somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জন্মদিন

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ফেসবুকে হঠাৎ করে চোখে পড়ল পরিচিত এক ভদ্রমহিলার বাচ্চার জন্মদিনের ছবি । নিজের শিশুবেলা মনে পড়ে গেল । ব্যক্তিগত ভাবে আমি আর জন্মদিন নিয়ে উৎসাহ পাই না আজকাল । ফেসবুকে জন্মদিনে উইশ করার একটা নর্ম তৈরি হয়েছে অনেকদিন - খুব কনভেনিয়েন্ট, খুব গৎবাঁধা, সস্তায় শুভেচ্ছা সরবরাহ করার সুব্যবস্থা । কেউ লেখে শুভ পয়দা দিবস , কেউ লেখে এইচ বি ডি, পুরো শব্দটা ব্যবহারে যেন কিছু অতিরিক্ত আন্তরিকতা খরচ হওয়ার ভয় । দেয়াল ভর্তি করে সোশ্যাল নর্মে কনফর্ম করার হিড়িক - খুব বাজে ঠেকে আমার । নিজের জন্মদিনটা আড়াল করে রেখেছি তাই । ফেসবুকের নানা উপরোধেও তাই অন্যের জন্মদিনে শুভেচ্ছা পাঠাতে আমার বড়ই অনীহা । খুব কাছের কেউ হলে ইনবক্সে অথবা ফোন করে খোঁজ নেই - উইশ করি ।

বয়স বেড়ে চলার সাথে সাথে জন্মদিনটা খুব ছোট পারিবারিক বৃত্তে চলে এসেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকতে বন্ধুদের খাওয়াতে হতো । সবাই কর্মজীবী হয়ে যাওয়াতে সেই দাবী গুলো আর ওঠে না সেভাবে এখন । বাবা মা র ভালোবাসায় অবশ্য কমতি থাকে না, সন্ধ্যায় একটা কেক, রাতের বেলায় একটু ভালো মন্দ - বয়সী ছেলে কে কি উপহার দেয়া যায় তার চিন্তায় কতকটা উচাটন হওয়া - ওটুকু এখনো আছে । কিন্তু ছোট বেলার সেই উত্তেজনাটা হারিয়ে গেছে কোথায় ! আমি জানি অবশ্য - বাংলাদেশের সামগ্রিক ছবি বিবেচনায় আমরা অনেক সৌভাগ্যবান - আর জন্মদিন পালনের এই চল, সেও মধ্যবিত্ত আর উচ্চ মধ্যবিত্ত ভিত্তিক , অন্তত আমাদের দেশে ।

