somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সৈয়দ হাসান মাহমুদ তন্ময়
“ মাত্র দুটি পন্থায় সফল হওয়া যায়! একটি হচ্ছে সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা, ঠিক যা তুমি করতে চাও। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। ” - মারিও কুওমো।

জলে বিপদ

১৫ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ৮:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



লঞ্চের নাম অগ্রদূত। সাদা ধবধবে ছিলো হয়তো এককালে কিন্তু এখনো কেমন মলিন হয়ে গেছে। যাত্রীদের গুঞ্জন পুরো লঞ্চঘাট জুড়ে। সকাল ৯টা বাজে। বেশ সুন্দর রোদ ঝলমলে এক সকাল। লঞ্চটি ধীরে ধীরে চলা শুরু করে দিয়েছে। লঞ্চে আজ মোটামুটি বেশ ভালোই যাত্রী হয়েছে। ধীরে ধীরে জলের বুকে চিড়ে এগিয়ে চলেছে অগ্রদূত। দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে তার গতি। গন্তব্য চাঁদপুর।

যাত্রীরা কেউ বসে আছে, কেউ ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করছে আর বাচ্চারা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। অভিভাবকরা যতই বাচ্চাদের চুপটি করে বসতে বলছে ততই যেনো তারা বেশি ছোটাছুটি করছে। এদের মধ্যে এক যাত্রী সালমা। তার কোলে তিন বছরের ছেলে মামুন। লঞ্চে ওঠার সময় মামুন ঘুমিয়ে ছিলো। হঠাৎ করে জেগে উঠে তারস্বরে চিৎকার করে কান্না শুরু করলো। সালমা তাকে চুপ করানোর অনেক চেষ্টা করলো তাও সে কান্না থামায় না। আশেপাশের লোকেরা সালমার দিকে বিরক্তির দিকে তাকাতে লাগলো। সালমা এতে কিছুটা বিব্রতবোধ করতে লাগলো এবং আরো ভালোমতো আদর করে ছেলের কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগলো।

পাশ থেকে একজন লোক এগিয়ে আসে মামুনকে চকলেট, আইসক্রিম, চিপস ইত্যাদির দিবে বলে কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা করে তার আগের জায়গায় ফিরে গেলো। সালমার মেজাজ হঠাৎ করে গরম হয়ে গেলো সে মামুনকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বললো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ধমকের ঠেলায় মামুনের কান্না আরো দ্বিগুণ হয়ে গেলো। মামুনের কান্নার যন্ত্রণায় তাকে ঘিরে লোকজন দাঁড়িয়ে বাচ্চা চুপ করানোর নানা রকম পরামর্শ দিতে লাগলো। কিন্তু কোনটিতেই কোনো কাজ হচ্ছিল না। সালমা কি করবে কিছু বুঝতে পারছিলো না। কোনো উপায় না দেখে সে বলে উঠলো, ‘এই চুপ, একদম চুপ। কাঁদলে পানির রাক্ষসের কাছে তোকে দিয়ে দেবো। পানিতে ফেলে দেবো তোকে তারপর তোকে পানির রাক্ষস খেয়ে ফেলবে’। এই বলে লঞ্চের রেলিংয়ের কাছে মামুনকে ফেলে দেয়ার ভয় দেখাতে মামুন একেবারে চুপ মেরে গেলো। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বেশ ভয় পেয়েছে। চোখ বড় বড় করে পানির দিকে সে তাকিয়ে রইলো। সবার মাঝে যেনো হঠাৎ করে শান্তি ফিরে আসলো। সবাই হাফ ছেড়ে যার যার স্থানে ফিরে গেলো।

চলতে চলতে অগ্রদূত দুলে উঠলো এবং দাঁড়িয়ে পড়লো যেনো লঞ্চটা কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেছে। অনেকেই বেশ ভয় পেয়ে গেলো এবং চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলো। লঞ্চের কর্মচারীরা ভালোমতো আশেপাশে দেখে নিলো কিন্তু এমন কিছুই দেখতে পেলো না যা লঞ্চের গতি রোধ করে রেখেছে। সবাইকে চমকে দিয়ে এক গুরুগম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসলো। কে যেনো বলছে, ‘বাচ্চাটাকে পানিতে ফেলে দাও, বাচ্চাটাকে পানিতে ফেলে দাও’। বার বার একই কথা বলে যেতে লাগলো সেই অদৃশ্য স্বত্তা। প্রথমে অনেকেই ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। পরে সবার মনে পড়লো মামুন ও সালমার কথা। এই সেই বাচ্চা যার কথা বলা হচ্ছে গায়েবী আওয়াজে। সালমার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারলো না কি ঘটছে। হঠাৎ করে আওয়াজ থেমে গেলো। সবাই কানাঘুষা শুরু করে দিলো। সবার চোখে ভয় উঁকি দিচ্ছে। আবার গায়েবী আওয়াজ ভেসে আসলো, ‘বাচ্চাকে না দিলে লঞ্চ ডুবে যাবে। কেউ বাঁচবে না, সবাই মরবে। জলদি বাচ্চাটাকে দাও’। কথার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই লঞ্চ ভয়ানক ভাবে দুলতে লাগলো। যাত্রীরা সবাই ভয়ে হাতের সামনে যে যা পাচ্ছে তাই আঁকড়ে ধরে নিজেদের পতন ঠেকাল। যারা কোনো অবলম্বন পেলো না তারা চিৎপটাং হয়ে পড়লো মেঝের ওপর। দুলুনি থেমে লঞ্চ আবার স্থির হয়ে গেলো।

