দেবদুত সম্ভাষন জানালেন ধ্যানমগ্ন মানুষটিকে।দেবদূতকে দেখে,তার আলো দেখে প্রচন্ড ভয় পেলেন তিনি!!!আত্মা যেন বেরিয়ে যায় তাঁর! এ দেখে দেবদূত তাঁর আকার ছোট আর জ্যোতি কমিয়ে আনলেন,এতেও ভয় যাচ্ছেনা দেখে বললেন,

'আপনি ভয় পাবে না।আমি ঈশ্বরের দাস,আমি তাঁকে অস্বীকার কারীদের আতঙ্ক।আপনি ঈশ্বরের প্রশংসাকারী।আমাকে উনি পাঠিয়েছেন আপনাকে বার্তা দেবার জন্য।'

উনাকে নির্ভয় করতে উনার সাথে কোলাকুলি করলেন।কিন্তু তাতে কি!!! দেবদূত দেখলেন ঠকঠক করে কাঁপছে মানুষটি।জ্বর এসে গেছে,ভয়ে সাদা হয়ে গেছেন এরকম অস্বাভাবিক বিষয় দেখে!! আবারো উনাকে আশ্বস্ত করে দেবদূত বললেন,

'আপনি পড়ুন আপনার প্রভুর নামে...'

বার্তা বলতে লাগলেন দেবদুত,আর মন্ত্রমুগ্ধের মত তাই শুনে পাঠ করতে লাগলেন মানুষটি।

পড়ানো শেষ করে আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তীব্র আলোর বিচ্ছুরনে স্বর্গে মিলিয়ে গেলেন দেবদূত!

যে কয়েক লাইন বাক্য শিখেছেন তাই আওড়াতে আওড়াতে বাড়ি চলে গেলেন বার্তাবাহী।

মনে ফিরল স্বস্তি,জানলেন সৃষ্টিকর্তার পরিচয় ঐ কয়েক লাইনে!! শুরু করলেন করলেন প্রচার।নামলেন এক অসম্ভব অভিযানে,মানুষকে সৃষ্টিকর্তার পরিচয় পুনরায় জানাতে উঠে পড়ে লাগলেন...।

সৃষ্টিকর্তাই শুধু জানেন আরো কত ভয়ানক পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে।তবে সে বার্তাবাহক পারবেন,তার প্রতি সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাস আছে।পারতে তাঁকে হবেই।পাহাড়ের গুহা থেকে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে পৃথিবীর প্রতি কোনায় ,প্রতি ঘরে!!

নাহ,এই বার্তা বলতে আর ভাল লাগছে না!!বরং সুন্দর নামটাই বলি।

সেই বার্তাবাহক মানে নবীজি মোস্তফা (সাঃ) প্রতি ঘরে পৌঁছে দেবেন কোরআনের বাক্যগুলো আর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে শান্তি,বাতাসে ভেসে বেড়াবে প্রতিটি কথা।

আজ ১৪০০ বছর পেরিয়ে গেছে।

পুঁথি থেকে উইকিপিডিয়া সব জায়গায় সেই বার্তাবাহকের নাম।

তাহলেই নিশ্চয় উনি সফল হয়েছেন !

হয়েছেন বৈকি!!

পুনশ্চঃ রাসুল (সাঃ) এর উপর ২৩ বছর ধরে কোরান নাযিল হয়েছিল।আর রমজানের শেষ দশদিনের কোন বিজোড় দিনে তা সম্পুর্ন হয়।এই দশ দিন তাই মুসলমানদের নাযাতের দিন।এখন চলছে সেই দশদিন।

চলুন ঘরের কোনায় পড়ে থাকা ধুলিমাথা কোরান শরীফটা খুলে দেখি,আরবী না পারলে বাংলা দেখে হলেও একবার বার্তাগুলো পড়ে দেখি।ভালো লাগতেও পারে!!

[বি।দ্র- প্রশংসাকারী অর্থ মুহম্মদ যা নবীজির নাম,দেবদূত হল আল্লাহর দূত জীব্রাঈল (আঃ) যিনি নবীজির কাছে কোরান নিয়ে আসেন।আর আল্লাহর পরিবর্তে সৃষ্টিকর্তা শব্দটা কেন ব্যবহার করেছি সেটা আপনাদের চিন্তার কাছে ছেড়ে দিলাম]

৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×