হঠাৎ ফুড পয়েজনিং, ঠান্ডা কাশির ভাইরাস আমাকে পিছিয়ে দিল বেশ একটু। বুধবার ক্লাস শুরু বিকাল পাঁচটায়, তখন বসে বসে পিছিয়ে পড়া থেকে এগিয়ে আসব এই আশায় ছিলাম। সকাল বেলা ইশির এসএমএস, 'তুমি বাসায় আছ? আমি আসি?' ফোন করে বললাম, 'উহু এস না। বাসায় কোন খাবার দাবার না। বাসার সবার ফুড পয়জনিং হয়েছে তাই ফ্রীজ ভর্তি জাউ। চলো, কোথাও দেখা করে দিনটা এক সাথে কাটাই।'
ওর মন খারাপ জানতাম। গত বছর আমাকে যেই অস্থিরতায় পেয়ে বসেছিল, জীবন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, সিদ্ধান্ত নেয়ার অক্ষমতার জন্য, ওকে এখন একই সমস্যায় পেয়েছে। আমার সাথে ওর পার্থক্য হল, খুব বড় ধরণের সমস্যায় থাকা কালে আমি সমস্যার কথা কাউকে বলি না। মানুষ মন খারাপ দেখবে, কিন্তু আসল কারণ জানবে না। হয়তো একই দিনে একটা ট্রেইন মিস করলাম, কিংবা পরীক্ষা নিয়ে টেনশনে আছি... মন খারাপের কারণ হিসেবে সেটাই চালিয়ে দিব। মানুষ থেকে পালিয়ে বেড়াই... ফোন অফ করে রাখি, এমএসএনে 'অ্যাপেয়ার অফ লাইন', মেইল চেক করলেও একটা জবাবও দেই না। পুরা গুহা মানবী হয়ে যাই। হয়তো খুব দূরের কারও কাছে হঠাৎ গড় গড় করে সব বলে ফেলি, যে আমার জীবন থেকে অনেক দূরে। কখনও কাছে আসবেও না। তাই হয়তো, সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে আমার সময় লাগে। আই লার্ন দ্যা হার্ড ওয়ে। নিজে হোঁচট খেয়ে।
ইশি সমস্যার কথা বলে, খোলা মেলা মেয়ে বলে কষ্ট পায় কম। ডাকছে একটু ঘ্যান ঘ্যান করার জন্য, জানতাম। থাকুক পড়াশোনা। পড়াশোনা তো পালিয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু ইশির এই প্রয়োজন তো ফুরিয়ে যাবে। সেন্ট্রালে দেখা করলাম। লাল টকটকে হিজাব পড়ে এসেছে। আমি নীল। হেসে ফেললাম। 'আহা রঙিলা, মনে রং লাগছে?' 'ওই চুপ, লাল ভাল্লাগে তাই পড়ছি।' দুই জনই একমত, মন খারাপের উত্তম চিকিৎসা রিটেইল থেরাপি। কিন্তু টাকা তো নাই। দুই ফকির বের হয়ে পড়লাম উইন্ডো শপিঙের উদ্দেশ্যে। উইন্ডো শপিং যখন করবোই, তখন বন্ডাই ওয়েস্টফিলডে যাব। খুব 'বড়লোকী' এলাকাগুলোর একটা। গেলাম। প্রায় দুই ঘন্টা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, আমাদের চোখ তিনশ' ডলারের চেয়ে সস্তা কিছুতে পড়েই না। আমরা হাসতে হাসতে শেষ, একই টি শার্ট, জিনস, বাইরে থেকে দশ ভাগের এক ভাগ দাম দিয়ে কেনা যায়। বড়লোকদের মাথায় বুদ্ধি নাই, পুরা লুটে খাচ্ছে তো! মাঝে ন্যাডের ফোন। ওর আসার কথা ছিল আজ। ওর বান্ধবী সুফিয়ার জামাই আসছে বাংলাদেশ থেকে, ওকে নিয়ে শেষ বারের মত ঘুরতে বের হয়েছে। সুখেই আছে!
