somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাঙালিরা একাকী ভীতু আর অনেকে খুবই ভয়ঙ্কর

১২ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ১০:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কয়েক দিন থেকেই ঘটনাটা নিয়ে মনে খচ খচ করছে। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছি না। যদিও এ ধরনের ঘটনা এখানে হরহামেশাই ঘটছে। তারপরও নিজের সামনেই যখন এসব ঘটনা ঘটে তখন তার রেশ আমার মনে অনেক দিন ধরেই থেকে যায়।

কয়েকদিন আগের ঘটনা। অফিস শেষ করে বের হতে হতে রাত সাড়ে ১১টা বেজে গেছে। থাকি শনির আখড়া। রাত হলে বাসায় ফিরতে বিরাট ঝক্কি। কপাল ভালো হলে দুই বার বাস চেঞ্জ না হয় তিনবার। সেদিন বাস আগেই পেয়ে গেলাম। প্রথম দফা মতিঝিল। পরের দফাতেও ভাগ্য সুপ্রসন্ন। অর্থাৎ বাস পেতে দেরি হয়নি। তবে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত। পথে জ্যাম পার হয়ে যাত্রাবাড়ী পৌঁছতে পৌঁছতে রাত সাড়ে ১২টা।

এবারও কপাল ভাল। শনির আখড়া-রায়ের বাগ সিটিং ৫ টাকায় উঠে গেলাম। সামনেই সিট পেলাম। এতক্ষণ পর্যন্ত ভালয় ভালয় এগুচ্ছিল। কাজলা পার হতেই বিপত্তিটা ঘটলো।

বাস চালক গাড়িটির সামান্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিকট শব্দে রাস্তার মিড লাইনারে লাগিয়ে দিল। যাক বাস বা যাত্রীদের ক্ষতি কারো হয়নি। আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করলাম।

কিন্তু কারো কোন ক্ষতি না হলেও বাসের সব যাত্রীরা গেল ব্যাপক চোটে। অবস্থা বেগতিক। পেছনের তিন/চার জন তেড়ে আসলো চালককে পেটাতে। তাদের দেখে সামনের কয়েকজনও এগুলো।

সবাই মিলেই চিৎকার করে বলছে--

‘হালারে ইচ্ছা মতো সাইজ করেন’
‘.....পোলা, গাঞ্জা খাইয়া গাড়ি চালাও’
‘কান পট্টিটে একটা থাপ্পর....ওমুকের পোলা তুমুকের পোলা এইরকম নানান কিসিমের চিৎকার।

এরই মধ্যে একজন এসে শুরু করে দিল কয়েক ঘাঁ...তার সঙ্গে আরো কয়েকজন...আরো একজন...অনেকেই মারতে এলো।

যেন অনেক আনন্দের একটা কাজ পাওয়া গেল। সাগ্রহে, আনন্দে, উৎসাহ-উদ্দীপনায় আশা জাগানিয়া কোন মহৎ কাজ! সবাই পেটাতে চাচ্ছে।

‘ওরে ভাই আমারে মাইরেন না’ –চালকের আত্মচিৎকার।

ও আরো বললো ‘ভাই আপনাগো লগে কথা কমু, আগে গাড়িটা সাইড কইরা লই’

না গাড়ি সাইড করা যাবে না। আগে মারতে হবে। এমনই ভাবনা যাত্রীদের। এই মাইরের সুযোগ যাতে মিস না হয়।

একজন বলে উঠলো ‘হা...জাদা, আবার কথা কছ। সবাইরে মাইরা ফালাইতাছিলি। আবার কথা কছ। হালারে পিটা’

সবাই মিলে একজনকে পেটাতে যাচ্ছে এটা দেখেই মনটা কেমন যেন হয়ে গেল।

আমিও উঠে দাড়ালাম। চালককে আড়াল করে যাত্রীদের মুখোমুখি হলাম। আরো জোর গলায় বলে উঠলাম-

‘ভাই একটা অপরাধের জন্য সবাই মিলে একজনকে মারতে পারেন না’

‘এটা অন্যায়, অনেক বড় অন্যায়’

কে শোনে আমার কথা। আমার ওপর দিয়েই পেটাতে শুরু করলো।

একদিকে কারো কিল আটকাই তো অন্যদিক দিয়ে কারো লাথি। আমিও পেরে উঠছিলাম না।

অসহায় চালকের সরব কান্না, নাক-মুখ দিয়ে রক্তের ঝিলিক...কোন কিছুতেই তাদের মন গলছেনা।

