'মন খারাপ?'
চমকে উঠল মিলি। সুজন টেবিলে হেলান দিয়ে হাসি হাসি ভাব নিয়ে ওকে দেখছে। ও খেয়ালই করে নি সুজন কখন এসেছে।
'কখন এলেন? খেয়াল করি নি একদম।' মুখে হালকা হাসি টেনে বলল মিলি।
'এই তো বেশ কিছুক্ষন। চেহারা দেখে ভয় লাগছিল কিন্তু, মনে হচ্ছিল কাউকে ধরে তক্তা মাইর দেয়ার প্ল্যান করছিলেন'।
'হা হা হা। তক্তা মাইর জিনিসটা কি?'
'তক্তা মাইর হলো উপরে এক তক্তা, নিচে এক তক্তা। তারপরে সোজা ডলা।'
'আমাকে দেখে কি এত কুটিল মনে হয়? এত ভয়ংকর কথা ভাবলেন কি করে?'
'আরে আগে ভাবতেই পারি নি, আজকে চেহারা খুব কঠিন করে রেখেছিলেন, ভয় পেয়েছিলাম।'
কফির দাওয়াত যেহেতু, কফিই নেয়া হোক। কাপাচিনোর অর্ডার দিয়ে কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে টুকটাক কথা বলছে সুজন আর মিলি। গ্লোরিয়া জিন্সের ইন্টেরিয়র ডিজাইন মিলির খুব পছন্দ। কেমন লালচে আলোয় ভরা। এখানে সেখানে বাহারী ল্যাম্প। উষ্ণ একটা ভাব। কথার বিষয় বস্তু ওটাই। সুজনের হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে গেলো, 'ঘটনা দেখলেন?'
'কি ঘটনা?'
'এই যে, আমাদের পরে এসে অর্ডার দিয়ে সুন্দর করে পেয়ে গেল কয়েক জন। আমাদেরটার খবর নাই।'
'হুম, তো কি?'
'বুঝছে সেকেন্ড ক্লাস মানুষ, এত আদর যত্ন না করলেও হবে।' সুজনের ভ্রু আরও কুঁচকে গিয়েছে।
হেসে ফেলল মিলি। 'কি সব আবিষ্কার করেন! কাপাচিনো বানাতে সময় লাগে না? অন্যরা হয়তো কম ঝামেলার জিনিস চেয়েছে তাই সময় কম লেগেছে।'
'আরে নাহ, ইচ্ছা করে শয়তানি করে এরা।'
কফি নিয়ে টেবিলে বসে মিলি আগের আলোচনার জের ধরল, 'ইচ্ছা করে শয়তানি করে কারা?'
'এই যে এরা, সাদারা।'
'সাদারা কি রে? রেসিস্টের মত কথাবার্তা বলেন কেন?'
'রেসিস্টদের নিয়ে রেসিস্টের মতই কথা বলতে হয়।'
'এখানে আপনি শুধু শুধু ব্লেইম দিচ্ছেন..'
'আচ্ছা, এটা না হয় তেমন কিছু না, কিন্তু এমনি ওরা যে আমাদের সহ্য করতে পারে না সেটা মানবেন তো?'
'না মানব কেন? কথাটা সত্যি না। অস্ট্রেলিয়া মাল্টিকালচারাল দেশ।'
'মাল্টিকালচারাল না ছাই। এই সব মুখে বলে। ভিতরে ভিতরে সব পিত্তি জ্বলে যায়। সব চোরের গুষ্টি, পূর্বপুরুষের চুরি করা মালে বিনা কষ্টে ভাগ বসাতে আসলে কার ভাল লাগে বলেন?'
'কি বলছেন এসব? পূর্বপুরুষ কি করল তার জন্য এদেরকে গালাগালি করবেন কেন? ব্লেইম এদের উপরে আসতেই পারে না। আর জানেন কত ছোটখাট চুরির জন্য তখন এরকম নির্বাসনে পাঠানো হতো এই দেশ আবাদ করার জন্য? ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা ডিম চুরি, টুপি চুরি করলেই ধরে সোজা পাঠায় দেয়া হতো।'
'চোর চোরই।'
'আমার মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছেন। এই রকম এটিচুড থাকলে রেসিজমের স্বীকার হবেন না তো কি?'
