somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

:::হিমালয় ডায়েরী ৪র্থ পার্ট- স্তোক কাংড়ি::::

১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


স্তোক কাংড়ি, হিমালয়ের লাদাখ রেঞ্জের একটা শ্বেত শুভ্র চুড়া। দৈত্যাকার পর্বত চুড়াটার উচ্চতা বিশ হাজার একশ সাইত্রিশ ফুট বা ৬১৩৫ মিটার। প্রচন্ড ঠান্ডা আর পাতলা বাতাসে অক্সিজেন স্বল্পতাই চুড়াটাতে পা রাখতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু স্তোক উপত্যকার আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ওয়াইল্ড লাইফ আর তিব্বতী সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয় সব। আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করেন ...


রওনা দেবার সময় লেহ'তে করুন আবহাওয়া।
রাতে ডিনার শেষ করে ফেরার সময় গায়ে ক-ফোঁটা বৃষ্টির পানি পড়লে নিজেকে প্রবোধ দিলাম ও কিছু না। ২০ হাজার ফুট উচ্চতায় বৃষ্টি হলে সবকিছু ভেস্তে যাবে। পিটাররা হাতগুটিয়ে বসে আছে বৃষ্টি ফোরকাস্টের জন্যে। ওদের আগের চেষ্টায় বৃষ্টি হলে বেজ ক্যাম্প এলাকা নাকি তুষারে কোমড় পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিল। ব্যাগ গুছানোর সময় পাঞ্চো (রেনকোটের মতো,হ্যাভারস্যাক সহ পুরো শরীর ঢাকা যায়)রাখলাম সবার উপরে। তাঁবু,হিমাঙ্কের নিচে থাকার উপযোগী স্লিপিং ব্যাগ,ইনার, আল্পাইন জ্যাকেট, থার্মাল,আল্পাইন গ্লাভস-ইনার,পর্বাতরহনের উপযোগী টুপী, অনেকগুলো গরম গেঞ্জি, পুলওভার,ট্রেকিং বুট, আইসবুট,আইসএক্স, ক্রাম্পন, আগামী কয়েকদিনের খাবার, আর দুনিয়ার টুকিটাকি জিনিস। হ্যাভারস্যাকটা কাঁধে নিয়ে দেখলাম ওজন ভালোই। তবে ট্রেকিং পয়েন্ট থেকে মাল টানার জন্যে ঘোড়া ভাড়া পাওয়া যায়, বেজক্যাম্প পর্যন্ত ঘোড়ায় করে মাল নেয় সবাই।
ইচ্ছে ছিল সকাল সকাল রওনা দেব স্তোক গ্রামের দিকে। ৯টা ১০টার মধ্যে শুরু করলেও আরাম করে ৪টা নাগাদ প্রথম ক্যাম্পের জায়গা মানেকারমো’তে পৌছুবো ।ক্যাম্প বানিয়েও আড়াই তিনঘন্টা সময় পাবো হাইট গেইনের জন্যে। হাইট গেইনের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা উচিত। আমরা জানি যতোই উপরের দিকে যাওয়া যায় বাতাসের চাপ আর তাতে অক্সিজেনের পরিমান কমতে থাকে। ১০ হাজার ফুটের উপরে গেলে বলে হাই অল্টিচিউড, ১৫ হাজার ফুটের উপরে গেলে ভেরি হাই অল্টিচুড আর ২০ হাজার ফুট থেকে ২৯ হাজার ফুট পর্যন্ত এক্সট্রিম হাই অল্টিচুড। এই উচ্চতা অতিক্রম করলে শরীর অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে,প্রয়োজনীয় ফ্লুইড লিক করতে থাকে। ঘুমানোর সময় মানুষের হার্ট বিট কমে যায়,হৃদপিন্ড সবচেয়ে কম পরিমান কাজ করে সামান্য অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়। তাই মাউন্টেনিয়াররা উচু পর্বতে ক্যাম্প করতে চাইলে ঐ জায়গার চেয়েও উচু জায়গায় উঠে শরীরকে মানিয়ে নেয় ক্যাম্পের উচ্চতার জন্যে। এটাই হাইট গেইন করা, যাকে বলে ক্লাইম্ব হাই আর স্লিপ লো। অনেকগুলো ক্যাম্প করতে হলে বা এক্সট্রিম উচ্চতায় বেশীদিন কাটাতে হলে হাই গ্রাউন্ডে কয়েকদিন কাটিয়ে লোয়ার ক্যাম্পে নেমে আসে। এদিকে গাইড থুবস্থানের দেখা নেই।


