পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমেরা আসা শুরু করেছে খুব বেশি দিন হয় নি। সাধারনত প্রথম প্রজন্মের মানুষেরা নিজেদের দেশ থেকে আসা মানুষদের সাথে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সাদাদের পূজা করার যেই মানসিকতা দেশে থাকতে ছিল, এখানে এসে বুঝিবা মোহভংগ হয়। নতুন দেশ সব কিছু নতুন করে শুরু করার চাপে, ভাষা না জানার ফলে কিংবা এখানে সেখানে অপমানিত হওয়ার তিক্ততা ঝারে পশ্চিমের উপর, সাদাদের উপর। এক সাথে আড্ডায় বসলেই হলো। ইন্টারেস্টিং হলো, তারা দেশের বন্দনাও করে খুব কম। 'কোন আশা নেই' দেশ নিয়ে, এই ধরণের একটা ধারণা বুলন্দ স্বরে উচ্চারণ করে। এতো সপ্তাহ শেষের বিলাসিতা কিংবা বিনোদন। সপ্তাহব্যাপী অর্থসংস্থান নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকে। খুব কষ্টের ধাক্কাটা তো পাঁচ বছরেই কেটে যায় সাধারনত। তারপরে চিন্তা আসে নতুন গাড়ির, নতুন বাড়ির। এসব হলে, আরেকটু বড় বাড়ির আর আরেকটু বড় গাড়ির। সপ্তাহ শেষের বিলাসিতাও একই সাথে চলতে থাকে।
মুসলিমদের প্রতি একটা বড় ধরণের অভিযোগ সাধারণত পশ্চিমা মানুষ যা করে তা হলো, তারা কেউ পশ্চিমা সমাজের সামগ্রিক ভালোর কথা চিন্তা করে না। খুব বেশি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, অর্থোপার্জনে ব্যস্ত। কারণটা বুঝা যায়, দেশ থেকে যারা আসে তারা বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত স্বার্থপর মানসিকতা কি সহজে ছেড়ে যায়? নিজে পড়ে খেয়ে ভালো থাকতে পারলেই হলো। তারপরেও, করে অনেকে। দেশ থেকে নতুন একজন আসলে তাকে হাত ধরে উঠিয়ে দেয় কিন্তু তার স্বদেশী মানুষেরাই। সমস্যা হলো, এগুলো নিয়ে গবেষণা হয় নি একদম। কোন কেইস স্টাডিও যদি হতো, তাহলে মুসলিমদের উপর থেকে বদনাম ঘুচতো কিছুটাও।
সে যাক গে, চ্যারিটি নিজের দেশে করে। নিজ গ্রামে। নিজের দেশের রাজনীতি নিয়ে দিন রাত মাথা অস্থির করে ফেলে। নিজের দেশের মানুষের জন্য জান দিবে। কিন্তু প্রথম প্রজন্ম আসলেই এ দেশকে নিজের বলে ভাবতে পারছে না বলে তেমন কিছু দিতেও পারে না।
দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় প্রজন্মের ব্যপারটা অন্যরকম। 'হোম ইজ হোয়ার দ্যা হার্ট ইজ'--হৃদয় যেখানে থাকে, সেটাই তো নিজের বাসা। নিজের দেশ। ছোটবেলা থেকে যেখানকার আলো বাতাস আর আদরে বড় হয়, সেখানটায় হৃদয় থাকবে না? রক্তের টান বোধ করে বটে, কিন্তু সেটা অন্যরকম টান। স্বাচ্ছন্দ্য বোধের টান এই সব দেশেই রয়ে যায়। কিন্তু তারপরেও কি তারা পশ্চিমা সমাজের ভালোর জন্য খুব বেশি দিতে পারছে? সংখ্যাটা এখনও কম। একটা বড় কারণ হলো, বাবা মায়ের থেকে শিখে নেয়া জীবনের লক্ষ্য। সেদিন, ব্লগে কে যেন আমাকে বলছিল, এক চল্লিশ বছরের গালিবাজের কথা বলে--ওই ভদ্রলোকের যত ডিগ্রী আছে, আমি (আস্তমেয়ে) আরও মানুষ সাথে নিয়েও তার মত এত ডিগ্রী বগলদাবা করতে পারব না। সাধারন মধ্যবিত্ত মানসিকতাটা আসলে এরকমই। মানুষ হিসেবে যত স্বার্থপর এবং জঘন্য মানসিকতারই হোক, ডিগ্রী থাকলেই সে সফল মানুষ। পরম পূজনীয়। টাকা কামাতে পারলেই এক সার্থক জীবন। এমন সার্থক মানুষের সামনে অন্যদের মেরুদন্ড জেলীফিশের মত ল্যাল ল্যাল করে। যত অন্যায়ই করুক, চোখে জেলী ফিশের বিষাক্ত ক্যামাফ্লেজীয় কেমিক্যাল ঢুকে অন্ধ হয়ে যায়।
সে যাক গে, বাবা মায়ের থেকে ছেলে মেয়েতে শিক্ষাটা চলে আসে। তাই হয় দেখা যায় ডাক্তার বাবা মায়ের ছেলেমেয়েরা ভীষণ ভালো করছে পড়াশোনায়, ডাক্তার কিংবা আইনবিদ হচ্ছে। আর না হয়, টাকার পিছনে হন্যে হয়ে ছুটতে থাকা বাবা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক ছেলে মেয়েরাই উচ্ছন্নে যায়। তাই মুসলিম ছেলেমেয়েদের মধ্যে অন্যায়ের হারও খুব কম না। ড্রাগ এডিকশন কিংবা গ্যাং কালচার--দিন দিন বাড়ছে।
এক আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপরতার জীবাণু এভাবে কখনও বংশানুক্রমে ছড়াচ্ছে, কখনও প্রতিষেধক না থাকায় সমাজ থেকে পেয়ে বসছে। দেশীয় মুসলিমরা সব এক সাথে থাকে। অস্ট্রেলিয়ায় লেবানীজ মুসলিমদের মধ্যে ড্রাগ আর গ্যাঙ কালচারের সমস্যা অনেক বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ এটা--লেবানীজ বাবা মায়েরা এক সমাজে থাকে। বন্ধুর ছেলেমেয়ে থেকে জীবানু কোন ফাঁকে নিজের ছেলে মেয়েতে ঢুকে টের পায় না। বাঙালীরাও সেই পথে।
শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের সংখ্যাও অনেক বেশি। তবে ওই যে, তারাও সিস্টেমের অংশ হয়ে অন্ধ আত্মকেন্দ্রিকতায় বাড়ি, গাড়ি আর টাকার পিছনে ঘুরছে।
এসব গভীরে ভেবে দেখলেই আসলে বুঝা যায় চরমপন্থী ইসলামিক মানসিকতা কোথা থেকে আসে। এই ছেলেমেয়েরাই এক সময় জীবনের মানে খুঁজতে খুঁজতে ভুল জায়গায় জীবনের মানে খুঁজে পায়। আফসোস, বাবা মা জীবনের সত্যিকারের মানে শিখিয়ে দিতে পারে নি।
মুসলিমদের নিজেদের কথা বলার মত বুদ্ধিমান, চৌকশ আর হৃদয়বান মানুষের খুব অভাব, কারণ, সেই প্রয়োজনটা এই দুই প্রকার আত্মকেন্দ্রিক মানুষদের কেউই বোধ করে না কখনও।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


