খুব বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার কাঁচে বৃষ্টির পানির গড়িয়ে পড়া দেখতে ভালো লাগছে বেশ। এক একবার যখন পাশে কোন লম্বা বিল্ডিং থাকে, জানালার কাঁচে ছায়া পড়ে সে বিল্ডিঙের, তখন ট্রেইনের ভিতরে লাইট জ্বালানো বলে কাঁচে একটা আয়না আয়না ভাব আসে। নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ হঠাৎ নিজেকে দেখতে পায় মিলি। মুহূর্তেই আবার মিলিয়ে যাওয়ার আগে দেখতে পায়--বড় ভাবলেশহীন সে মুখ। অথচ কত কি ভাবছে আজ!
দেশ থেকে আসল যখন, তখন মিলির বয়স তের। রোহানের নয়। আসতেই অন্য পৃথিবী। চারিদিকে অন্য ভাষার কিচির মিচির। পোশাক আশাক অন্য রকম। একটু একটু মনে আছে মিলির। আব্বু আম্মুর সেই প্রথম দিকের শঙ্কা। আব্বু হন্যে হয়ে কাজ খুঁজত। আম্মু তো কোন কালেই চাকরি করে নি। বছর কয়েক এদিক ওদিক ঢু মেরে, ভীষণ ক্লান্ত, হতাশ কৃষিবিজ্ঞানী আব্বুর শেষ মেষ সব ছেড়ে ট্যাক্সি চালানো ধরতে হয়েছে। সেটাও কি সহজে হয়? বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, ট্যাক্সির লাইসেন্স জোগার। আম্মু কোন এক কারখানার চাকরি ধরেছে। আম্মু সেই সকাল বেলা চলে যেত। আব্বু তখন মোটে ট্যাক্সি চালিয়ে ফিরত। তারপর ঘুম। আম্মু আসত বেশ সন্ধ্যায়। আব্বু তার আগেই বাসা থেকে উধাও। গোজামিল দিয়ে খাওয়া দাওয়া, বাসায় ফিরলে টিভি দেখা, ফোনে কথা বলা, পড়াশোনা আর ঘুম--এ ছাড়া একটা লম্বা সময়ে মিলির জীবনে আর কিছু ছিল না।
কয়েক মাস আগে মোটে, আব্বুর কি যেন হলো। ক্যাচাক্যাচি শুরু করেছে। রাতে খেতে হবে সবার এক সাথে। বাসায় এসে সবাইকে ডেকে রীতিমত তদারকি শুরু করল হঠাৎ। দীর্ঘ সাত বছরে রোহানের বাংলা উচ্চারণ দুমরে মুচরে গিয়েছে দিব্যি। আব্বু হঠাৎ চেঁচামেঁচি, বাংলায় কথা বলতেই হবে। 'আমাদের রুটস ভুলে গেলে হবে?' সপ্তাহে একবার বাংলা নাটক ভাড়া করে এনে সবার দেখা শুরু হল। মিলির খারাপ লাগে নি, কিন্তু রোহান ততদিনে অনেক দূরের মানুষ। ওর কাছে ওসব স্রেফ যন্ত্রনা মনে হত। এ শুধু একটা উদাহরণ, আব্বু বুঝতে চায় নি একটুও। হঠাৎ যেন বুঝতে পারলেন ছেলে অনেক দূরের হয়ে গিয়েছে তাই হাচড়ে পাচড়ে কাছে আনার চেষ্টা। কিন্তু এভাবে কি হয়?
কাজ শুরু করেছিল রোহান ম্যাকডোনাল্ডসে বহু আগেই। স্কুল আর চাকরি মিলিয়ে বাসায়ই দেখা যায় না। আব্বু খবরদারি বাড়ানোর পরে বাসায় সময় কাটানো আরও কমিয়ে দিয়েছে।
সেদিনই কয়েকজন বাঙালী আঙ্কেল বাসায় আসলেন। কঠিন মুখ করে শুনিয়ে গেলেন, 'ভাই, আসলে আপনার ভালই চাই, তাই বলছি...'।
কি করতে দেখেছে ভাল করে জানে না মিলি। তবে সেদিন খুব চড়াও হয়েছিল আব্বু রোহানের উপর। রোহানের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল মিলি। রোহান শত্রু পক্ষের মত দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল--'য়ু ক্যান বি ড্যাডিস লিটল গার্ল!'
প্রতিদিন রোহানকে নিয়ে বাসায় ঘটে যাওয়া নাটক আর দেখতে ইচ্ছা হতো না। তখন অনেক ভেবেছে এটা কার দোষ? হঠাৎ সবাইকে শত্রু ভাবছে কেন ছেলেটা? হঠাৎই তো? নাকি...
যেদিন চলে গেল বাসা থেকে তার আগের রাতে বাসায় ফিরে নি রোহান। তারপরের ঘটনাটা দু:স্বপ্নের মত। সব অস্পষ্টতায় ভরা। চারিদিকে চিৎকার। হঠাৎই রোহানের বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যাওয়া। আম্মু পিছন থেকে ডাকছিল, আব্বু মানা করেছে। আজ তিন দিন হলো রোহানের কোন খবর নেই।
আব্বুর উপর তীব্র অভিমান নিয়ে আছে আম্মু এখন। কোন কথা বলছে না দু'জন। আজকে আসার আগে লাউঞ্জের পাশ দিয়ে আসার সময় চমকে উঠেছিল মিলি। অন্ধকার ঘরে একা একা বসে আছে আব্বু। বাকানো পিঠ দেখে খুব বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল, কেমন বুড়ো বুড়ো। সেই যাঁদরেল আব্বু কোথায় গেল? এই আব্বুই কি রাতে ঘুমানোর আগে গল্প শুনিয়ে যেত ওকে আর রোহান কে?
উত্তরহীন প্রশ্নগুলো শুধু ঘুরপাক খায় মেঘের দেয়ালে...
তখনই একটা ম্যাসেজ আসল--'বৃষ্টির দিনে দেশের কথা খুব মনে পড়ে। ইচ্ছা করে কাজে বাঙ মারলাম। ভাল আছেন মিলি? কাছাকাছি থাকলে এক কাপ কফির দাওয়াত দিতাম।' মিলি 'কল সুজন' বাটনে টিপ দিল।
(চলবে)
আলোচিত ব্লগ
'মাহাথিরনোমিক্স'- মালয়েশিয়াকে যেভাবে নিজ পায়ে দাঁড় করালো (পর্ব - ১)

আমাদের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া গেলেন। এটা খুব ভালো এক মুভ ছিলো। সারা বিশ্বকে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু, সারা বিশ্বে মালয়েশিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অগ্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদের সাথে তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন
গোসাইপুর ১৯৭১

জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
নিউইয়র্কের ডায়েরী: ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে লং-আইল্যান্ড

আমাদের সামার ভেকেশন চলছে এখন। প্রায় তিন মাসের ছুটি। এই ছুটিতে বসে না থেকে নিউইয়র্কের একটি ন্যাশনাল ল্যাবে জয়েন করলাম ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে! গবেষণা করে যে পৃথিবীকে উদ্ধার... ...বাকিটুকু পড়ুন
কবিতাঃ মোহমায়া

খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।
ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।
হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।