লেহ’তে বিরল বৃষ্টি নামছে হিমালয়ের বুকে।


স্তোক গ্রামের ট্রেকিং পয়েন্ট। এখান থেকে অভিযানের শুরু।


স্তোক গ্রামের বর্ধিতাংশ। হোটেল মাউন্ট এভারেস্ট!
গতকালকেই রিনচেন গাইড থুবস্থান দাওয়ার সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছে। মহা গম্ভীর ফ্যাশন সচেতন তরুন, ভালো ইংরেজী বলতে পারে।রাতে তার সাথে টিম মিটিং করে পুরো প্ল্যান ফাইনাল করে নিয়েছি।
বেশ দেরীতে থুবস্থানকে নিয়ে রিনচেন হাজির। রিনচেন শুভেচ্ছা হিসাবে এক ঝুরি আপেল দিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য স্তোক গ্রাম।তিব্বতের রাজা রাজ্য হারিয়ে এখানে নির্বাসিত হয়ে প্রাসাদ গড়েন, এছাড়া কয়েকটা পিক আর কয়েকটা ট্রেকিং রুটও এখানে, তাছাড়া অনেক বড় বসতি। মুড়ীর টিন মার্কা বাস যায়, টাইম টেবলের কোন ঠিক নাই। যাত্রী সেবা আর ডাকাডাকিতে ফার্মগেটের লোকাল বাস কন্ডাক্টরদের সাথেও পাল্লা দিতে পারে। লেহের এদিকে ট্যুরিস্টদের ভীর নেই, একটু পর পর ইন্দো তিবেটিয়ান পুলিশের চেকপোষ্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা। বিশাল বিশাল বৌদ্ধমূর্তী, বৈদ্যতিক জায়ান্ট জপযন্ত্র আর লামাদের দেখে বুঝলাম আশে পাশে কোথাও গুম্ফা আছে। তীব্র গর্জন তুলে ছুটে চলা সিন্ধু পার হলাম একটা ঝুলন্ত ব্রীজে করে। দুধারে জনশুন্য মরুপ্রান্তর।দুঃশ্চিন্তার মতো আকাশ জোড়া মেঘ অশুভ আলো ফেলেছে। একটু পরে স্তোক উপত্যকায় রাজপ্রাসাদটা চোখে পড়লো। দারুন সুন্দর, গায়ে ড্রাগন আর নানা মীথিক্যাল প্রাণীর ছবি আঁকা। প্রাসাদের উপরে বৈসাদৃশ্য এন্টিনা দেখিয়ে থুবস্থান জানালো ওটা বর্তমানে ভারত সরকার রেডিও টিভির রিলে স্টেশন হিসাবে ব্যাবহার করে। মরুর বুকে সবুজ গাছের প্রাচুর্য ভরা সুন্দর ছিমছাম স্তোক গ্রামে নামলাম। চারপাশে শান্ত তিব্বতী গ্রাম, মেঠোপথের দুধারে অনেক ইয়াক, জো (চমড়ি গাই আর গরুর শঙ্কর), গাধা, ঘোড়া দেখলাম। ট্রেকারদের টিম এদের কাছ থেকে গাধা/ঘোড়া ভাড়া নেয়। অনেক চেষ্টা করেও কিছু যোগার করতে পারলাম না। আমাদের মালপত্র একটা ঘোড়ায় নেবার সমান, কিন্তু ওরা ৫/৬টা করে ঘোড়া ভাড়া দেয় একবারে, দলের কাছে। সবগুলো ঘোড়া মাল টেনে নেবে বেজ ক্যাম্প পর্যন্ত একটা এক্সট্রা থাকবে যেটা অন্য ঘোড়াগুলোর খাবার বইবে। ২০০৪ সালে রিফাত হাসান আর মুনতাসির ইমরান স্তোক অভিযান চালায়, রিফাত ভাই সামিট করার পরে আরো কয়েকটা বাংলাদেশী দল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।মুনতাসির ভাইএর সাথে আসার আগে আলাপ হয়েছিল,তারা বেজক্যাম্প পর্যন্ত দুটো ঘোড়া নিয়েছিল। বারবার বলেছিল ঘোড়া কিংবা শেরপা ছাড়া যেন না উঠি। থুবস্থান ফোনে ব্যাস্ত হয়ে গেল ক্লাইম্বিং শেরপার খোঁজে। আমি কাগজপত্র নিয়ে এগুলাম ট্রেকিং পয়েন্টে। একটা খোলা প্রান্তরে কংক্রিটের ছোট্ট ঘর ট্রেকিং পয়েন্ট,পাশেই উপরের গ্লেসিয়ার গলে নেমে আসা একটা পাথুরে ঝিরি। অন্যদিকে পাহাড়ী একটা বন্য নদীর উপরে একটা লোহার ব্রীজ। এখন আস্ত থাকলেও ফি বছর পাহাড়ী ঢল ভাসিয়ে নেয় বলে এটাকে বলে ওয়াশ আউট ব্রীজ।ট্রেকিং পয়েন্টে এক তিব্বতী মহিলা নুডলস,শুকনো খাবার বিক্রি করে, সেই পারমিটের কাগজ চেক করে।তুমুল বৃষ্টিতে ছাউনির নিচে বসতেই থুবস্থান সাথে করে আনলো ক্লাইম্বিং শেরপাকে। অভিজ্ঞতায় টইটুম্বুর হাসিখুশী একলোক নাম স্তেনজিং নুরবা। যদিও শেরপা একটা উপজাতির নাম। শেরপা,দর্জি,তামাং সবাই পাহাড়ে মালপত্রবহনে কাজ করে, কিন্তু ভুলব্যাবহারের ফলে শেরপা একটা পেশার নামে দাড়িয়েছে।


