সিডনীতে এসে স্কুলে পড়া আমার জন্য বেশ বড় সড় ধরণের একটা ধাক্কাই ছিল বলা যায়। আমি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়েছি। হিন্দী মুভ্যির ভান্ডারে ছিল কেবল কুচ কুচ হোতা হ্যায়, ব্যাস। ইংরেজি মুভ্যিও দেখা হতো খুব কম। চেহারায়, আকারে, চিন্তায় ভাবনায়, ভাষায়, চলনে বলনে, পোশাকে আশাকে ছিলাম আগা গোড়া বিশুদ্ধ বাঙালি মুসলিম। টিন কালচারের সাথে পরিচিত হলাম বটে স্কুল জীবনে, কিন্তু ইউনির জীবনটা পুরাই অন্যরকম। প্রথম যেদিন ইউনিতে আসলাম, সেদিন দেখি এখানে সেখানে বড় করে বিজ্ঞাপন, আজকে রাউন্ড হাউজে সন্ধ্যার মুভ্যি সেশনে ফ্রি বিয়ার, কিংবা মাত্র পাঁচ ডলার। অমুক ক্লাব বা তমুক পার্টিতে গেলে প্রথম বিয়ার ফ্রি। বুঝে গেলাম, সামাজিকতা মানেই মদ আর নাচ--এই তো। লাইব্রেরিতে গিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখা গেলেই বাঁচোয়া, প্রেমিক প্রেমিকাদের যে প্রাইভেসি দরকার নেই, আশে পাশের মানুষের প্রাইভেসি দরকার তার চেয়েও বেশি--এই বোধটা খুব করে চেপে বসে। এক ভিন গ্রহে চলে এলাম মনে হচ্ছিল। তারপরেই জানলাম, ওই স্কয়ার হাউজের চার তলার (উহ সিড়ি ভেঙে ওঠা কি যে বিরক্তিকর!) এক কোনে নামায ঘর আছে। সেখানেই যাওয়া শুরু করলাম। অল্প দিনেই বুঝে গেলাম, ওটা আসলে স্রেফ নামায ঘর নয়। মুসলিমদের জন্য বেশ বড় ধরণের সোসাইটি আছে, দুইশ+ সদস্য। দারুণ এক পরিবারের মত জড়িয়ে গিয়েছি সবার সাথে। যেই মুসলিম ছেলেরা একটা ইসলামিক পরিবেশের প্রয়োজন বোধ করে, তারা ভীষণ ভদ্র। ওদের চোখের দৃষ্টিতে যেই শ্রদ্ধা দেখতে পাওয়া যায়, সেটা সারা সমাজের মানুষের চোখে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যেতে হয়, পাওয়া যায় খুব কম। হিজাব ছাড়া মেয়ে থাকলেও, বেশির ভাগই হিজাব পরে। বারবিকিউ আর বক্তৃতায় ছেলেদের এক গ্রুপ আর মেয়েদের আলাদা গ্রুপ হয়ে যায়। দারুণ জমে যায়। ট্রেডিশনাল রোল উল্টে দিয়ে ছেলেদের দিয়ে রান্না করাই আমরা। খারাপ বারবিকিউ করে না এক এক জন! বক্তৃতা কিংবা ক্লাসগুলোতে আলাদা রো' তে বসে ছেলে মেয়েরা। ক্যাম্পাস থেকে এসে ইসলামিক সোসাইটিতে ঢুকলেই মনে হয় একটা আলাদা জগতে ঢুকে গিয়েছি--খুব আপন কোন নিজেস্ব জগতে।
সামাজিক জীবন ছাড়া থাকতে হলে আমি মরে যাব। কিন্তু সামাজিক জীবন বলতেই যদি বারে যেতে হতো, মদ না খেলেও অন্যের মদ খেতে দেখতে হতো, উদ্দাম নৃত্যে নিজেকে খুঁজে পেতে হতো, আমি মরতাম দ্বিতীয় বার। আলহামদুলিল্লাহ, মুসলিম ছাত্র ছাত্রীদের প্রয়োজন মিটানোর জন্য ক্লাব করার কথা তিরিশ বছর আগেই কেউ ভেবে গিয়েছে, করে গিয়েছে। এখন দিন দিন কেবল মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ক্লাবগুলো নতুন করে প্রান পাচ্ছে। ক্যাম্পাসের একশ দেশের ইতিহাস নিয়ে আসা মুসলিম ছাত্র ছাত্রীরা এক সাথে দারুণ সামাজিক সময় কাটাচ্ছে। সারা দেশের সেরা ৩০% ইউনিতে পড়ে। মুসলিমদের মধ্যে, এই হারটা আরও বেশি। সমাজের খুব শিক্ষিত, সচেতন, বুদ্ধিমান মুসলিমেরা এক সাথে এক সমান্তরাল পরিচয় গড়ে তুলছে নিজেদের। এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে ভালোই লাগে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


