তারিক আর ক্যাথরিন মাসুদের অন্তর্যাত্রা দেখলাম।
একজন আন্টির কাছ থেকে আনা ডিভিডিতে দেখলাম। কপাল খারাপ আমার, প্রথম এক ঘন্টা কথার সাথে ঠোঁট মিলে না। ভীষণ বিরক্ত লাগছিল, কেউ কথা বলতে গেলেই তাই আমি সাবটাইটেল দেখছিলাম, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে এতে ডুব দিতে পারব না। তবু, শেষ রক্ষা হলো না বোধ হয়, চরিত্রগুলোর সাথে মিলে মিশে এক হতে পারি নি।
একটা বড় কারণ বোধ হয়, আমার মনে হয়েছে ইংরেজির ব্যবহার বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। লন্ডনে বড় হওয়া সোহেলের জন্য ইংরেজিতে কথা বলাই স্বাভাবিক, কিন্তু তার মা আর মামা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে গিয়েও ইংরেজিতে বলে, তখন ঠিক বাস্তব মনে হয় না। আর সাধারনত দেশীয় আত্মীয় স্বজনেরা বিদেশে বড় হওয়া ছেলেমেয়েদের বাংলা শেখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে লেকচার না দিয়ে ছাড়ে না, এত সহজে সুন্দর একসেন্টে ইংরেজি বলে না। মূলত: প্রবাসী আর বিদেশীদের জন্য করা হয়েছে মুভ্যিটা (তাই কি?) এটা কি একটু মোটা দাগে বলা হয়ে গেল না?
মনোলগের অতিরিক্ত ব্যবহারে খুব বিরক্ত লেগেছে। তারিক মাসুদের সিনেমার ধরণটাই এমন যে ওর চরিত্রগুলো কখনও শারিরীক আর মানসিক ক্লোজ প্রক্সিমিটিতে আসে না, নৈ:শব্দ, মুখের ভাব আর শরীরের অঙ্গ ভঙ্গিই অনেক কিছু বলে দেয়। চরিত্রগুলো পরস্পরের সাথে বেশ 'রিজারভড'। মনে হয় একটা উঁচু জায়গা থেকে দেখা হচ্ছে চরিত্রগুলোকে, আগা গোড়া বুঝা যায়, কিন্তু তাদের খুব কাছে যাওয়া যায় না। পাশে থেকে বা সামনে থেকে দেখা যায় না। মনোলগের ব্যবহার দিয়ে চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থা বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু বায়োস্কোপের ক্ষেত্রে সেটা কেমন জানি লাগে। বইয়ে হলে মানা যায়। সিনেমাতেও অল্প স্বল্প মানা যায়। এখানে একটু বেশিই হয়েছে।
তাছাড়া মুভ্যির শটগুলো, ক্যামেরার ব্যবহার বেশ ভালো লেগেছে। বাংলাদেশকে খুব একজটিক মনে হচ্ছিল সত্যিই। গানে গানে ভরা ছিল। লোকসঙ্গীত কখনও লাইভ শুনিনি, শুনতে লোভ হচ্ছে খুব। গান সিলেকশন বেশ ক্লেভার ছিল, সব ফিরে আসার গান। এমনকি মিলাদে হুজুরও দেখি জন্মভূমি নিয়ে ওয়াজ দেয়! বেশ যত্ন করে বাছাই করা হয়েছে বুঝা যায়। অন্তর্যাত্রাগুলো শরিরী যাত্রার সাথে সমান্তরালে চলছিল। শিরীনের রিকশা ভ্রমন, শিরীন আর সোহেলের ট্রেইন ভ্রমন--সব জায়গায় মনোলগে বানান করে বলে দেয়া হচ্ছিল--হ্যালো, আমার এখন অন্তর্যাত্রা হচ্ছে! আমি এখন বদলে যাচ্ছি, মেটামরফসিসের মাঝামাঝি, নিজের সাথে বোঝা পড়া করছি! একটু ক্লীশেড মনে হয়েছে থিমটা, কখনও কথাগুলো। তবে একই কথার আবিষ্কার হতে পারে অনেকভাবে, ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ব্যক্তিগত উপলব্ধি তার একান্তই নিজের মত হওয়াই স্বাভাবিক--যদিও শেষ মেষ মূল কথা এক, তাই ক্লীশেড লেগেছে আমার কাছে। অবশ্য বাংলাদেশে এমনটা আগে হয় নি, তাই ঠিক আছে।
আসলে অনেক বেশি আশা নিয়ে অধীর আগ্রহে বসে ছিলাম অন্তর্যাত্রা দেখার জন্য। অন্তর্যাত্রা বের হওয়ার আগে থেকেই। ঠিক সেই অনুপাতে মুগ্ধ করতে পারে নি, তাই হয়তো আমার প্রতিক্রিয়া শুনে মনে হচ্ছে দেখার মত কিছু না। অবশ্যই দেখার মত, তবে দেখে মনে হওয়ার মত--তারেক মাসুদ আর ক্যাথরিন এর চেয়ে ভালো কিছু সৃষ্টির ক্ষমতা রাখেন!
ও আচ্ছা, ব্রিক লেইনের যেই কপি ছিলো সোহেলের হাতে, আমার কপিটার প্রচ্ছদও এক রকম। আমার কপিটাও ঢাকার রাস্তা থেকে কেনা, ২০০ টাকায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