ইয়াকের রাখাল


হাসি মুখ দেখে পথ চলার শুরু।
৩ দিকে বৃষ্টি থামলে আমরা ঝিরির পাশের পথ বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। বেরিয়েই স্তোক গ্রামের বর্ধিত অংশ। এখানে থাকার জন্যে কয়েকটা চৌকি বসানো হোটেলও আছে।ঝিরির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে ঘোরানো প্রকান্ড জপযন্ত্র চোখে পড়লো। সাধারন জপযন্ত্র ছোট্ট হাতেই ঘুড়ানো যায়।গায়ে ঈশ্বরের নাম লেখা থাকে যতোবার ঘুরে ততোপূণ্য হয়।দানবীয় জপযন্ত্রগুলো ঐশ্বর্যের প্রতীক।পানির টানেই হোক আর ইলেক্ট্রিসিটিতেই ঘুরুক সব পূণ্য জমা হবে যে টাকা দিয়েছে তার একাউন্টে।শেষ কটা শেপার্ড হাউজ পেরিয়ে হিমালয়ের বুকে নির্জনে ঢুকে গেলাম আমরা। আর সাথে সাথে নামলো বৃষ্টি। প্রচন্ড ঠান্ডা পানি যেন চামড়ায় হুল ফোটাচ্ছে।ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পাথরের আড়ালে ঢুকলাম কোনমতে। বৃষ্টি থামলে দেখি শুষ্ক ন্যাড়া পাহাড়ের উপর থেকে একপাল হরীন নেমে এসেছে ঝিরির পাশে জন্মানো সামান্য কিছু ঘাস খেতে। ছবি নিতে খুব কাছে গেলেও পাত্তাই দিলনা।পথে একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়লো- এখানে স্নো-লেপার্ড পাওয়া যায়।১০০ বছর আগেও বিজ্ঞানীরা স্নোলেপার্ডের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। ছোট বেলায় ডঃআব্দুল্লাহ আল-মূতীর লেখা বইতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির দুর্ধর্ষ ফটোগ্রাফারদের তুষার চিতার ছবি তোলার এডভেঞ্চার গল্প পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম।


