স্কুল জীবনের বন্ধুদের সাথে যৌথ আড্ডার তারিখ ঠিকঠাক হলো এ পর্যন্ত আট বার। প্রতিবারই কোন না কোন ছুতো ধরে প্ল্যান বাতিল হলো। আজ এর সমস্যা তো কাল তার সমস্যা। সমস্যাগুলোর বিবরণ শুনলে পিত্তি জ্বলে যায়। দিন তারিখ পুরো ঠিক হয়ে যায়, তারপরে আসল দিনের ঠিক আগের দিন ফোন, 'দোস্ত, আমারে হঠাৎ করেই কাজে ডাকলো... না করি কি করে!' এ হচ্ছে কাজ করে নিজের বিয়ের জন্য টাকা জমাতে থাকা একজনের অজুহাতের ধরণ! আচ্ছা, বাঙালী মেয়েরা আবার কবে নিজের বিয়ের জন্য টাকা জমানো শুরু করলো? আর বন্ধুদের জন্য একদিন কাজ না করলেই বা কি? আরেকজন, যার বিয়ের কথা চলছে, তার ঘর থেকে বেরুতে হলে নানা ফ্যাঁকড়া। আজ ডাল রান্না করতে হবে তো কাল রুই মাছ, আর পরশু? 'আম্মু আব্বু আমার উপর এম্নি খুব রেগে আছে...'
নিজের সংসার শুরু করার আগেই ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা, এক জামাই আর ঘর ভর্তি পোলাপান বাগিয়ে বসলে?
অনেক যুদ্ধ, অনেক ঝাড়ি, অনেক মান অভিমান আর ফোনের ক্রেডিট লসের পরে ঠিক হলো আজ ঠিক সাড়ে নয়টায় বন্ধুদের সাথে দেখা হবে। আমার ঘুম ভাংতে ভাংতেই আটটা। তারপর হুড়মুড়িয়ে উঠে মুখধোয়াকাপড়ইস্ত্রীনাস্তাখাওয়ারেডিহওয়া... ট্রেইনে চেপে বসতে বসতে সোওয়া নয়টা! মুখ কাঁচুমাঁচু করে ম্যাসেজ করলাম, 'উপস, আমার আসতে একটু দেরি হয়ে যাবে
জবাব আসলো, 'কিসের দেরি... তোমাকে কেউ বলে নাই, আজকের প্ল্যান ক্যানসেল হইছে?'
ততক্ষনে ট্রেইন তিনটা স্টেশন পার হয়ে গিয়েছে।
চিড়বিড়ে রাগ আর উপচে ওঠা অভিমান নিয়ে ইমুকে ফোন করলাম। ইমু, দি ওল্ড ফেইথফুল ঘটনা শুনেই বলে, আচ্ছা দাঁড়াও, আর কেউ আসুক না আসুক, আমি আসছি!
বই কিনেও মানুষ ফতুর হয়
ইমুর আসতে যতটুকু সময় লাগবে সেই সময়টুকু কাটাতে ঢুকে গেলাম একটা বইয়ের দোকানে। সেন্ট্রাল স্টেশনের ঠিক পাশেই একটা দোকান আছে, গোডাউন টাইপের। মোটামোটি সস্তায় বই ছেড়ে দেয়। কিন্তু বইয়ের কোন আগা মাথা থাকে না। কখনও কখনও খুব ভালো বই থাকে, কখনও সব অখাদ্য। বইগুলো কোন নিয়মানুযায়ী সাজানো থাকে না, যে যা খুঁজে পায় তা-ই। আজকে ভাগ্য পরীক্ষায় চলে গেলাম ক্ল্যাসিক সেকশনে। বইয়ের স্তুপ থেকে উঁকি দিচ্ছিল 'গ্রেইট এক্সপেকটেশন', 'নর্থ এন্ড সাউথ' এর পরে পেলাম 'দ্যা আউটসাইডার', 'হানড্রেট ইয়ার অফ সলিচ্যুড'... ঝটপট হাতে তুলে নিলাম। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম 'আল কেমিস্ট' নাকি লিস্টে আছে, একটা একটা করে বই তুলে খোঁজা শুরু করলাম... আলকেমিস্টআলকেমিস্টআলকেমিস্টআলকেমিস্টরোকেয়া শাখওয়াত.... রোকেয়া শাখওয়াত!!!!