এরপরে অপর্ততে চিকেনের ঠ্যাঙ চিবুতে চিবুতে আরও আড্ডা। ছোটবেলার গল্প হলো। ইশির মা হিজাব পড়ে না, বাবা হিজাবের চরম বিরোধী। তবু ও হিজাব পড়ছে। খুব ইন্টারেস্টিং। প্রথম হিজাব ধরতে আমার ওর দু'জনেরই কষ্ট হয়েছে, যেটা একই জায়গায় না থাকলে বুঝা যাবে না। কিন্তু আমার মূল বিরোধিতা ছিল স্কুল থেকে, নি:শব্দ বা সশব্দ। ওরটা বাসা থেকে। পুরা উলটা স্রোতে ভাসা মেয়ে ও। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন শাকিরা। আজকালকার গানগুলো আর 'সাজেস্টিভ' এর পর্যায়ে নেই, পুরা 'এক্সপ্লিসিট'। বলতে বাদ রাখে এমন কোন কথা নাই। কই যাচ্ছে সব! এই সব বলতে বলতে হঠাৎই মনে হলো সাগরের কাছে যাওয়া যায়। উঠে পড়লাম বন্ডাইয়ের বাসে। বন্ডাই বীচ, মোটামোটি জগৎ বিখ্যাত বীচ। অস্ট্রেলিয়ার আইকন। হলিউড, অস্ট্রেলিয়ান যত নায়ক নায়িকারা আছে, তাদের বন্ডাই বীচে দেখা যায়। মিডিয়া গিজ গিজ করে। আমি আগে কখনও যাই নি, মানুষ বড় বেশি তাই। কিন্তু আজ এত কাছে চলে আসলাম বলেই যেতে ইচ্ছা হল।
বীচের বালু থেকে বেশ দূরে বসে রইলাম একটা কাঠের বেঞ্চিতে। স্যান্ডেল খুলে পা তুলে গল্প। সামনেই একটু ঘাস। তারপরে ঢালু হয়ে যাওয়া ঘাস শেষে অনেক টুকু সোনালী বালু। তারপরে সাগরের দুর্দান্ড ঢেউ। বিস্তৃত সাগর, আকাশের মুখোমুখি। আর দূরে, সাগর আকাশের মিলনস্থল। এসব সামনে নিয়ে বসে গেলাম। কত গল্প! 'কাউনসেলিং' ব্যাপারটা আমি নিজে কখনও আশে পাশের বন্ধুদের কাছ থেকে নেই না (খুব খুব খারাপ স্বভাব), কিন্তু করি অনেক। ঘন্টা দুয়েক প্যাট প্যাটানি করে মন ভাল করে দিলাম অবশেষে। কথার মাঝখানে একটা অদ্ভূত ব্যাপার খেয়াল করলাম। ওই যে, ফাইন্ডিং নিমো তে খুব বিরক্তিকর সাদা গাঙচিলগুলো দেখায় না? ওরকম একটা গাঙচিল, লাল চোখ তাক করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। মাথা একদিকে হেলানো। যেন খুব মনযোগ দিয়ে শুনছে কথা। কার চর কে জানে! মাঝে কয়েকটা কুকুরও ঘুরে গেল আশে পাশে। আমি মহা আতঙ্কিত হয়ে বসে ছিলাম। উঠলাম শেষ মেষ নামায পড়তে। নির্জন দেখে জায়গা খুঁজে নিয়ে ঘাসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। নামায পড়তে পড়তেই হাসি পাচ্ছিল একটা আইরনির কথা ভেবে। বন্ডাই বীচের মত একটা জায়গায় আমি নামায পড়ছি?
অবশ্য এই একটা দিকই আমার অস্ট্রেলিয়াকে ভীষণ ভাল লাগার কারণ। কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া মানুষগুলো ভীষণ ভালো, ভীষণ 'বুঝতে চাওয়া'।
তারপরে যথারীতি আইসক্রীম ভক্ষণ এবং বাস ধরে ইউনি গমন। সারাদিনের ক্লান্তিতে প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছিল লেকচারে, তবু বসে রইলাম ঠায়। উহ, বিশ্রাম বিরতি হয়েছে যথেষ্ট, এখন আবার দৌঁড়ানোর পালা!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




