somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারোনিকা

০৭ ই মার্চ, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রিবিয়েতা তেলিফোনু! আখরান(হোস্টেলের গার্ড) মহিলা তার বিশাল বপু নিয়ে শিম্পাঞ্জির হেলে-দুলে চলেন! দৌড়াইলে ব্যাপারটা হয় দেখার মত-তবে আমাদের কদাচিৎ সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর দৌড় দেখার। সাকুল্যে জনা-বিশেক বাংলাদেশী আর পাঁচজন শ্রীলঙ্কান মিলে মাত্র পচিশজন বিদেশী ছাত্র নিয়ে তাঁর সংসার! আমাদের ফ্লোরে গেস্ট বিশেষ আসেনা বললেই চলে। এ-দেশী ছাত্রদের এখানে আসা বারণ!( তবে আমাদের যখন তখন তাদের ওখানে যেতে মানা নেই) আমরাও রুশ ভাষা বুঝি কম তাই আখরান মহিলার সাথে আসতে যেতে হাই-হ্যালো হয় শুধু! এই ঠাণ্ডায় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরেই বা যায় কে। তাই সারাদিন চুপ চাপ বসে থেকেই তাঁর কেটে যায়- দুর থেকে শুধু ভারি চশমার ফাঁকে আমাদের ছেলে মানুষি দেখে কুট কুট করে হাসেন। মাঝে মধ্যে অবশ্য নাতি কিংবা মেয়েটার সাথে টেলিফোনে গুজুর-ফুসুর চলে।
এই ভদ্রমহিলা কিন্তু সবার নাম জানেন! খানিকটা দূর থেকে কাঁচ ঘেরা ঘরে বসে মা-নানী-দাদীর স্নেহ আদর ভালবাসা মেশানো দৃষ্টি নিয়ে সারাক্ষণ আমাদের নজরে রাখেন।
আমাদের দরজায় এসে টোকা দিতেই রুম মেট দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল; আখরান মহিলা হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে জিগ্যেস করল, তপন কোথায়? নাম শুনেই আমি লাফ দিয়ে উঠে দাড়ালাম – লম্বা দুই লাফ দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে শুধালাম, কার টেলিফোন?
মহিলা ফিক করে হেসে বলল, তিবিয়া!
আমি শুনেই ঝেড়ে দৌড় –তাঁর কাঁচ ঘেরা রুমের দিকে। লাইন কাটার আগেই ধরতে হবে। ফোন উঠাতেই ওপাশে রুশীয় নারী কন্ঠ!
-আ-লো’ (হ্যালো)
প্রতিউত্তরে আমি বললাম, দা...’(হ্যাঁ)
-এতা তপনা গাভারিত? ( ইনি কি তপন বলছেন?)
-দা’ (ভাষার দৌড় তখন ওই ‘ দা’ পর্যন্ত!)
বেশ খানিক্ষন দা-নিয়েত (হ্যাঁ-না) করে বুঝলাম, বাংলাদেশে লাইন পাওয়া গেছে- আমাকে এক্ষুনি টেলিফোন এক্সচেঞ্জে যেতে হবে ।
রাত এখন আটটা বাজে প্রায়! শীতের দিনে রাত গভীর-ই বলা চলে। কিন্তু আমাকে ঠেকায় কে। আহা কতদিন বাদে লাইন পেয়েছি। এদেশে এসে অব্দি বন্ধু-ইয়ার-পরিজনের সাথে মন খুলে কথা বলতে পারিনি। গত সাত আটদিন ধরে এক্সচেঞ্জে গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকি। এক্সচেঞ্জের মেয়েগুলোর ডায়াল ঘোরাতে ঘোরাতে গোলাপি আঙ্গুল ফেটে রক্ত বেরুনোর উপক্রম হয়ে যায়; তবু লাইন মেলে না। মাঝে মধ্যে অবশ্য হাঁক ছেড়ে বলে, রিবিয়েতা – বাংগুলাদেস, পাঁচ নম্বর!
***
য়েটিং রুমটা বেশ ঠান্ডা! হিটিং সিস্টেমটা মনে হয় নষ্ট হয়ে গেছে। এ ঠাণ্ডায় জুবুথুবু মেরে বসে থাকতে থাকতে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। বাংগুলাদেশ শুনেই আমি তড়াক করে উঠে দৌড়ে যাই 'বুথ নম্বর পাঁচে'।
-কিসের কি?!! শুধু খ্যাস খ্যাস শোঁ শোঁ শব্দ...
আমার হতাশ চেহারা দেখে ওরা বেশ বিব্রত হয়! তবে ফের নতুন উদ্যোমে শুরু করে। এই সাত দিনে কমপক্ষে ত্রিশ ঘন্টা ওখানে বসে ছিলাম!
বাইরে নিদেনপক্ষে মাইনাস পনের! ইনার, জিন্স, গেঞ্জি, সোয়েটার, ওভারকোট, মাফলার, পশমের টুপি, দু-জোড়া টার্কিশ মোজা,বুট পরে রাস্তায় নামতেই পনের বিশ মিনিট শেষ। কয়লার ইঞ্জিনের মত নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করতে করতে ছুটলাম পোচ্তা বা এক্সচেঞ্জের (দুরভাষা দপ্তরের) উদ্দ্যেশে!
বরফ ঢাকা পিচ্ছিল রাস্তা- খানিকটা হেটে খানিকটা স্কেট করে চললাম, টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সদর দরজা খুলে ঢুকতেই মিস্টি সুবাস নাকে এল!
মুল অফিসের ছোট্ট জানালাটা দিয়ে নজরে এল ‘ভারোনিকা’র উজ্জ্বল মুখাবয়। বাইরের এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটা ওর মুখে লাগতেই আমার দিকে তাকিয়ে ঠোট বেঁকিয়ে হাসল!
বলল, -বসো। লাইন কেটে গেছে আবার ট্রাই করছি!
এই রে কাম সেরেছে!
ফের সেই অপেক্ষা!!! তখনকার দিনে বাংলাদেশে ল্যান্ডফোনের একটা লাইন পাওয়া বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার ছিল! বড় অঙ্কের টাকা-পয়াসার ব্যাপারতো ছিলই তার উপরে তদবির আর বছরের পর বছর অপেক্ষা, কার বাসায় টেলিফোন লাইন থাকা মানে তিনি এলিট শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত, আমাদের ফ্যামিলি তখন ঢাকায় ভাড়া থাকে। নিজেদের ফোন ছিলনা- ভরসা ছিল বাড়ির মালিকের ফোনটা। তার আবার বিশেষ সময় বাধা ছিল। তবে বিদেশের ফোন হলে খানিকটা ছাড় দেয়া হত।
এত ভারি পোশাকের ফাঁক গলেও শীতে কামড় বসাচ্ছে- বসে থাকতে থাকতে হাত পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে! মাঝে মধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছি সে মেয়েটার প্রানন্তকর চেষ্টা। এখানে আমরা দুজন মাত্রই প্রাণী! ওর পৃথিবীতে শুধু আমিই একমাত্র গ্রাহক যেন-আর আমাকে নিয়েই ওর মরণপণ যুদ্ধ! আমার নিজের কষ্ট ছাপিয়ে ওর জন্য এখন খারাপ লাগছে , একহাতে রিসিভার কানে চেপে অন্য হাতে ঘন্টার পর ঘন্টা ডায়াল ঘোরানো খুব আরামদায়ক কাজ নয়।
এর মধ্যে কয়েকবার চোখে চোখ পড়েছে – সলজ্জ করুনা মিশ্রিত হাসি তার। খানিকটা অপরাধ বোধও...
রিবিয়েতা, ভারোনিকার সুরেলা ডাকে আমি চমকে উঠলাম, ভেবেছিলাম লাইন পেয়েছে? কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই সে কাঁচ ঘেরা জানালার দিকে ইশারায় ডাকল, আমি ধীর পায়ে কাছে যেতেই, খুব সংকোচে খানিকটা ইশারায় আর খানিকটা রুশ ভাষায় বোঝাল ; তোমার ঠান্ডায় খুব কষ্ট হচ্ছে না? আসো ভিতরে এসে বস, এখানে রুম হিটার আছে!
***
ভারোনিকা এত বেশী রূপসী যে ছয় হাত দূর থেকে ওকে দেখে শরির কাঁপে- কাছে গেলে নিশ্চিত নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। এর থেকে এই স্যাঁতস্যাতে ঘরে শীতে জমে যাই তাই ভাল। ওর রূপে স্নিগ্ধতা আছে কিন্তু শীতল আগুনও যে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারতে পারে সেটা তাঁকে এত কাছ দেখার আগে আমার ধারনা ছিল না।




সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:১৭
২৩টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অপারেশন ইকারুস: বালির নীল গোলকধাঁধা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:১২



কুয়ালালামপুর অপারেশনের ঠিক সাতদিন পর। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের ‘নগুরা রাই’ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন একটি প্রাইভেট চার্টার্ড বিমান ল্যান্ড করল, তখন বালির আকাশ জুড়ে গোধূলির রক্তিম আলো।

বিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

যদি কামের কাম না হয়, সংখ্যা দেখলে বিগাড় ওঠে

লিখেছেন অপলক , ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:২২



বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিকেল বর্তমানে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট। এতেই রুগিরা সেবা পায়না, অপরিচ্ছন্ন, লোকবল নেই, যন্ত্রাংশ নষ্ট, ওষূধ নেই, ১৫০০ শষ্যাবিশিষ্ট করে লাভ কি? সেবা নিশ্চিত হবে না...

এখন ডাক্তাররা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি কার জন্য বাঁচো? কীভাবে এ-আই দিয়ে কভার সং তৈরি করি?

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩৩

প্রথমত, এ-আই দিয়ে গান তৈরি করা অনেক সহজ। আপনি নিজে কোনো লিরিক না লিখে, কোনো সুর তৈরি না করেও এ-আই-তে প্রম্পট দিয়েই গান তৈরি করে ফেলতে পারেন। তবে সেটা আপনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পলাশবাড়ীর মূর্তি বিতর্ক, ধর্মীয় স্থাপনার আড়ালে কি অন্য কোনো নীলনকশা?

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:১৪

সাম্প্রতিক ভূরাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সমীকরণে হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারবা অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্যবস্তু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ফাটল ও অননুমোদিত কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালো লাগে

লিখেছেন আরমান আরজু, ২০ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৮
×