রোকেয়া শাখওয়াত হোসাইনের 'সুলতানার স্বপ্ন' আর 'পদ্মরাগ' এর ছয় ডলার দামের ছোট্ট একটা ভল্যিউম, হাজার বইয়ের চিপায়। আশে পাশে পাতি পাতি করে খুঁজেও আর একটা কপিও পেলাম না। বুকে চেপে ধরলাম ওই একখানা কপিই! শত বছর আগে বইটা লেখার সময় রোকেয়া নামের বাঙালী মেয়েটা কি ঘুনাক্ষরেও ভেবেছিলো, শত বছর পরে, সেই বাংলাদেশের এক চিপা থেকে বইটা চলে আসবে সেন্ট্রাল স্টেশনের পাশের এক বইয়ের ডিপোয়... আর হাজার মাইল দূরের মলিন বইটাকে ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উদ্ধার করবে আরেকজন বাঙালী মেয়ে!!! এই বই কেনার লোভ সামলাবো? আমি কি পাগল!
ইমু আসতে আসতে আমি ফতুর!
মিস ফেরী, ফেরী মিস!
বিশ মিনিট পরে ফেরী। বিশ মিনিট! অ-নে-ক সময়। আমরা ফেরি ঘাটের পাশে দাঁড়িয়েই গল্পে লেগে গেলাম। বেগম রোকেয়াকে নিয়ে গল্প, লর্ড অফ দ্যা রিঙস নিয়ে গল্প, ডিকেন্স নিয়ে গল্প। ঠিক বিশ মিনিটের মাথায় ফেরীর কাছে গিয়ে দেখি ফেরী ঘাট খালি। একটা ফেরী মিনিট তিনেক আগে রওয়ানা দিয়েছে, তীর থেকে কয়েক মিটার দূরে। কি ঘটনা? মহামান্যা ইমু দাবী করছিলেন তাহার ঘড়ি কয়েক মিনিট ফাস্ট। আসলে, ঘড়িখানা কয়েক মিনিট স্লো!
পরের ফেরী আরও আধা ঘন্টা পরে!
আকাশে নোনা গন্ধ
দুপুর বেলা, তাও সপ্তাহের মাঝখানে। ফেরিতে তেমন মানুষ নেই। আমরা ফেরির কোন পাশ থেকে মাথা নিচে দিয়ে ঝুলে থাকলে পানির ঝাপটা বেশি খাওয়া যাবে সেই হিসাব কষতে কষতে ফেরির এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটে বেড়াচ্ছিলাম। ফেরি থেকে উবু হয়ে ঝুলে বাতাসের সাথে দোস্তি করছিলাম। তীব্র বেগে পানি কেটে ছুঁটে চলা ফেরির পিছনে সাদা পানির ফেনার মিছিল।
'ওয়াটসন বে' তে পৌঁছতেই মনে হয় কোন ইংরেজি মুভ্যি সেটে চলে এসেছি। বীচে সারি করে দাঁড় করানো মাছ ধরার পাল তোলা সাদা নৌকা।
আর অনেক অনেক গাংচিল। পাখা ছড়িয়ে অদ্ভূত সাবলীলতা নিয়ে উড়তে থাকা গাংচিলগুলো। কি ধীর স্থিরে আরাম করে উড়ে, একটুও তাড়াহুড়া নেই, যেন শাড়ির আঁচল বিছিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে। ছবিতে কেন যে ধরতে পারি না! ছবি তুলতে গেলেই গাঙচিলগুলো ধুপ ধাপ বসে যায়! গম্ভীর মুখ করে এদিক ওদিক তাকায়! ইমুকে বললাম, দৌঁড়ানি দাও না একটু! দৌঁড়ানি দিয়েও ওদের বেশি দূর উড়ানো যায় না। মানুষ ভয় পায় না! হঠাৎই কি হলো, ঝাঁকে ঝাঁকে গাঙচিল আমার মাথার খুব কাছ দিয়ে উড়ে সাগরের কাছে গেল। আমি এতটাই অভিভূত হয়েছি যে ক্যামারার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম!
অনেক অধ্যাবস্যায়ের পর উড়ন্ত গাঙচিলের অল্প কিছু ছবি তোলা গেল!