লোকালয় থেকে বেরুতে না বেরুতেই স্বাগত জানালো হরীনের পাল।


অনেক নিচে স্তোক গ্রাম। মেঘের ছায়া পড়া ঐ পাহাড় গুলোতে খারদুংলা (ওয়ার্ল্ডের হাইয়েস্ট রাস্তা) যাবার রাস্তা।
দুধারে আকাশ ছোঁয়া সব শুষ্ক পাহাড়, তার মাঝ দিয়ে পাথুরে ট্রেক একে বেঁকে একটানা উঠে গেছে ঝিরির পাশ দিয়ে, বেশীর ভাগ জায়গাতেই গ্রেডিয়েন্ট কম তবে কয়েকটা জায়গায় খাড়া পাথুরে দেয়ালে হাত পা খিমছে খিমছে বেয়ে উঠা লাগে। ওপাশ থেকে নেমে আসা ২টা দলের দেখা পেলাম, যাদের একটা স্তোক কাংড়ি ক্লাইম্বে গিয়েছিল।শুনলাম উপরে আবহাওয়া খুব খারাপ। অনেক তুষারপাত হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে ফিরে এসেছে। জিজ্ঞেস করলাম সামিট হয়নি, মন খারাপ নাকি? ওরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল। ধুর, মাউন্টেনিয়ারিং ইজ অল এবাউট ফান। সামিট হয়নি কিন্তু অনেক এডভেঞ্চার হয়েছে।ওদেরকে জুলে (JULAY) বলে বিদায় নিলাম।
তিব্বতীদের বিশ্বাস দুর্গম রাস্তা দিয়ে চললে ঈশ্বর বন্দনা হয়।রাস্তার পাশে হরহামেশাই পাথর দিয়ে স্তুপের মতো বানিয়ে রাখে, সবাই ওগুলোর ডান পাশ দিয়ে যায় আর বর্ণীল প্রেয়ার ফ্ল্যাগগুলো সাজিয়ে দেয়।রাস্তা যতো খারাপ ততো বেশি পূন্য হয়।আমাদের পূণ্যের পরিমান বাড়াতেই রাস্তা যেন দূর্গমতর হয়ে উঠলো।পূণ্যের ভার আরো বাড়াতেই নামলো ঝুম বৃষ্টি, প্রচন্ড ঠান্ডা পানির ফোঁটা।অবস্থা কেরোসিন করতেই যেন রাত নেমে এল। এরকম হাইঅল্টিচিউড মরুভুমীতে রাত্রে ঠান্ডা কি রকম পড়ে সেটা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। বৃষ্টি অবশ্য একটু পড়েই থামলো, কিন্তু ঠান্ডা জাঁকিয়ে বসলো। মাথার হেডল্যাম্পের আলোয় ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে পথ চললাম। থুবস্থান আর স্তেনজিং জানালো এই আবহাওয়ায় রাতের বেলা হেঁটে মানেকারমো পর্যন্ত যাওয়া বিপদজনক। মানেকারমোর আগে চাঙ্কাসপা বলে একটা ভ্যালিতে স্বল্পব্যাবহৃত একটা ক্যাম্প সাইটে আমরা ক্যাম্প১ করতে পারি।চাঙ্কাসপার পরে একটা নদীর উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়, বৃষ্টিতে সেটার কি অবস্থা হয়েছে কে জানে, কিন্তু এই ঠান্ডায় রাতের বেলা ঐ পথ না মারানোই উচিত।