সবাই গিয়ে সালমাকে ঘিরে ধরলো। তাকে সবাই বোঝাতে লাগলো। একজনের জন্য এতজনের প্রাণ বাঁচবে, সবার জীবন বাঁচানোর জন্য আপনার ছেলেকে উৎসর্গ করে দিন, আপনার ছেলের জন্য এতগুলো মানুষের প্রাণ বিপন্ন করবেন, জলদি করে বাচ্চাটারে পানিতে ফেলে দেন, বাচ্চাটার জন্য কি আমরা এতগুলা মানুষ মরমু নাকি ইত্যাদি নানা ধরণের কথায় সালমার কান ঝালাপালা হবার দশা। সে মামুনকে শক্ত করে বুকের মধ্যে আগলে রাখলো। এযে তার নাড়ি ছেঁড়া ধন। তার একমাত্র ছেলে। মা হয়ে কি করে সে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবে। কিছু লোক মামুনকে তার কোল থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইলো। কোনোমতেই সে মামুনকে হাতছাড়া করলো না। মামুনও বেশ ভয় পেয়েছে, সেও তার কচি দুহাতে তার মাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। জাহাজ আবার দুলে উঠলো এবং সেই একই কথা আবার ভেসে আসলো তবে এবারের কন্ঠে বেশ রাগের প্রকাশ শোনা গেলো। জাহাজের দুলুনি থামতেই তিন-চারজন মিলে জোর করে সালমার কাছ থেকে মামুনকে নিয়ে পানিতে ফেলে দিলো। মামুন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে পানিতে পড়ার সাথে সাথে উধাও হয়ে গেলো। একটিবারের জন্যেও ভেসে উঠলো না। সালমাও পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলে তাকে অন্যেরা আটকে রাখল।

লঞ্চের ইঞ্জিনের আওয়াজ শোনা গেলো এবং ধীরে ধীরে অগ্রদূত আবার এগিয়ে চলল। সবার মুখে হাসি ফিরে এলো কিন্তু একজনের মুখে এলো না। হাহাকার করতে লাগলো সালমা। তাকে ধরে রাখতে না পেরে শেষ পর্যন্ত এক থামের সাথে বেঁধে রাখা হলো। মামুনের জন্য কিছুটা দুঃখ আর বেঁচে ফেরার আনন্দ নিয়ে সবাই যার যার বাড়ি ফিরে গেলো। কিন্তু সালমার মনে নেই আনন্দ। সে হয়ে গেছে বদ্ধ পাগল। পুত্রশোকে সে লঞ্চঘাটে ঘুরে বেড়ায় আর মামুন মামুন বলে ডেকে বেড়ায়। চাঁদপুরের লঞ্চঘাটে গেলে হয়তো কেউ কেউ দেখা পেয়েও যেতে পারেন এই পাগলী সালমার।

ধৈর্য ধরে গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। গল্পটি ভালো লাগলে জানাবেন। গল্পটি আমার ওয়েবসাইট অনুগল্পে প্রকাশ করা হয়েছে বেশ আগে। আরও গল্প পড়তে চাইলে নিচের লিঙ্ক থেকে ঘুরে আসতে পারেন অনুগল্পে।

জলে বিপদ - অনুগল্প
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ৯:৫৫
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্তর্দহনের ওপারে প্রশান্তি

লিখেছেন মুহাম্মদ তমাল, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৫৩



প্রিয় আকাশ,
মাঝে মাঝে তোমার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তুমিই সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে নিঃশব্দ প্রাঙ্গণ। তাই আমার সমস্ত অভিযোগ, অনুযোগ, ক্ষোভ, দীর্ঘশ্বাস আর অব্যক্ত আর্তনাদ তোমার দিকেই ছুড়ে দিই। তুমি নির্লিপ্ত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দক্ষিণ কোরিয়ার 'নতুন গ্রাম আন্দোলন'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২৭



বাংলাদেশের উন্নতি হতে হলে, গ্রামগুলোর উন্নয়ন ছাড়া উপায় নাই। গত ৫৬ বছরে আমাদের দেশের গ্রামবাসীদের উন্নয়ন খুবই কম হয়েছে। সেখানকার মানুষ অবহেলার সম্মুখীন হয়ে নিম্ন সেলারির জব... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবার সমস্যা, ব্লগ আমাকে কেন ভোগাচ্ছে?

লিখেছেন মেহবুবা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

আবার সমস্যা ব্লগ ঠিকমত দেখা যায় না। কিছুদিন আগে এমনটি হয়েছিল। ব্লগার সুলাইমান সহজ করে সমাধান বের করে দিয়েছিল। এবার একই সমস্যা হচ্ছে তবে সেই একই উপায়ে কাজ হচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ইরানের নতুন শত্রু হতে চলেছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৬


মরুভূমির গরম বাতাস আর লোহিত সাগরের নোনা জলীয় বাষ্প যেখানে এসে মেশে, বাব এল মানদেব প্রণালীর সেই জায়গাটায় রাতের অন্ধকার নামলেই একটা অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কল্প-গল্প : প্রমিথিউসের শেষ রাত

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১১



“স্যার, কিছু কয়েন দেন!” মোলায়েম স্বরে বলেই হাত কচলায়।

কয়েনটি যিনি চাইলেন, তিনি একজন ভিক্ষুক। ব্যস্ত শহরের এই চৌরাস্তায় বসে নিয়মিত কয়েন আবদার করাই তার একমাত্র কাজ। মালদার পার্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×