ছুটিতে সবচেয়ে বড় কাজ হয়েছিল একটা কোর্স করেছি। ইসলামী শরীয়াহ এর উপরে। বক্তার নিজের জীবনটা ইন্টারেস্টিং। শেইখ তওফিক চৌধুরি--হুম, নাম শুনেই বুঝা যায় বাঙালী। ছোট বেলা থেকেই এখানে আছেন। বাবা মা সাধারন বাঙালী। অনেক বড় হওয়ার আগে জানতেনই না, পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ, কোন মাফ নেই। জানতেন না, বুড়ি হওয়ার আগেই যে হিজাব পড়তে হবে। জানতেন না, কুরআনের যে অর্থ বুঝে পড়ার দরকার আছে। একবার খতমী কোরআন দেয়ার পরে পারিবারিক উৎসব দেখে ভ্রম হয়েছিল, কোরআনের পন্ডিত হয়ে গিয়েছিলেন (যদিও, এক অক্ষরও বুঝেন নি)। মানুষ হিসেবে ভীষণ ট্যালেন্টেড। অস্ট্রেলিয়ায় মেডিসিনে পড়া খুবই কম্পিটিটিভ। সারা দেশে মনে হয় কয়েক শ' পড়তে পারে। তার মধ্যে তিনি মেডিসিনে পড়তেন। সারা দেশে থার্ড ছিলেন মেধার দিক দিয়ে। ভীষণ ভালো করছিলেন মেডিসিনে। ফোর্থ ইয়ারে থাকতে হঠাৎই বুঝলেন ইসলাম সম্পর্কে আরও জানা দরকার। দেশান্তরী হলেন। মদীনা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে ইসলাম সম্পর্কে অনেক জেনে দেশে ফিরলেন। এখন মেডিসিন পড়ছেন, এবং ইসলাম সম্পর্কে শিখিয়ে যাচ্ছেন নতুন প্রজন্মকে।
অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে হুজুর বা মোল্লা শ্রেনীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আসলেই ভীষণ কম ছিল। খুবই। হবে না কেন? চার ছেলেমেয়ের মধ্যে সবচেয়ে বোকা সোকা সরল ছেলেটাকেই দাদা দাদীর ইচ্ছা পূরনের জন্য মাদ্রাসায় পড়ানো হয়। কুরআন আর ইসলামিক জ্ঞান সবার জন্য অবশ্যই, কিন্তু এই জ্ঞানের তো শেষ নেই। কুরআন আরবের মুর্খেরাও বুঝেছিল হ্যা, কিন্তু কুরআন নিয়ে যত বই আছে, সব নিয়ে তো লাইব্রেরির পর লাইব্রেরি হয়ে যায়। জ্ঞানের সাগরটা এত বিশাল যে এক চুমুক দিয়ে কেউ সন্তুষ্ট থাকতে চাইলে পারবে, আবার কেউ ডুব সাতার দিতে চাইলেও তল খুঁজে পাবে না। যার এক চুমুকের বেশি নেয়ার ক্ষমতা নেই, সেই মানুষগুলোকেই সার করে বসিয়ে দেয়া হয়েছে ইসলামকে বুঝার জন্য। পালের পর পাল 'আলেম' তৈরি হচ্ছে যাদের শুরুতেই বুঝার ক্ষমতা কম। তারপরে সিস্টেমে পড়ে যেই ক্ষমতা আছে সেগুলোও অব্যবহারে মরচে পড়ে যাচ্ছে। টাখনুর উপর পাজামা না নিচে, কয় মুঠি দাড়ি, চুল কিভাবে আচড়াতে হবে, সেলাই সহ না সেলাই ছাড়া পাঞ্চাবি--রাজ্যের অর্থহীন সব প্রশ্নে ব্যতীব্যস্ত থাকাতেই তাদের ইসলাম সীমাবদ্ধ। কিছুদিন আগ পর্যন্তও নাকি মাদ্রাসায় উর্দু শিখতে হতো। একি শুনি! শ্রদ্ধা থাকবে কি করে?
