somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দালালি পেশা : শরয়ি বিশ্লেষণ

১০ ই অক্টোবর, ২০১৬ রাত ৯:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব

পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অপরের মাল ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনকারীকে আমাদের সমাজে দালাল বলে অভিহিত করা হয়। দালালিকে আরবিতে ‘সামসারা’ আর দালালকে ‘সিমসার’ বলা হয়। যিনি দালালি করেন, তিনি কখনও বিক্রেতার পক্ষে, কখনও ক্রেতার পক্ষে আবার কখনও ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পক্ষে দালালি করে থাকেন। (আলমাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ : ১০/১৫১)।
বর্তমানে অসাধু ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে অসততার আধিক্যের কারণে কোনো জিনিস ক্রয় করতে বা বিক্রি করতে সঠিক দাম পাওয়ার ব্যাপারে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগতে হয়। বাধ্য হয়ে মানুষ এমন দালালদের খোঁজেন, যারা মূল্য সম্পর্কে পরিপক্ব ধারণা রাখে। আবার অনেক সময় স্বল্পতা, নিরাপত্তার অভাব ও অনুপস্থিতির অজুহাতেও দালাল ধরার প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে দালাল ধরার সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে অসুবিধাও রয়েছে। কারণ অন্যান্য পেশার মতো এ পেশায়ও অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রতারক, মিথ্যাচারী ও দুশ্চরিত্রের লোক।
স্বভাবধর্ম ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক এ প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ দালাল তার মেধা, শ্রম ও সময় ব্যয় করে অন্যের পণ্য খরিদ করে দেয় বা বিক্রি করে দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে দালাল হলোÑ আজিরে মুশতারিক বা সময়মুক্ত শ্রমিক। অতএব অন্যান্য শ্রমিকের মতোই দালালি করে মজুরি নেয়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো, কত টাকা মজুরি দিতে হবে তা আগেই নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। (ফাতাওয়া শামি : ৫/৩৩, আহসানুল ফাতাওয়া : ৭/২৭২, ফাতহুল বারি : ৪/৪৫২, আলমুদাওয়ানা : ৩/৪৬৬, আলমুগনি : ৮/৪২, ফাতাওয়াল লাজনাতিত দায়িমা : ১৩/১২৫, ফাতওয়া শায়খ ইবনে বাজ : ১৯/৩৫৮)।
দালালির কয়েকটি সুরত
দালালির বিভিন্ন সুরত হতে পারে। একটি সুরত হতে পারে এরকম যে, কোনো ব্যক্তি এভাবে চুক্তি করল যে, আমার গাড়ি-বাড়ি বিক্রয় করা দরকার। তুমি আমাকে ১ মাসের ভেতর ক্রেতা খুঁজে দাও। আমি তোমাকে ১ মাসের বেতন প্রদান করব। এখন লোকটি যদি ১৫ দিনেই ক্রেতা খুঁজে দিতে পারে, তাহলে সে ১৫ দিনের পারিশ্রমিকই পাবে। আবার পুরো মাস চেষ্টা করেও যদি ক্রেতা মেলাতে না পারে, তবুও সে পুরো মাসের বেতন পেয়ে যাবে। এটা দালালি নয়; মাসিক বেতন। এটা জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে কারোই দ্বিমত নেই। (মাবসুত লিসসারাখসি : ১৫/১১৫, আওনুল মা’বুদ : ৯/১২৪)।
তবে দালালির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সুরত হলো এভাবে চুক্তি করা যে, তুমি আমার গাড়ি-বাড়িটি বিক্রি করে দাও। বিক্রি করে দিতে পারলে ৫ হাজার টাকা প্রদান করব। এতে সাধারণত সময় ধার্য করা থাকে না, বরং লেনদেন সমাপ্তি শেষে তাকে চুক্তিকৃত টাকা প্রদান করা হয়। চাই সে দুই দিনের ভেতরই করুক বা ২ মাস লেগে যাক বা তার চেয়ে বেশি। যখন সে কাজ সমাধা করে দিতে পারবে, তখনই টাকা পাবে। এমনকি সে যদি অনেক পরিশ্রম করার পরও পণ্যটি বিক্রি করে দিতে না পারে, তাহলে সে চুক্তিকৃত টাকা থেকেও বঞ্চিত হবে। এটাকে ‘জাআলা’ (কাজ শেষে মজুরি) বলে। (রদ্দুল মুহতার : ৬/৬৩)। দালালির এ সুরতটি জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম শাফেঈ (রহ.) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট থাকলে দালালিকে নিঃশর্তভাবে জায়েজ বলেন। (ফাতহুল বারি : ৪/৪৫২)। আর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর পক্ষ থেকে এ ধরনের চুক্তি (জাআলা) জায়েজ-নাজায়েজের ব্যাপারে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাই পরবর্তী সময়ে হানাফি আলেমরা যাদের মধ্যে রয়েছেন আল্লামা শামি (রহ.) এটাকে জায়েজ সাব্যস্ত করেছেন। (ইলাউস সুনান : ১৩/৪০, বাদায়িউস সানায়ে : ৬/৮, আলমুগনি : ৬/৩৫০) এবং তারা কোরআনে কারিমের সূরা ইউসুফের ৭২নং আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করে থাকেন। ইউসুফ (আ.) এর পানপাত্র হারিয়ে ফেলা সম্পর্কে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা বলল, আমরা বাদশাহর পানপাত্র হারিয়ে ফেলেছি এবং যে কেউ এটা এনে দেবে সে এক উটের বোঝা পরিমাণ মাল পাবে এবং আমি এর জামিন।’ যে ব্যক্তি বাদশাহর হারানো পেয়ালা এনে দেবে সে এক উট বোঝাই রেশন পাবে। এখানে যে চুক্তি হলো তাতে মেয়াদ ও পরিশ্রম কিছুই নির্ধারণ করা হয়নি, বরং কাজের শেষে পারিশ্রমিক ধার্য করা হয়েছে।
পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট হওয়ার দুইটি পদ্ধতি
ক. পরিমাণ নির্দিষ্ট করা। যেমন খালেদ বকরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলো, সে বকরকে জমি কিনে দেবে। বিনিময়ে বকর তাকে ৫ হাজার টাকা দেবে।
খ. দামের অংশ নির্দিষ্ট করা। যেমন জায়েদ ওমরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলো, সে ওমরের গরু যত টাকায় বিক্রি করে দেবে তা থেকে শতকরা ৫ টাকা হারে ওমর তাকে পারিশ্রমিক দেবে। দালালের উপরোক্ত উভয় ধরনের পারিশ্রমিক হালাল। এমনকি পারিশ্রমিকের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলে একটি মাল বেচাকেনা করে দিয়ে উভয় পক্ষ থেকে দালালি মূল্য গ্রহণ করাও হালাল হবে।
নিষিদ্ধ দালালি যদি বিনিময় অনির্দিষ্ট রেখে বেচাকেনায় সহযোগিতার চুক্তি করা হয়, তাহলে চুক্তি ও বিনিময় সবই নাজায়েজ হবে। যেমন রাশেদ বকরকে বলল, আপনি আমার এ গাড়ি বিক্রি করে আমাকে ২ লাখ টাকা দেবেন। এর বেশি যত টাকায় বিক্রি করতে পারবেন; তা আপনার থাকবে। যুগশ্রেষ্ঠ ফকিহ মুফতি রশীদ আহমদ (রহ.) শেষোক্ত এ পদ্ধতিকে নাজায়েজ আখ্যা দিয়েছেন। অনুরূপভাবে গোপন দালালিও নাজায়েজ। যেমন রাশেদ একটি পুরাতন মোবাইল বিক্রি করবে। কিন্তু তার ধারণা যে, এ ধরনের মোবাইল বর্তমানে কেউ কিনতে আগ্রহী হবে না। অপরদিকে বকর ঠিক সে ধরনেরই একটি মোবাইল খুঁজছে। জায়েদ এ সুযোগে দালালির মাধ্যমে উপার্জনের ইচ্ছা গোপন করে বন্ধুত্বের বেশ ধরে উভয়ের কাছে যেয়ে বেচাকেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করল। মোবাইল কিনে দেয়ার কথা বলে, বকরের কাছ থেকে কিছু টাকা গ্রহণ করল। আবার বিক্রি করার কথা বলে রাশেদের কাছ থেকে কিছু টাকা গ্রহণ করল। এভাবে সে উভয় দিক থেকে টাকা খেল। কিন্তু বিষয়টি উভয় পক্ষের কেউই জানল না। এ অবস্থায় জায়েদের জন্য ওই টাকা হারাম হবে। আরেক ধরনের কৃত্রিম দালাল রয়েছে, যারা শুধু দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আসল খরিদ্দারের সামনে খরিদ্দার সেজে পণ্যের দাম করে আসল খরিদ্দারকে ধোঁকা দেয়। এভাবে তারা বিক্রেতার কাছ থেকে চুক্তি অনুসারে কিছু টাকা গ্রহণ করে থাকে। ইসলামে কোনো ধোঁকাবাজির সুযোগ নেই।
http://www.alokitobangladesh.com/todays/details/195934/2016/10/09
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১৬ রাত ৯:৩৮
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×