'আগেই বলেছি এদের সাথে আমার শুধু বিজনেস ইন্টারেকশনের সম্পর্ক। আমাকে একটা ভাল এডুকেশন দিচ্ছে, আমি জান পানি করে টাকা দিয়ে সেটা আদায় করে নিচ্ছি। নাথিং মোর। ইচ্ছা মত লাথি খাচ্ছি, বদলে এত অনুগত হয়ে কাজ নাই।'
'ওহ য়ু আর ইম্পসিবল'। মিলির কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
সুজন হেসে ফেলল, 'আপনাকে দোষ দেই না, এসব বুঝবেন না। বাবা মা ছায়ার তলে পুরা ফ্যামিলি নিয়ে আরামে আছেন, রিয়েল লাইফে কত কষ্ট বুঝবেন না।'
এতটুকু বলতেই সুজন খেয়াল করল মিলির চেহারা কেমন বিবর্ণ হয়ে গেল। চুপ করে চোখ নামিয়ে মনযোগ দিয়ে কফি খেতে লাগল। গরু কোথাকার, নিজেকে কষে গালি দিল সুজন। এরপর একটু ঝুঁকে বলল,
'আই অ্যাম স্যরি মিলি। আপনার মন যেন খারাপ না হয় তাই রোহানের কথা জিজ্ঞাসা করি নি এতক্ষন। অথচ ঠিক ঠিক হল। রোহানের কোন খবর আছে?'
মিলি একটু হাসার চেষ্টা করল কেমন। মাথা নাড়ল দু'দিকে, কফির দিকে তাকিয়েই। সুজনের খুব অস্বস্তি হচ্ছে। মিলির শ্যামলা মুখে কেমন লালের ছোঁয়া। কেঁদে ফেলবে না তো?
'ওকে ফোন করেন নি?'
একটু চুপ করে গলা পরিষ্কার করে সেই আগের মতই চোখ নিচে রেখে বলল মিলি, 'ফোন অফ করে রেখেছে। তবে মা ওর স্কুলে ফোন করেছিল। ও স্কুলে যাচ্ছে।'
'যাক, ও তাহলে সেইফ। এটাই সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট।'
'হুম।' মিলি একবার বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখল। তারপরে কফিতে মন দিল আবার। সুজনের খুব খারাপ লাগছে, মেয়েটাকে সহজ করা যাচ্ছে না কিছুতেই।
'মিলি একটা কথা বলি?'
মিলি তাকালো এবার, চোখে দু'ফোঁটা অশ্রু টলমল করছে।
সুজন একটা শুকনো হাসি দিয়ে বললো, 'আপনি যখন মন খারাপ করেন, তখন আপনাকে দেখতে খুব বিচ্ছিরি লাগে। বিচ্ছিরি মানে, আপনার চেহারা বিচ্ছিরি না, কিন্তু হয় কি, নিজেকে খুব অসহায় লাগে। খুব ইচ্ছা করে মন ভাল করে দিতে, কিন্তু যত চেষ্টাই করা হোক, আপনার চোখ গুলো খুব বিষন্ন থাকে... কিছু বলতেও ভয় লাগে। অথচ খুব খারাপ লাগতে থাকে। সব মিলিয়ে অনুভূতিটা খুব বিচ্ছিরি লাগে। সো, মন খারাপ করে থাকা উচিত না আপনার একদম।'
মিলির ঠোঁটের দু'পাশে ভাঁজ জমল, জল ভেজা, হাসি মাখা চোখে স্পষ্ট প্রশ্রয়, 'নাইস ট্রাই!'
(চলবে হয়তো!)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০০৭ বিকাল ৫:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


