somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেঁচে রইবো, দহনের নেশায়...

১৯ শে নভেম্বর, ২০০৬ ভোর ৪:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত কিছুদিন ধরে বিকেলে দাদী এসে ঘুম ভাঙ্গাচ্ছে; কিযে উৎপাত...? কলেজ ছুটির পর রাজ্যের ঘুম দুচোখে বাসা বাঁধে। ব্যাগটা শূন্যে আর গায়ের শার্ট আলনায় ছুঁড়ে যেই বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেই অমনি ঘুম আর ঘুম। পৃথিবীর আর কোনো কিছুর অস্তিত্বের কথা মনে থাকেনা তখন। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতে একটাই বাক্য ইদানিং শুনতে হচ্ছে- "অবেলায় ঘুমাস কেন? ওঠ ভাত খাবি"। খুব কষ্ট করে শুনা লাগে। কাঁচা ঘুম থেকে জেগে প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় আসে সেটা হলো- "এই বিষন্ন বিকেলে যন্ত্রণাটা ছাদে এলো কেমনে? তাও ভাত খেতে ডাকছে! কি আশ্চায্য..." আমি ঢুলুঢুলু রক্তিম চোখটা মেলে কোনমতে বলি, "যান আসছি দশ মিনিট পর"। "না এখনি ওঠ" বলে তিনি তড়িগড়ি করে ফ্যান আর পিসি'র সুইচ বন্ধ করে দেন। কাজটি করে তিনি যে মহা খুশি সেটা গম্ভির চেহারা দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টাও করেন। কিন্তু চোখ সত্যি কথা বলে। আমাকে উঠতেই হয়। তারপর নিজে নিজে সবকিছু বেড়ে দেন। পাতে তরকারি দেন, গ্লাসে পানি ঢেলে দেন। বুড়ি ইদানিং খুব যত্ন নিচ্ছে আমার! মরার সময় এসেছে বোধহয়! শুনেছি মরার সময় আসলে মানুষ নাকি ভালো হয়ে যায়! চাকরী ছেড়ে দিয়েছি, সেটা বলেছি। তিনি চেহারার এখানে-সেখানে আঁকা-বাঁকা দাগ ফেলে, চোখ দুটো ছোট ছোট করে বলেন- "রুম ভাড়া আর টেলিফোন বিল দিবি কেমনে?" আমার হঠাৎ তার সাথে মজা করতে খুব খুব খুব ইচ্ছে করে। বহুদিন তার সাথে খোলামেলা আলাপ করিনি। সব সময় তাকে এড়িয়ে থেকেছি। আজ বোধহয় তাকে কিছুটা আপন মনে হলো; খাওয়া থামিয়ে বলি- "দিতে পারবো বলেতো মনে হচ্ছেনা... বলেন কিভাবে আপনাকে দেই, চাকরীতো নাই? কলেজের সেমিষ্টার ফি'টাও বাকী...। তবে আপনি সব মিলিয়ে যদি 1200 টাকা নেন তবে দিতে পারি।" তিনি হেঁটে উল্টো দিকে গেলেন। বললেন, "দেখ আমাকে ঠকাস না... আমাকেওতো চলতে হয়...।"

অকারনে আমার মাথায় হঠাৎ রাগ চড়ে যায়। ইদানিং আমার এ সমস্যাটা হচ্ছে, বাসে, রাস্তা-ঘাটে, এখানে-সেখানে আমার অকারনে মানুষকে ঝার দিতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে কাউকে বেদম পিটিয়ে নিজেও বেদম পিটুনি খাই। তবেই হয়তো আমার কিছুটা ভালো লাগবে। কোনোমতে নিজেকে সামলে বলি, "আমার টাকায় আপনি চলেন নাকি? আরো অনেকেইতো এই বাড়ীতে থাকে তাদের কাছ থেকে নেন না কেন?" তিনি শুনে কপালে ভাঁজ ফেলেন। কিছুক্ষন চুপ থেকে অবশেষে মুখ খোলেন, যেন সাংঘাতিক গুরুগম্ভির কোন কথা বলবেন এমন ভাব নিয়ে বলেন- "দেখ আমাকে ঠকাস না; আমি বুড়ো মানুষ... আমাকেওতো চলতে হবে...।"