হরীনের পাল।


ছবি তুলতে গেলে ভয় তো পেলই না উলটো পোজ দিতে ব্যাস্ত।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে চাঙ্কাসপাতে পৌছালাম।ভ্যালির একপ্রান্তে পাথর পরিষ্কার করে ক্যাম্প সাইট বানানো। এক লোক এই ভুতের এলাকাতেও একা একা থাকে,গরম চা, নুডলস বিক্রি করে।এখানে তাঁবু ফেলতে চাইলে পার টেন্ট ১০০ রুপি ফি দিতে হয়।টর্চের আলোয় তাঁবু খাটাতে লাগলাম। টেন্ট পিচ করার সহজ কাজেও অনেক সময় লাগলো কারন ঠান্ডায় লেদার গ্লাভস আর ইনার গ্লাভস পরা স্বত্তেও আঙ্গুলগুলো অসার। ভেতরে বাদাম, কাজু, পেস্তা,আখরোট, কিশমিশ আর বিভিন্ন শুকনা খাবারের মিশ্রন,বিস্কুট চা আর চকোলেট বার দিয়ে ডিনার শেষে ফেদার স্লিপিং ব্যাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ঘুমিয়ে গেলাম…হৈ হল্লা শুনে বুঝলাম থুবস্থান আর স্তেনজিং ঢুকেছে ক্যাম্প সাইটের টেন্টে…ওখানে স্থানীয় মদ বিক্রি করে দেখেছি।
-------------------------------------------------------------------------------
খুব ভোরে ঘুম ভাংলো। পায়ে ভারি বুট গলিয়ে বাইরে এসে দেখি কোয়েলের মতো দেখতে ছোট্ট মুরগী আকৃতির একদল পাখি খাবার খুঁজতে তাঁবু পর্যন্ত চলে এসেছে। সূর্য উঠেছে খানিক্ষন, কিন্তু ঠান্ডা তখনো প্রবল।নিভে যাওয়া ক্যাম্প ফায়ারে বসে মনে হলো ঢাকা শহর থেকে কতদুরে হিমালয়ের গহীনপ্রান্তরে একা। কয়েকটা পাখি বিচ্ছিরি ঝগড়া বাধিয়েছিলো পাশেই, দলে কয়েকটা সাদা খঞ্জনা দেখে মনটা আরো বিষন্ন হয়ে গেল।খঞ্জনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব রোমান্টিক কবিতা লিখছিলেন-গাঁয়ের নাম অঞ্জনা, নদীর নাম রঞ্জনা, এর পারে খঞ্জনা পাখি নাচা নাচি করে।নায়িকা আর নায়কের বাড়ি কাছাকাছি,নায়িকার পোষা ছাগল নায়কের ক্ষেতে ঢুকে পড়ে এই টাইপ কি জানি।চড়ুই এর মতো পিচ্চি এই পাখিটাই শীতের শুরুতে হিমালয় থেকে উড়ে যায় ঢাকা শহরে।


পথের ভরসা, থুবস্থান দাওয়া।


হরীণের অনেক ছবি দিয়েছি, এটাই শেষ এবারের মতো।


গ্লেসিয়ার গলে নেমে আসা ছোট্ট স্রোত নিচে নেমে বিশাল হয়ে গেছে, আস্ত লোহার ব্রীজ উপরে নিয়ে যায়।

থুবস্থান আর স্তেনজিংএর ঘুম ভাংলে আমি তাঁবু গুটিয়ে বাঁধা ছাদা শুরু করলাম।দ্রুত পথে নামলাম। ওদের তুলনায় আমি এত স্লথ যে ওরা নাস্তা টাস্তা করে সব বাধা ছাদা করে রওনা দিলেও সহজেই আমাকে ধরে ফেলবে।দূর থেকেই দেখেছি পাথুরে ট্রেইলটা দুভাগ হয়ে গেছে।ডানেরটা লাল পাহাড়গুলোর ভেতরে চলে গেছে আর আমাদের পথ বাঁয়ের ট্রেইল নিচে নেমে ঝিরিটাকে ছুয়ে একদম খাড়া উপরে উঠে গেছে। লালচে দানাদার নুড়ির বড় পাহাড়টার উপরে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ লাগানো স্তুপে হেলান দিয়ে দম নিচ্ছি এসময় স্তেনজিং আর থুবস্থান এসে ধরে ফেললো। এর পরে ধপ করে অনেকখানি নেমে বড় ঝিরি’তে নামলাম। চারদিকে ফুটবলের সাইজ পাথরে ভর্তি। এর উপরে দিয়ে হাটতে সময় লাগে প্রচুর। এসময় মেঘ এসে চারদিক অন্ধকার করে দিল। কিছুক্ষনের মাঝেই নামলো ঝুম বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতেই পথ চলতে লাগলাম। কিছুক্ষন পরে খুব কাছেই কয়েকটা বাজ পড়ায় ভয় পেয়ে ঢুকলাম পাথরের আড়ালে। ওপাশ থেকে নেমে আসা ঘোড়া গাধা সমন্বয়ে বড় বড় কয়েকটা দল নামছিলো। কথা বলে জানলাম উপরে গত ক’দিন ধরে আবহাওয়ার জন্যে কেউই সামিট করতে পারেনি। সময় নষ্ট না করে বৃষ্টি মাথায় করেই পথ চলা শুরু,প্রচন্ড ঠান্ডায় গরম থাকার সহজ উপায় জোরে পা চালানো। ঘন্টাখানেকের মধ্যে মানেকারমো ক্যাম্পে পৌছালাম।


