গ্লোরিয়া জিনসের কফিতে বিষম খেলাম। নরম সোফা থেকে পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসতে বসতে ইমার দিকে বিষ্ময় নিয়ে তাকালাম। ইমা ইংরেজিতেই বলতে থাকল।
'ওয়াটস রং উইথ দ্যাট? আমি ডিসিশন নিয়েছি, গ্র্যাজুয়েশনের পরে, বিয়ে টিয়ে করে বাংলাদেশের গ্রামে থাকতে চাই।'
ইশিও খাওয়া থামিয়ে মুখ টিপে হাসছে, এদিকে তাকিয়ে।
আমার একটু মায়া হলো, হাতে হেলান দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন বলো তো?'
'বাংলাদেশের গ্রামের মেয়েদের জন্য কিছু করতে চাই।'
ইমার পড়াশোনা পাবলিক হেলথ নিয়ে। আমি আগ্রহী হয়ে উঠি, 'আচ্ছা!'
ও সিরিয়াস হয়ে উঠে, 'দেখ না বাংলাদেশের মেয়েরা কত এক্সপ্লয়টেড হয়। গ্রামের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি। ওদের ধর্মের নামে এক্সপ্লয়েট করা হয়, প্রগতির নামে এক্সপ্লয়েট করা হয়। কাম টু থিংক অফ ইট, মানুষ হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা তো নিজের কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা থাকবে। ওদের 'আমি তোমাকে ভালবাসি না' বলার সিদ্ধান্ত নেয়ারও স্বাধীনতা নেই, এসিডে মুখ ঝলসে যাবে। উইমেনস হেলথের নামে যত এনজিও ওদের পর্যন্ত পেঁৗছতে পারছে, তারাও বা কতটুকু করছে, করতে পারছে? বা করতে চাইছে? পশ্চিমাদের জন্য থার্ড ওয়ালর্ড মুসলিম কান্ট্রির মেয়েদের নিয়ে কাজ করা এযুগে খুব প্রফিটেবল বিজনেস, কে না জানে?'
এক নি:শ্বাসে বলে ফেলে ইমা। আমি একটু অবাক হই। দশ বছর বয়সে দেশ থেকে এসেছে। ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব দু'বছরের। অনেকগুলো রাত এক সাথে কাটিয়েছি আড্ডা দিয়ে। ক্যানবেরা গিয়েছি। মাসে একবার দেখা হতেই হয়। দেশ নিয়ে এত ভাবে কখনও জানতাম না। আবার অবাক হই না। একটা সাধারন নিয়ম হিসেবে আমার যাদের সাথে বন্ধুত্ব হয় তাদের নিজেস্ব কিছু অদ্ভূত চিন্তা ভাবনা থাকে, যেটাকে সহজ ভাষায় 'পাগলাটে' বলা যায়।
ইশি প্রশ্রয়ের হাসি হাসে। ইমার মধ্যে শিশুর সারল্য আছে।
ইশির দিকে তাকিয়ে চোখ তাতাই আমি। ও হাসছে কেন? ওর না শখ বাংলাদেশ নিয়ে ওয়ালর্ড ক্লাস ফিল্ম বানাবে? আমাকে বলেছে স্ক্রিপ্ট লিখতে। ইশির কথা আরেক দিন হবে, এবার ইমার দিকে ফিরে যাই।
দেশ থেকে এসেছে দশ বছর বয়সে। তারপরে একবার গিয়েছিল দুই বছর আগে। বান্ধবীদের মধ্যে শাড়ি পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী বলতে এই ইমা আর আমি। তবে ওর মত সুন্দর করে শাড়ি পড়তে পারি না। ওই সেদিন, কমলা রঙের সূতীর শাড়িটা যেভাবে এক প্যাঁচে পড়েছিল, লম্বা চুলগুলো বেনী করে, আমি ভাবছিলাম, মেয়ে সারা জীবন দেশের বাইরে থেকে এত সুন্দর এক প্যাঁচে শাড়ি পড়া শিখল ক্যামনে? মনে হচ্ছে এখনি ছুটে যাবে সরিষা ক্ষেত এলোমেলো করে।
স্বপ্নবাজ মেয়ে, হাওয়ার উপর চলে। মারাত্মক বিড়াল প্রেমী। ওর এমএসএনে বিড়ালের ছবি, (ইংরেজী) ব্লগ ভর্তি বিড়ালের ছবি। আমাকে যারা কাছ থেকে দেখে তারা বলে, আমি বড় হই নি। এখনও শিশু-চোখে পৃথিবী দেখি। জটিল ভাবনাগুলো যারা দূর থেকে দেখে, ওরা বলে, আমি বড় বেশি পাকনা। ইমার দশাও এরকম। একটাই সমস্যা 'আমাদের', ভাবনাগুলো বড় 'দলছাড়া'। এ দল সে দল 'ওই দল', 'সেই দল' এর ভাবনা বলে ছাপ মেরে দেয়। এন্ড প্রডাক্ট--পুরাপুরি দলছাড়া!
ও বলছিল, 'আমি আসলে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হতে পারছি না। আমার জন্য খুব বেশি দ্রুত চলে। মানুষগুলো খুব জটিল। দেখ না বেছে বেছে একটা নির্জন ক্যাম্পাসে পড়ছি। সিডনী, ঢাকা... আমি পারব না। আমার গ্রামের সরল জীবনে থাকতে হবে। একই সাথে মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে চাই।'
আমি মুখ বন্ধ করে বসে রইলাম। আমার অভিজ্ঞতা বলে, গ্রামের মানুষেরা আর সরল নেই। ছোট্ট বদ্ধ জায়গায় কুটিলতা হয়, যেই কুটিলতা থেকে পালিয়ে বাঁচার কোন উপায় নেই। কুটিলদের হাতের সীমানায় থাকতে হয় গ্রামে। শহরের পরিধি বড়, তাই নাগালের বাইরে যাওয়া যায়। বললাম না।
বাসায় এসে ওর ব্লগে ঢু মারলাম অনেক দিন পড়ে। শেষ পোস্টটা পড়ে বুকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল... আমার ভাবনাগুলো ও কি করে লিখল? পুরা পোস্টের প্রতিটা লাইন আমার ভাবনা। তুলে দিলাম একটু খানি অংশ:
I am in utter despair. My brain cannot fathom how any way of life can re-organise this seemingly almost-God-forsaken world. With the speed at which mankind is destroying its comforts
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০০৭ সকাল ৭:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