শিশু বেলার জন্মদিন মনে পড়ে, একটু বয়েস হওয়ার পর, মানে "অবোধ" বয়স টা কেটে যাওয়ার পরে - জন্মদিনে আগ্রহের একটা বড় কারণ ছিল "উপহার" পাওয়া - বিশেষত গল্পের বই । আমি অক্ষর চিনে চিনে পড়তে শিখেছি চার কি পাঁচ বছর বয়সে - গল্পের বই পড়ার বিষয়টা মাথায় গেঁথেছেও ঐ সময় । আশি-নব্বই দশকের আরও অনেক শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোন, বৈঠকখানায় একটা শোকেসে কিছু কাঁচের প্লেট গ্লাসের সাথে বেশ কিছু বই স্থান পেতো (সেই সাথে একটা বিছানা, একটা টেলিভিশন) । যদিও তার বেশির ভাগই "ছোটদের" পড়া বারণ ছিল - আর কেবল পড়তে শেখা মানুষটির জন্য দুর্বোধ্যও বটে । কিন্তু সে যাই হোক, ওই যায়গাটুকুই আমার আগ্রহের কেন্দ্র ছিল সেই বয়সে - কারও বাড়ী গেলে ওই বইয়ের সংগ্রহটুকুর চারপাশে ঘুরঘুর করতাম - একটা তাল থাকতো এদের বাড়ী থেকে কোন বইটা নেয়া যায় ! কেউ হয়তো এতে ভুল বুঝতে পারে এতে । অত ছোট মানুষের কাছে "বিনা শাস্তি তে " পড়া যেতে পারে এমন বইয়ের অ্যাকসেস বেশী একটা ছিল না । বাবাও অত বই কিনে দিতেন না পড়াশুনার ক্ষতি হবে সেই ধারণায় । আর আমার একটা রোগের মতো ছিল, পড়তে শেখার পর থেকেই আশে পাশে যা পেতাম পড়ে ফেলতাম - ইত্তেফাকের খেলার আর সাহিত্যের পাতা শেষে বিজ্ঞাপনের পাতাটাও নজর বুলিয়ে, বিকালটাতে একটা হাহাকার পড়ে যেত মনের ভেতর, কারণ আর কিছু পড়তে পারছি না। তাই অন্যের বাড়ী থেকে বই নিয়ে আসার একটা প্রচ্ছন্ন আগ্রহ থাকতো । আর সেই মানুষ গুলোর সাথেই খাতির হতো যারা বই পড়তে ভালবাসে, যাদের সাথে আদান প্রদান করা যায় আর নাহলে যাদের বাড়ীতে অনেক বই আছে এবং আমাকে প্রশ্রয় দিয়ে বই ধার দিতে রাজী হতেন । গল্পের বইয়ের অভাবে এক বই কয়েকবার পড়া কোন ব্যাপারই ছিল না, প্রতিবেশী বড় ভাইদের কাছ থেকে তাদের বাংলা বই ধার করে এনেছি গল্প পড়ার জন্য, এমনও হয়েছে আর লুকিয়ে পড়া বই বাবা ছিঁড়ে দেয়ার ফলে প্রায়শই বিপদে পড়তে হতো । যাই হোক, আমার ছোট পৃথিবীর ভেতরে, গল্পের বইয়ের দুনিয়া একটা সমান্তরাল জগতের সন্ধান দিয়েছিল আমাকে ওই বয়সে । সেই জগতের চাবির জন্য একটু আধটু অপ্রস্তুত হতে হয়তো রাজি ছিলাম । যদিও কক্ষনো বই চুরি করিনি, অবশ্য মাঝে মধ্যে ফেরত দেয়া হতো না ।

জন্মদিন নিয়ে ভাবতে ভাবতে, চলে গেলাম বই পড়ার দিকে । যাহোক, মনোলোগের এই সুবিধে ধারাবাহিকতাহীনতার বা অপ্রাসঙ্গিকতার দায়ভার নেই । যাহোক, জন্মদিনের আকর্ষণটা আমার কাছে ছিল বই উপহার পাওয়া কেন্দ্রিক । প্রাইজবন্ড কি জামা কাপড় অত বুঝতাম না । টিন এজ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা থাকতাম একটা হাউজিং সোসাইটিতে । দুটি পাঁচতলা বিল্ডিঙয়ে গোটা চল্লিশ পরিবার - সবাই নাহলেও অনেক পরিবারের সাথেই জানাশোনা ছিল - ঈদে বাসায় বাসায় গিয়ে লাচ্ছা সেমাই, শবে বরাতে হালুয়া বিতরণ, আর কোরবানিতে মাংস নিয়ে বাসায় বাসায় যাওয়া এসব ছিল । অনেকটা কলোনির সোসাইটি আর মফস্বলের মহল্লার মিশ্রণ - কাজেই ছোটদের কি উঠতি বয়সীদের এক একটা গ্রুপ ছিল । কাজেই অনেকের জন্মদিনেই অনেকের দাওয়াত থাকতো । এইসব জন্মদিনে আমার প্রধান আগ্রহ ছিল যে সেই সন্ধ্যাটা পড়তে বসতে হতো না । কৈশোর আসতেই সময় গুলো দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করে । কলেজ - বিশ্ববিদ্যালয়ে পকেটের পয়সা দিয়ে কাছের বন্ধুদের খাওয়ানোর চল সব সময়ই ছিল । কৈশোর পার হয়ে যুবক বয়েসে সেটা আরেক নতুন মাত্রা পায় । জন্মদিনটা যার যার "ফিয়াসে"র সাথে কাটানো কি মনোহর একটা গিফট দেয়ার বিষয়টা অনেকের জন্য বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় । মজার স্মৃতি মনে পড়ে গেল উপহারের কথায়, তখন ডিভিডির যুগ, আর আমি বইয়ের নেশা কাটিয়ে বিদেশী চলচ্চিত্রের জগতে গা ডুবিয়েছি । আমার "প্রাক্তনীয়া" আমাকে এক ব্যাগ ভর্তি ডিভিডি দিলেন চমৎকার একটি জন্মদিন তার সাথে কাটানোর পরে । আমার সেসময় পরীক্ষা চলছিল, সেই অজুহাতে উনি ব্যাগ ভর্তি ডিভিডি নিয়ে গেলেন - পরীক্ষা শেষে ফিরিয়ে দেবেন বলে । উপরওয়ালা মুচকি হেসেছিলেন বোধহয় - বাড়ী ফিরে যাওয়ার পথে সেই আস্ত ব্যাগ সহ সব ডিভিডি উনি হারিয়ে ফেলেন ! অতঃপর উনার সে কি কান্না ! যাহোক, আস্ত মানুষ তক হাপিশ হয়ে যায় ডিভিডি কিছু না ।