ওয়েলকাম টু মানেকারমো। পাহাড়ী ছাগলের খুলির অর্থ- দুষ্টু প্রেতাত্মারা নট ইনভাইটেড।
বিরাট একটা পাহাড়ী ছাগলের খুলি সাজিয়ে রেখেছে প্রেয়ার ফ্ল্যাগের নিচে। তিব্বতী বিশ্বাস মড়া প্রাণীর খুলি দেখে ভয়ে দুষ্টু আত্মারা দূরে থাকবে। মানেকারমো ক্যাম্প সাইটটা তুলনামুলক অনেক বড়। কিন্তু এখন খালি,আবহাওয়ার জন্যে কয়েকদিনে অনেকেই ফিরে গেছে, নতুন কেউ আসেনি। ক্যাম্পে পা রাখার সাথে সাথেই ম্যাজিকের মতো বৃষ্টি থেমে গিয়ে কড়া রোদ উঠলো। রোদের মধ্যে সব জিনিসপত্র রেখে আমরা মেস টেন্টে ঢুকলাম লাঞ্চ করে নিতে। লাঞ্চ টাঞ্চ শেষ করে আবার পথে নামা। অনেক বেশি উচ্চতায় উঠে এসেছি, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমানও কম এদিকে। একটুতেই হাপিয়ে উঠি। অল্প সময় পর পর থেমে থেমে রেস্ট নিতে হয়। দুর্বল পায়ে ধীর গতিতে উপরে ওঠা। পাশের পাহাড়গুলোর মাথায় থোকায় থোকায় স্নো জমে আছে। বিষ্ময়করভাবে এখানেই সবচেয়ে বেশী ওয়াইল্ড লাইফের দেখা মিললো। হরীনের পাল, নীল গাই, পাহাড়ী ছাগল, মারমুট।যদিও এখানে পাথরে ফাঁকে জন্মানো ঘাস লতাপতার পরিমান নাই বললেই চলে। একটু পর পর মেঘে ঢাকা অশুভ সাদা রঙের একটা বড় চুড়া দেখা যায়, যেন দানবীয় একটা আইসক্রিম ধকধক করে জ্বলছে। দুই পাহাড়ের মাঝে সমতল জায়গাটাই বেজ ক্যাম্প। অবশ্য দুর থেকে কিছুই বোঝা যায়না। ক্রমেই সাদা বরফের টুকরাটা বড় হয়ে সুন্দর একটা গোল গাল তুষারে মোড়ানো চুড়ায় পরিনত হলো। এটাই গোলেপ কাংড়ি। লেহ শহর থেকে স্তোক কাংড়ির ছোট ভাই হিসাবে দূর থেকে যেটাকে দেখে এসেছি।


এটাই হলো মানেকারমো ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড! তাবু ফেলার আদর্শ এলাকা।