পড়ন্ত বিকেলের শেষে আবিদকে কাছে পেলাম। এটাকেও এতদিন মিস করেছি। অনেক বদলে গেলেও আমাকে দেখে তার চোখ পিটপিট করা অদ্ভুতুড়ে সেই রোমাঞ্চকর দৃষ্টি নিক্ষেপ সে ভোলেনি। এক দৌড়ে এসে কোলে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। অনেক পেকে গেছে। অথচ এইতো সেইদিনইতো ছিল এটুকুন পিচকি! আজ কত সুন্দর করে হাঁটছে, দৌড়োচ্ছে, পাকনা পাকনা কথা বলছে। অবাক লাগে।

'ভাইয়্যা আমি অনেক বড় হব, তোমার মত'
'তাই নাকিরে?'
'হুম' তারপর সেই অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে চোখ পিটপিট করে চেয়ে থাকা।
'ওরে পাকনু তোকে বড় হতে কে বলেছে?'
'কেউ বলেনি; আমি বলো হব, তোমার মত'
'বড় হওয়া ভালো না।'
'কেনো ভালোনা?'
'বড়তে অনেক কষ্ট'
'কষ্ট কি ভাইয়্যা?'
'কষ্ট হচ্ছে- দুঃখ। তুই পড়ে গেলে দুঃখ পাসনা, অমন দুঃখ, তবে সেটা দেখা যায়না'
'কেন দেখা যায়না'
'দেখানো নিষেধ তাই'
'নিষেধ কেন?'
'বেশি প্রশ্ন করতে নেই'

ও চুপ হয়ে যায়। ঘাড়ে মাথা রেখে আমাকে জড়িয়ে রয়েছে চুপটি করে। আমি হেঁটে চলি ছাদের এপাশ থেকে ওপাশ। আমার জীবনের এক পাশে আঁধার, অন্যপাশেও ঠিক তাই। মাঝখানের অথই নিকোশ নোনা পথ ধরে ধীর পাঁয়ে হেঁটে চলেছি। গন্তব্যগুলোয় অনেক...অ-নে-ক ব্যারিকেড। আমাকে থামতে হয়, প্রমাণ দিতে হয় কে আমি? তারপর আবার কিছুটা অনুপথ, পাহাড়সম বাঁধা। আমার পথচলাটা বড় একঘেয়ে, কখনো কখনো অন্যের প্রতি নির্ভরশীল, পরজীবির মত। কখনো কখনো ছন্নছাড়া। আত্মহননের কথা কতবার ভেবেছি... কতবার...! কাপুরুষ হয়তো। বেঁচে আছি। বেঁচে আছি অনেকের ভালোবাসা ফেরত দেবার আশায়। বেঁচে আছি কিছু কল্পনাতীত প্রাপ্তির আশায়। বেঁচে আছি। কাপুরুষ... তাই বেঁচে আছি। বেঁচে রইবো। বেঁচে রইবো, নিজেকে দহনের নেশায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ দুপুর ২:০২
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজব পোশাক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৬


এক দেশে ছিল একজন রাজা। রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। সিপাহী-সামন্ত লোকলস্করে রাজপুরী গমগম। রাজার ধন-দৌলতের শেষ নেই। রাজা ছিল সৌখিন আর খামখেয়ালি। খুব জাঁকজমক পোশাক-পরিচ্ছদ পরা তার শখ। নিত্যনতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাচনী অঙ্গীকার চাই ফুটপাথ ফেরাও মানুষের কাছে

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬


ভোটের মিছিলে কথা হয় অনেক
পোস্টারে ভরা উন্নয়নের ঢাক
কিন্তু বলো তো ক্ষমতাপ্রার্থী দল
ফুটপাথ কার এ প্রশ্নের কি জবাব?

ঢাকা ছোটে না, ঢাকা পায়ে হেটে ঠেলে চলে
শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পড়ে কষ্টের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×