অস্ট্রেলিয়ায় আসার পরে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। নানা দেশের মুসলিমদের প্রভাবে মুসলিমদের এক নতুন, দারুন পরিচয় গড়ে উঠা দেখছি। তারচেয়েও অন্য রকম অভিজ্ঞতা হলো শেইখ তওফীক চৌধুরির মত অনেককে দেখছি। বাংলাদেশের প্রচলনটা উল্টে গিয়েছে এখানে। যেসব ছেলেমেয়েরা বোকা সোকা, কিংবা জীবনে ফোকাস কম, তারা হারিয়ে যাচ্ছে অর্থের পিছনে অর্থহীন দৌড় দিতে দিতে, কিংবা সমাজে সাময়িক প্রতিপত্তি লাভের পিছনে হয়রান হয়ে ছুটতে গিয়ে। আর তাওফীক চৌধুরির মতো ভীষণ ট্যালেন্টেড, বুদ্ধিদিপ্ত মানুষদের অনেকেই ইসলামকে বুঝার চেষ্টা করছে। আমি যেই কোর্সে গিয়েছিলাম সেখানে মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন কিংবা সাইন্সে পড়া ছেলেমেয়েরা বেশি ছিল।
একটা নতুন ধারা শুরু হচ্ছে... আমি জন্মটা দেখতে পাচ্ছি। ভাবনাগুলো খুব অগোছালো, এ-ই লিখে ফেললাম ব্লগ হিসেবে। আমি যখন ইংরেজিতে ব্লগ করতাম, তখন পরিচয় ছিল ইংল্যান্ডের অনেক বাঙালীর সাথে, যারা এমনিতে খুবই ট্যালেন্ডেড। মেডিনিস না হয় ল'তে পড়ছে। কিংবা মিডিয়া স্টাডিজ। গ্র্যাজুয়েশনের পরে, কিংবা মাঝপথেই চলে যাচ্ছে মিশরে। সেখানে পশ্চিমা মুসলিমদের জন্য অনেক ইনস্টিটিউট আছে, যেখানে এক বছরে আরবি শিখে ফেলা যায় কুরআন বুঝে ফেলার মতই। দেখলাম, সবাই যাচ্ছে, কুরআন বুঝার মত আরবি শিখে চলে আসছে। মজার ব্যাপার (ভীষণ, ভীষণ) হলো, ব্যাপারটা শুধু ছেলেরা করে না, মেয়েরাও করে। মেয়েদের পড়াশোনার জন্য পুরাপুরি ইসলামিক পরিবেশ আছে, যেখানে ফ্যামিলি ছাড়াই একা একা চলে যায় এক একজন।
সেদিন কোর্সে গিয়ে বুঝলাম, অস্ট্রেলিয়াতেও ধারাটা শুরু হচ্ছে হচ্ছে। ৬০০০ ডলারে টিকেট থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ দিয়ে মিশরে গিয়ে কুরআন বুঝে ফেলার মত আরবি শিখে আসা যায়। অনেকেই করছে।
প্রথম প্রজন্মের মধ্যে ইসলামের সুগভীর জ্ঞান, বিশ্বাস আর পার্থিব প্রফেশনাল যোগ্যতা--সব কিছু এক সাথে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। আমাদের দেশের দু'টো আলাদা ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা, যার একটাতে দ্বীন শিখানো হলে দুনিয়া শিখানো হয় না, আরেকটায় দুনিয়া আছে বলে দ্বীন নেই--তার জন্যই এই ব্যবস্থা। আবার যে সব মসজিদের হুজুর আছে দেশ থেকে সরাসরি ইম্পোর্টেড, পশ্চিমা পৃথিবী সম্পর্কে তাদের ধারনা যে কি ভীষণ অপ্রতুল সেটা বলাই বাহুল্য।
এই যে পশ্চিমে বড় খুব ট্যালেন্ডেড মানুষগুলো ডিগ্রী অর্জনের সাথে সাথে ইসলামকে বুঝার চেষ্টা করছে, সমাজ আর মানুষের সত্যিকারের ভালো করার জন্য। এই ধারাটা অপেক্ষাকৃত ভাবে খুবই নতুন। গত ৫ বছরেই খুব বেশি করে বেড়েছে। ৯/১১ এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হবে। তারপরেই তো হঠাৎই ইংরেজিতে ইসলামিক বই এর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। ইসলামিক মিউজিক বাড়ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। ইসলামিক কমেডির জন্ম হলো। টিভি চ্যানেল হচ্ছে। পোশাক আশাকের ইন্ডাস্ট্রি হঠাৎই বাড়া শুরু করেছে। একটা বিষ্ফোরণের মতো, হঠাৎই। যাদের সবচেয়ে কাছে পৌছাচ্ছে এসব, তাদের বয়স কম। ২০-৩০ এর মধ্যে হবে। আরও ১০/২০ বছর পরে তারা চল্লিশে পৌছাবে। সাধারনত সেই বয়স থেকেই সমাজে মানুষের কাজের লং লাস্টিং ছাপ পড়তে শুরু করে। আমার খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, ১০-২০ বছরের মধ্যে অনেক অনেক পরিবর্তন দেখতে পারব। দ্বিতীয় প্রজন্ম, ৯/১১ এর আফটার ম্যাথ, ম্যাচুয়ার এইজ.. সব কিছু এক সাথে প্রভাবক হয়ে এক ধরনের নীরব বিপ্লব ডেকে আনবে... আমি দেখছি, পরিবর্তন হচ্ছে-হচ্ছে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