সময়ের ফেরে জীবন পালটে যায় । এ বছরটায় জন্মদিনে ছিলাম পরিবার আর বন্ধুদের থেকে অনেক দূরে । আশেপাশের কেউ জানেনি । সত্যি কথা বলতে এটা আমার জন্যে নতুন অভিজ্ঞতা ছিল - কিন্তু হনেস্টলি, আই ডিড নট মাইন্ড । দিন শেষে বাড়ী ফিরেছি, অন্ধকার ঘরে দরজা খুলে আলো জ্বালিয়েছি খুব স্বাভাবিক ভাবে, খাবার ব্যবস্থা করেছি নিজেই । আধুনিক পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ বোধকরি, বেঁচে থাকার চাপে জন্মদিনটাকে স্মরণ করার সুযোগ পায় না । "বেশীর ভাগ" বলতে অবশ্য আমি তাদেরকে বুঝাইনি যাদের কে আমরা শুধু আমাদের চারপাশে দেখি । যাদের জন্য আর্চিস , হলমার্ক আর চকলেট কোম্পানি টিকে আছে, যাদের জীবন নিয়ে নাটক গল্প হয় - বরং যারা বেঁচে থেকেও আমাদের সভ্যতার ইতিহাসে অদৃশ্য, যাদের গল্প কেউ লেখে না । অবশ্য আমাকে ভুল বুঝবেন না । আমি "জন্মদিন পালন বিরোধী" কোন ক্যাম্পেইন নিয়ে আসিনি । পিপল নিড টু ফিল ইম্পরট্যান্ট, ইভেন ইফ ইটস ফর আ ডে । কাছের মানুষদের জন্মদিনে তাদেরকে সময় দিন , চমৎকার "থট ফুল" কোন উইশ করুন । তাদেরকে জানতে দিন - আপনি তাদের ভালবাসেন, পছন্দ করেন কারণ, কোন না কোন কারণে তারা একেকজন চমৎকার মানুষ এবং আপনার জীবনে তারা থাকায় আপনি কৃতজ্ঞ । নিজের জন্মদিনে এমন কোন ভালো কাজ করুন, যেটা কক্ষনো করেননি । এমন কারও জন্য চমৎকার কিছু একটা করুন, যে আপনার সাথে সম্পর্কহীন, যার সাথে আপনার কোন লেনাদেনা নেই - আর সেটাকে গোপন রাখুন। দিন তারিখ টা আসলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয় - একটা মানুষ, তার আত্মা, তার মন অনেক বেশী অর্থবহ - উদযাপন- উৎসব হোক মানুষের স্পিরিটকে ঘিরে ।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৫১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×