মানেকারমো ক্যাম্পের অফিসে গরম চায়ের আড্ডায়।
অবশেষে বেজক্যাম্পের টিলাটার নিচে এসে দাড়ালাম। আর শখানেক ফুট। ইতিমধ্যে ১৭ হাজার ফুটের মত উচ্চতায় উঠে এসেছি।বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেও বোঝা যায়না যে বাতাসে কোন সমস্যা আছে।অক্সিজেনের পরিমান কম জানান দিচ্ছে প্রচন্ড ক্লান্তি।এর মাঝে আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে চারপাশে।স্তেনজিং আর থুবস্থান দুজনকেই আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ক্যাম্প করতে। ধুকতে ধুকতে একা একা উঠছিলাম। অক্সিজেনের অভাবে মানুষের সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়। তাই হয়তো সহজ রাস্তা ছেড়ে খাড়া শর্টকাট রাস্তা ধরে উঠতে গিয়ে আরো বেশী ক্লান্ত হয়ে গেলাম। একটু পর পর থেমে লম্বা শ্বাস নেই। ইজরায়েলি একটা ছেলে এসেছিল বান্ধবী আর অন্য দুই বন্ধুকে নিয়ে। সে হাইট গেইন শেষে ফেরার পথে আমাকে দেখে উলটো এপথে নেমে আসে। প্রায় জোর করে আমার কাঁধে থাকা ব্যাগটা নিজের কাধে চাপিয়ে বললো চল একসাথে গল্প করতে করতে গেলে কষ্ট কম লাগবে। একসময় বেজক্যম্পে এসে পৌছুলাম। চারদিকে অনেকগুলো তাবু পড়েছে।ঘোড়াগুলোর বাধন খুলে দেয়া হয়েছে যাতে চড়ে ফিরতে পারে। থুবস্থান ততোক্ষনে আমাদের দুটো তাবুই লাগিয়ে ফেলেছে। থুবস্থান, স্তেনজিং আর গ্যাব্রিয়েলের সাথে ঢুকলাম মেসটেন্টে ঢুকতেই নামলো তুমুল বর্ষন, বৃষ্টি নয় মার্বেলের সাইজ বরফের টুকরো।গলে যাচ্ছেনা দেখে বুঝলাম বাইরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। কিছুক্ষনের মধ্যেই চারদিক ধবধবে সাদা।গরম বিস্বাদ স্যুপ আর শুকনো খাবারগুলো দিয়ে পেট ভর্তি করে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকলাম ঘুমানোর জন্যে তখন বিকাল পাঁচটা। ঠান্ডাতে গরম স্লিপিং ব্যাগেও দাঁতে দাঁত বাড়ি খাচ্ছিলো। প্রচন্ড ক্লান্তির কারনে ঘুমাতে সময় লাগল না একটুও। ডিনারের সময়ই ঠিক হয়েছে আজ রাত দুটোর দিকে সামিট পুশে বেরুবো। শুনলাম তুলনামুলকভাবে দুপুরের কড়া রোদ ওঠায় আজকেই সবচেয়ে কম ঠান্ডা।রাস্তাও নাকি অনেক পরিষ্কার। যদি সামিট নাও হয় এডভান্স বেজক্যাম্প/গ্লেসিয়ার ফিল্ড পর্যন্ত হাইট গেইন হবে।

----আগামী কল্য সমাপ্য!:P ------


রাস্তার মধ্যেই বসে রেস্ট নেবার সময় কিছু ছবি তোলা হোক।


বেজক্যাম্পের দর্শন মিললো। মেঘে ঢাকা তুষার চুড়াটার (গোলেপ কাংড়ি) নিচে কালো পাথরে অল্প বরফ জমা জায়গাটাই বেজক্যাম্প।


প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় বসে তোলা বেজ ক্যাম্পের ছবি।


মেঘ কেটে গিয়ে রোদ উঠলো। পাথরে জিরাচ্ছে থুবস্থান (লাল জ্যাকেট)।


ব্লু শীপের বাংলা নাম নীল-গাই। যদিও দেখতে ছাগলের মত।


ইয়াক বা চমড়ি গাই। হাই অল্টিচিউডের প্রাণী। ২হাজার মিটারের কম উচ্চতায় আনলে ইয়াক অসুস্থ হয়ে পড়ে। দ্রষ্টব্যঃ আমাদের কেওকারাডংএর উচ্চতা ৯০০ মিটার


কৌতুহলী মারমুট। পর্বতের অনেক উচুতে বাস করে, সাইজে সজারুর সমান।


অবশেষে হাজির হলাম বেজ ক্যাম্পে (উচ্চতা ১৭ হাজার ফুট)।


পাখিটাকে কি চিনা চিনা লাগে? ঠিক ধরছেন এট হচ্ছে কাউয়া (হিমালয়ান ক্রো)।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১:৪৩
১১টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×