কী ভয়ঙ্কর ভাবে পেটানো হচ্ছে আমার ওপর দিয়েই। চালকের স্বরও ক্ষীণ হয়ে আসছে।

‘ভাই আমারে মাইরেন না’ ভাই আমারে মাইরেন না...আল্লাহর দোহাই লাগে’

তার রক্তমাথা মুখ দেখে চোখ সিক্ত হয়ে উঠেছে। মাথায় আসছেনা-কী করে একটা অসহায় মানুষকে পেটাচ্ছে অন্য সব ভদ্র (!) মানুষেরা।

এমন সময় আমাকে ফেলে দিল একজন। তার ওপর দিয়েই চালককে পেটাতে লাগলো। আমি উঠে দাড়ালাম। লোকটিকে দেখার চেষ্টা করলাম।

হায়, একি দেখলাম। এযে মধ্যবয়স্ক খুবই ভদ্রলোক মার্কা ভদ্রলোক। এমন ভদ্রলোক মার্কা লোক যে, একজন অসহায় মানুষকে পেটাতে পারে তা ভেবে উঠতে পারছিনা।

কার কথা ঠিক মনে পড়ছেনা। কোথায় যেন পড়েছিলাম। অনেক আগে বাংলাভাষীদের নিয়ে কে যেন বলেছিলেন-

বাঙালিরা একাকী ভীতু আর অনেকে খুবই ভয়ঙ্কর।

এ উক্তিরই যেন সঠিক চিত্রায়ন দেখতে পাচ্ছি এখন।

এবার আরো জোর নিয়ে উঠে দাড়ালাম। কিছু একটা করতেই হবে। আমার সঙ্গে কেউ না আসুক। একা হলেও এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো।

সবাইকে আটকানোর চেষ্টা করছি। আমি যখন সবার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছি এরই মধ্যে চালকটিও সুযোগ বুঝে বাস থেকে নেমে যেতে সক্ষম হলো। ভাবলাম ‘যাক বাচা গেল।’

কিন্তু না, সে ভাবনা ছিল কয়েক মুহূর্তের। যাত্রীদের ক্ষোভ তখনো মেটেনি। চালক পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগে এখন সবাই মিলে আমার ওপর চড়াও হলো।

আমিও বলতে থাকলাম---

সবাই মিলে একজন মানুষকে কখনই এভাবে মারতে পারেন না।
এটা অন্যায়। মানুষ কখনো মানুষকে এভাবে মারতে পারে না।

একজন বলে উঠলো

‘তাইলে ভাই চুমা দিম নাকি? ওই হা...জাদা যে আমাগো সবাইরে মাইরা ফালাইতেছিল, হেইটার কি হইবো।

‘এরজন্য সামনেই থানা আছে, ডাকলেই পুলিশ আসবে। এসবের বিচারের দায়িত্ব তো আমাদের না’ বললাম আমি।

ভদ্রলোকরা কথা বলছে আরো কড়া ভাষায়। একের পর এক প্রশ্ন।

আমিও ছাড়ার পাত্র নই। আমিও বলে যাচ্ছি আমার কথা। এসব ভদ্র(!)লোকদের অন্যায়ের কথা।
কে শোনে এসব কথা।

অনেক তর্কাতর্কি হলো। আমি তাদের কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না যে, সবাই মিলে একজনকে পেটানো কতটা অন্যায়।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। বাসার পথ এখনো অনেক বাকি। রাত বাড়ছে। হাঁটা শুরু করলাম।

গাড়ি ভাইঙ্গা ফালান, আগুন লাগাইয়া দেন এমন কথা তখনও শোনা যাচ্ছে। আমার আবার বাসায় ফিরতে হবে।

বাসায় ফিরে যাচ্ছি। চোখের সামনে ভেসে উঠছে চালকের রক্তমাখা মুখ। চোখ সিক্ত হয়ে আসছে। আমি লোকটার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। লোকটার ভয়ানক হয়ে যাওয়া রক্তমাখা মুখটা বার বার ভেসে উঠছে।

তার যদি অন্যায় হয়েই থাকে তবে তারজন্য এ আচরণ তো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

প্রায়ই শুনি গণপিটুনিতে অমুক জায়গায় এত জন নিহত। তমুক জায়গায় এতজনকে পিটিয়ে মেরেছে জনতা(!)। শুনে মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমরা সভ্য সমাজ বলে পরিচয় দেই। কিন্তু পিটিয়ে মানুষ মারার প্রবণতা কতটা সভ্যতার পরিচয় তা বুঝে আসেনা।

সভ্য হলেও বাঙালি সমন্ধে সেই উক্তিটিই বার বার মনে হয়-
বাঙালিরা একাকী ভীতু আর অনেকে খুবই ভয়ঙ্কর।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×