somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টিভি শো রিভিউ: প্রেইরির ছোট্ট মসজিদ (উৎসর্গ: রেজওয়ান)

১৮ ই মে, ২০০৭ ভোর ৬:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পশ্চিমা মিডিয়ায় এখন দাড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা, হিজাবওয়ালা বা স্রেফ মুসলিমদের দেখলেই নি:শ্বাস বন্ধ করে রাখি--আবার কি হলো? মিডিয়াকে দোষ দেই না, আমরা মুসলিমরা 'খবর' বানাতে ওস্তাদ, আর খবরে তো 'খবর' ই দেখাবে।

এত স্পটলাইটে যখন আড়ষ্ট আমরা ঘেমে নেয়ে উঠি, তখন আমি নতুন প্রডাকশন খুঁজি। একটু ব্যতিক্রম ধর্মী কিচ্ছু কি নেই? মাঝে মাঝে পেয়ে যাই।

মাস পাঁচেক আগে ইসলাম অন লাইনে রুটিন ভ্রমন করার সময় দেখলাম আর্ট এন্ড কালচারের খবরের ওখানে একটা নতুন টিভি শো এর খবর 'লিটল মস্ক অন দ্যা প্রেইরী'। প্রেইরীর ছোট্ট মসজিদ। মুসলিমদের নিয়ে কমেডী করা হচ্ছে। ক্যানাডিয়ান টিভি সিবিএসে দেখানো হচ্ছে জানুয়ারীর প্রথম থেকে। তখন ভাবলাম, আচ্ছা, অস্ট্রেলিয়ায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। কিন্তু অপেক্ষা করা লাগল না। আস্তমেয়ে ব্লগে মাস কয়েক আগে, আমাদের ব্লগার রেজওয়ান ইউটিউবের একটা লিংক রেখে গেলেন, লিটল মস্ক অন দ্যা প্রেইরির।

তারও সপ্তাহ খানেক পরে প্রথম পর্বটা দেখেই আমি মুগ্ধ, আপ্লুত। বাসা ভর্তি সবাইকে দেখালাম। বন্ধুদের দেখালাম।

মুসলিমরা টিভি শো তে যে আগে আসে নি তা না। এসেছে। আসে। টুয়েন্টি ফোর, সিএসআই, ল এন্ড অর্ডার যারা দেখেন, তারা প্রায়শই নব্য মুসলিম বা কম বয়সী কোন মুসলিমকে 'ফ্যানাটিক টেররিস্ট' হিসেবে কোরআন হাতে মুখ ছুটিয়ে বক্তব্য দিতে দেখবেন। এভাবেই আসে মুসলিমরা টিভিতে। "হাস্যকর", ভয়ংকর, ভিন প্রজাতির মানুষ। আমাদের ১.৫ বিলিয়নের মধ্যে হয়তো ১.৫ লক্ষও তেমন হবে না। অথচ, পৃথিবী আমাদের সেভাবেই জানছে।

ওসব নিয়ে ক্ষোভ হলেও আসলে ক্ষোভ প্রকাশ করা মানে নিজেদের গায়ে কাদা টেনে আনা। 'ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না' এর দোষে দোষী হওয়া। যারা দাগের ওপাশে থেকে স্টেরিওটাইপ করে যায় অবিরত, তাদের এতসব বুঝানো যাবে না। 'তার মানে কি ওদের ছেড়ে দিতে বলছ? বা ওদের হয়ে কথা বলছ? না হলে গায়ে লাগে কেন?' আরে বাবা তা বলা হবে কেন, কিন্তু এসব করে মুসলিমদের প্রকৃত চেহারা তো দেখানো হচ্ছে না, মুসলিমদের একটা ক্ষুদ্র অংশ ওরকম, আর বড় অংশটাই যে ঠিক তোমাদের মত মানুষ দিয়েই তৈরি! তোমার পৃথিবীকে সেটা জানার সুযোগ দিচ্ছ? আমাকে দেখেই লোকের সেসব মনে হলে আমার গায়ে লাগা উচিত না?

'লিটল মস্ক ইন দ্যা প্রেইরি' বোধ হয় প্রথম টিভি শো যা মুসলিমদের খুব 'মানুষ' করে দেখিয়েছে।

আমেরিকার ছোট্ট একটা শহরে থাকা পাঁচ মেশালী মুসলিম... লেবানীজ, ভারতীয়, পাকিস্তানি, আফ্রিকান, ধর্মান্তরিত মুসলিম। এই মানুষগুলোর নাগরিক সুখ দুখ, ছোট খাট চাওয়া পাওয়াকে ঘিরে ওঠা কমেডির সবচেয়ে বড় সাফল্য--স্টেরিওটাইপগুলো নিয়ে হাসাহাসি করা।

এই যে, 'সাধারন' মুসলিমরা যেমন ছোট খাট ব্যাপারে ঝগড়া করে... কে ভাল মুসলিম, কে খারাপ মুসলিম, মসজিদের মেয়েদের আর ছেলেদের মাঝে কোন আড়াল থাকবে কি থাকবে না, মুসলিমরা অমুসলিমদের পার্টিতে যাবে কি যাবে না। 'হেলুয়িন' পার্টিতে যাওয়া! আস্তাগফিরুল্লাহ! কিংবা ছোট্ট মেয়েটা 'বালেগা' হওয়ার সাথে সাথে মাথায় হিজাব চাপাবে তাই নিয়ে সমাজের মাথা ব্যাথা। টিনেজ মেয়েটার ঘর থেকে আসা মিউজিক শুনে ছি ছি পড়ে যাওয়া। বিদেশে যাওয়া প্রথম প্রজন্মের মানুষদের কথায় কথায় নিজের দেশ কি করে সেরা সেটা প্রমানের চেষ্টা। একটা সাধারন ইফতার পার্টিতে মেন্যু কি হবে তা নিয়ে ঝগড়ায় মেতে ওঠা। শ্বাশুড়ী বউয়ের খিটিমিটি। নামায না পড়ায় খারাপ মুসলিম বলে আহবান, তাই শুনে জেদ চেপে নামায পড়া। দেখবেন আর গুট গুট করে হাসতে থাকবেন, আরে, এই লোকটাকে তো চিনি!

