somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সন্ধ্যাবাতি
জ্বেলে দাও সন্ধ্যাবাতি

গল্প: পথ চলা - ৪

১৩ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত ন'টার দিকে যখন বাসায় ফিরল মিলি, বাসার পরিবেশ তখন অস্বাভাবিক রকমের থমথমে। কোথাও টু শব্দটি নেই। তাও ভাল। বাসাকে যদি এখন পারমানবিক বোমায় ঝলসে যাওয়া কোন মৃত শহরের মত মনে হয়, তাহলে সকাল বেলার বাসা ছিল সাক্ষাৎ জাহান্নাম। হাবিয়া দোযখ। বেল টিপে বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পরে আম্মু গম্ভীর মুখে দরজা খুলে কোন কথা না বলে সরে দাঁড়াল। চোখ ফোলা ফোলা। অনেক কেঁদেছে নিশ্চয়ই। রাজুর ঘরের দরজা বন্ধ। কোন শব্দ নেই। আস্তে করে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল মিলি।

তারপরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার মিষ্টি শ্যামলা মেয়েটাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ অবাক হয়ে খেয়াল করল, মেয়েটার চোখ হাসিতে ঝিক মিক করছে। স্বপ্নালু চোখে মেয়েটা কি যেন ভেবেই চলছে। মাঝে মাঝে মুখ টিপে হেসে ফেলছে। সকাল বেলাতেই না এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই এক চোট কেঁদে নিয়েছিল ও? দরজার ওপাশে তখন চিৎকার চেঁচামেঁচির শব্দ। রাজুর সদ্য কৌশোরে পৌঁছানো ভাঙা গলা ইংরেজিতে আর আব্বুর গলা বাংলায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। আব্বু তখন পাগলের মত চিৎকার করে বলছে, 'যা বের হয়ে যা আমার বাসা থেকে, এই সব করে আমার বাসায় থাকতে পারবি না, যা!' আব্বুকে এত চিৎকার করতে দেখে নি ও অনেকদিন। আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিয়ে রাজু ঠান্ডা গলায় ইংরেজিতে বলেছিল, 'আই থিংক আই উইল। আই উইল হ্যাভ নো প্রবলেম সারভাইভিং উইদাউট য়ু। দিস ইজ নট বাংলাদেশ। দ্যা গর্ভমেন্ট উইল সাপোর্ট মি য়ু নো।' প্রতুত্তরে আব্বু কি বলেছিল শোনার আগেই দুই কানে হাত দিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেছিল মিলি। আম্মুও তখন ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে।

আর সহ্য হল না যখন, তখন মোবাইল বন্ধ করে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কাঁধে ঝোলানো ইউনির ব্যাগ বটে, কিন্তু ইউনিতে যে যাবে না ও ঠিক জানত।

আয়নার মিষ্টি চেহারার মেয়েটার চোখ থেকে এখন হাসি উধাও। সকালের সেই যন্ত্রনা এসে ভর করেছে দুই চোখে। ক্লান্ত দৃষ্টিতে নিজের চোখগুলো দেখে গভীর ভাবে। ওমা, চোখের পাপড়িতে, ভ্রুর ফাঁকে, নাকের উপর, সারা মুখে সাদা সাদা এগুলো কি? হাত দিতেই বালু বালু ঠেকল। এতক্ষনে বুঝল ও, সাগরের জল শুকিয়ে লবণ হয়ে গিয়েছে। ফেরী যখন পানি কেটে তীব্র বেগে ছুটে চলছিল, তখন ও ঝুঁকে ভেজা বাতাসওয়ালা সূর্য্যের আলো মাখছিল সারা মুখে। কি যে ভাল লাগছিল! ভ্রমন সঙ্গীর কথা মনে পড়তেই চোখের নিচে ভাঁজ জমতে লাগল, ঠোঁটের কোণে হাসি। চেহারা দেখেই বুঝেছিল খুব অবাক হয়েছে সুজন। কি করবে, বেশ ভাল লাগছিল ছেলেটার সংগ, পরিচিত সব কিছু থেকে অনেক দূরে থাকতে মন চাইছিল। ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা ছিল যা দেখে মনে হয়েছিল খুব বিশ্বাস করা চলে। মনে হয় এতদিন দেশী ছেলেদের ভিসাখেকো যেই চেহারা ভাসতো মনে সেটা বদলে গিয়েছিল ওর সিডনী ব্যাশিং কথা শুনে, তাই।

ওদিকে সুজন, শহরের অন্য প্রান্তে রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। শরীর প্রচন্ড ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও ঘুম আসছে না একদম। এদেশে আসার প্রথম দু'য়েক মাস অনিদ্রায় ভুগেছে। তারপরে, যখন দিনের আঠারো ঘন্টা কাজ শুরু করল, সারাদিনের প্রচন্ড পরিশ্রম ক্লান্ত শরীরটা টেনে বিছানায় আনতেই ঘুমে চোখ ভেঙে আসে। যেই রাতগুলোতে ক্লান্তি কম থাকে, সেই রাতগুলোতে বসে তাসের মেলা বা নতুন আনা কোন ডিভিডি দেখার আসর। অনেক রাতে বিছানায় এসে নির্ঘুম পড়ে থাকা হয় না কখনও। অথচ কি আশ্চর্য, আজ এক ফোঁটা ঘুম নেই দু'চোখে। ঘুরে ফিরে বার বার মেয়েটার কথা মনে পড়ে। মেয়েটা ওর সাথে এত ঘুরল কেন আজ? দুই হাতে রেলিঙে ভর দিয়ে যখন সাগরের পানির ঝাপটা মুখে লাগাচ্ছিল তখন মেয়েটার মুখ দেখে কি যে ভাল লাগছিল! মানুষ এত সুখী হয় কি করে? অনেক, অনেক দিন হলো এমন বিশুদ্ধ, নিষ্পাপ আনন্দ দেখে নি কারও চোখে, মুখে। কিন্তু কি আশ্চর্য, ও মেয়েটার কথা ভাবছে কেন? চোখের পাতা চেপে বন্ধ করে মেয়েটার মুখ তাড়াতে চাইল সুজন।

(চলবে মনে হয়!)
২০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×