মাইনকা চিপা
দি গ্যাপ ওরফে মাইনকা চিপা, সাগরের একদম পাশে খাড়া হয়ে উঠেছে অনেক উঁচু পাহাড়। শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য জায়গা, কিন্তু জায়গাটা সাগরে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যার ভেন্যু হিসেবে রীতিমত বিখ্যাত! প্রথম বার যাওয়া নিয়ে পোস্ট করেছিলাম অনেক আগে। তারপরে এ-ই আবার যাওয়া। পাহাড়ের একদম চূড়ায় উঠে দুই মানুষ সমান বড় পাথরটার উপর বসে গেলাম। পাথরে উঠার সময় আশে পাশে কেউ ছিল না ভাগ্যিশ! বহুত কসরত করে উঠতে হয়েছিল!
সেখানে পাহাড় ছিল, বনও ছিল
পাহাড়ে উঠলাম এক পথে, ভাবলাম, নামব অন্য পথে। একটু পথ ঘুরে অন্য পাশটায় যেতেই ঢেউ ভাঙার কানে তালা লাগানো শব্দ হঠাৎই উধাও। বিশাল বটগাছ, লতানো গুল্মের ঝোপ, ফুল, প্রজাপতি, বৃষ্টি ভেজা স্যাঁত স্যাঁতে বিশাল বিশাল পাথর আর ছায়াময় এঁকে বেঁকে চলা পথ, সব মিলিয়ে রীতিমত শ্যামল, নির্জন বন। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ভীষণ রঙিন পাখিরা অদ্ভূত মিষ্টি গানও গাচ্ছিল। সাগর, পাহাড় আর বন, স-অ-ব এক সাথে! একদম মানুষ নেই। পুরা ইউটোপিক অবস্থা!
সী সাইড ক্যাফে
পরীক্ষার সময় ছাড়া আমি কফি খাই না। কিন্তু কিছু কিছু ক্যাফে দেখলেই আমার খুব কফি খেতে ইচ্ছা করে। কফি খাওয়ার তৃষ্ণা থেকে কফি খাওয়ার শখ না, ক্যাফেগুলোর ভাবসাবই আলাদা থাকে, সেজন্য। ওয়াটসন বে'র ক্যাফেটা অর্ধেক সমুদ্র সৈকতে, আর বাকি অর্ধেক সাগরের উপর, কাঠের সাঁকোর উপর ঝুলন্ত। ভিতরের সাজগোজ দেখলেই মন আনচান করে উঠে, জাহাজে চড়ে মাঝ সাগরে দু:সাহসিক অভিযানে চলে যেতে ইচ্ছা করে। সব মিলিয়ে খুব রোমান্টিক অবস্থা! কফি অর্ডার দিয়ে একদম জানালার ধার বেছে একটা টেবিলে বসে পড়লাম।
জানালা দিয়ে তাকালেই হলুদ বালু, স্বচ্ছ সবুজাভ পানি, গাঙচিল... আর টুরিস্ট! টুরিস্টদের দেখা খুব মজার! বিশেষত নানা ভঙ্গিমায় যেভাবে ছবি তুলে... ব্যাপক! যেমন চাইনীজ টুরিস্টরা ছবি তোলার সময় অবধারিত ভাবে দুই আঙ্গুল ছড়িয়ে 'ভি' বানিয়ে পাশের জনের মাথার পিছনে দিয়ে রাখবে! ওয়াটসন বে'তে তখন এক টুরিস্ট সাগরের পানিতে দাঁড়িয়ে খুব মনযোগ দিয়ে নিজের পায়ের পাতার ছবি তুলছিল!
তারপর, বাড়ি ফেরা
এবার ফেরি ঘাটে ফেরি থামার সাথে সাথে দৌঁড়ে ফেরিতে উঠলাম। এবার মিস করলে চলবে না! তারপর আবারও গতিময় পানি দেখতে দেখতে উল্টো চলা। পানির নানা রঙ, নানা গতি। পানি, বড় প্রানময় পানি, যেন হারবারের সীমানা দিয়ে বেঁধে রাখায় ক্রোধে ফুঁসছে, ছুটে যেতে ছটফট করছে। ফেরি-যাত্রীদের ছুঁতে আসা চঞ্চলা পানির নোনতা বার্তা নাকে, ঠোঁটে, চোখের পাতায় মেখে তবেই নামলাম ফেরি থেকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