স্পটলাইটে থাকা যারা থাকে, তাদের দোষ খুঁজে বের করে সেটাই বড় করে দেখিয়ে পৃথিবী যেমন বিমলানন্দ লাভ করে, তেমনি তারাও আড়ষ্ট হয়ে যায়। নিজেদের দোষ চেপে চুপে ঢেকে রাখে। এই কমেডিতে, কমেডির নিজেস্ব স্টাইলে দোষগুলো তুলে ধরা হয়েছে রাখ ঢাক ছাড়া। কাউকে আক্রান্তবোধের সুযোগ না দিয়ে, কারও দিকে আঙ্গুল না তুলে, সবাইকে নিয়ে এক সাথে হাসা হয়েছে। কমেডির স্রষ্টা নওয়াজ, দ্বিতীয় ছবি তাঁরই। নিজে ইসলামকে ভালবাসেন। আক্রমনটা ইসলামকে না করে মুসলিমদের হাস্যকর ব্যবহারকে আর বহির্বিশ্বের আচরণকে নিয়ে করা হয়েছে তা খুব স্পষ্ট হয়ে পড়ে। তাই ভাল লাগে। নওয়াজ দারুণ একটা কথা বলেছেন যা আমার ভাল লেগেছিল--'এই শো দেখে দুই প্রকার মানুষের খারাপ লাগবে। কট্টরপন্থী মুসলিম আর কট্টরপন্থী অমুসলিম।'

পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়ায় স্টেরিওটাইপের ভুক্ত ভোগী কি করে সাধারন মুসলিমেরা তা-ও হাসির ফাঁকে ফাঁকে দেখিয়ে নেয়া হয়েছে চমৎকার ভাবে। মসজিদের লাইটটা কয়েক দিন ধরেই নষ্ট। কিছুক্ষণ পর পর নিভে আবার জ্বলে উঠে। সেটাই রিপোর্ট করা হলো। লোকাল রেডিও স্টেশনে সন্দেহ প্রকাশ করা হলো, এর বোধ হয় মসজিদের ভেতর থেকে বাইরের কোন টেররিস্টকে আলো জ্বালিয়ে নিভিয়ে সংকেত দিচ্ছে! হায়রে প্যারানয়া! যারা ভুক্তভোগী তারা জানেন, এর কাছাকাছি ঘটনা ঘটা খুব অস্বাভাবিক না। অথচ মানুষগুলো আদতেই নিরীহ, শান্তিপ্রিয়, আবেগী। নিজের এবং বাইরের পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত। হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে যায়।

গল্পের প্রধান দুই চরিত্র বলা যায় রায়ান আর আমর। রায়ান সদ্য পাশ করা ডাক্তার, নারীবাদী হিজাবী! আর আমর আইন পাশ করে এখন সমাজ সেবায় নেমেছে। দু'জনেই মুসলিম সমাজের গভীর সমস্যাগুলো নিয়ে ভীষণ বিরক্ত। একই সাথে নিজেস্ব মানুষগুলোকে শুধরানো আর বাইরের পৃথিবীর কাছে মানুষগুলোর ইমেজ শুদ্ধিতে নামা--কাজটা ব্যালেন্স রক্ষা আর সীমারেখা নির্ধারন করা, ভুল ঠিকের সংজ্ঞা প্রনয়ন কত কঠিন কঠিন, ভুক্তভোগীরাই জানবেন!

পছন্দ হবে ঠিক! য়ু টিউবে দেখতে পাবেন এখানে। পর্বগুলো খুঁজে নিতে হবে। এসম্পর্কে সিবিসি টিভির নিজেস্ব কথা পড়তে পারবেন এখানে।

শেষ করার আগে, এত চমৎকার একটা শো এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য রেজওয়ান ভাইকে ধন্যবাদ। অনেক।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০০৭ দুপুর ১২:২২
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নতুন মসজিদের কাজ শুরু করলাম

লিখেছেন প্রামানিক, ২৫ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

আলহামদুলিল্লাহ্, নতুন মসজিদের কাজ আজ থেকে শুরু হলো। আজ সকাল দশটায় গ্রামের কয়েকজন ধর্মপ্রাণ উদ‍্যোগী মানুষ নিজ উদ‍্যোগেই মাটি কেটে দিয়েছে।

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর পূর্বে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০



প্রিয় কন্যা আমার-
ফাজ্জা তোমার স্কুল বন্ধ। তুমি তোমার নানা বাড়ি গেছো। এবার অনেকদিন থাকবে নানা বাড়ি। নার্সারি থেকে কেজি ওয়ানে উঠলে। বেতন বেড়েছে। খরচ বেড়েছে। আমি নিশ্চিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসাহাসি থেকে সাফল্যের ইতিহাস: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৫২



এক সময় অনেক সমালোচনার মুখে ছিল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (সাবেক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১)। তখন অনেকেই বলেছিল, এত টাকা খরচ করে এসব করে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু আজ ধীরে ধীরে সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোসাইপুর ১৯৭১

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৬ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:৫০



জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মোহমায়া

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬



খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।

ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।


হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই  ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×