somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শের শায়রী
অমরত্বের লোভ কখনো আমাকে পায়না। মানব জীবনের নশ্বরতা নিয়েই আমার সুখ। লিখি নিজের জানার আনন্দে, তাতে কেউ যদি পড়ে সেটা অনেক বড় পাওয়া। কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আর কিছুই নেই।

"দ্যা এ্যাসাসিন" এর গুরু হাসান ইবনে সাবাহ

১৮ ই জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাগদাদের খলিফার প্রভাব তত দিনে কমে অস্তমিত প্রায়। মিশরের কায়রো তখন বাগদাদের অর্থডক্স খলিফার কর্তৃত্বের বাইরে চলে গেছে, সময় একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিক। এই কায়রোয় তখন ইসলামের নতুন এক শাখার বেশ প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নিজেদের ইসমাইলীয় (ইসমাইলীয়দের নিয়ে জানতে আগা খান ও ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়: লিঙ্কে ক্লিক করুন) বলে এরা পরিচয় দিত। এরা অনেকটা নিজস্বধারার ইসলাম প্রচার করছিলো, এই সময়ই ইসমাইলীয় বংশে হাসান ইবনে সাবাহ নামে একজন মানুষের জন্ম হয় যিনি এমন একটা কাল্টের গুরু হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন আমার ধারনা পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত ওই কাল্ট জীবিত থাকবে। এমন না যে সাবাহই প্রথম পৃথিবীতে গুপ্তহত্যা প্রচলন করছিলো, কিন্তু সাবাহর নাম গুপ্ত হত্যার সাথে অমর হয়ে থাকার কারন এটাকে সে সাংগঠনিক রূপ দিয়ে এ্যাসাসিন শব্দের প্রচলন ঘটিয়েছে।

ইসমাইলী কারা?



Map the Fatimid Empire (chronological)

মুলতঃ ফাতেমীয় খিলাফত, ইসালামী খেলাফত গুলোর মাঝে চতুর্থতম। এই খিলাফত ইসমাইলি শিয়া মতবাদকে ধারণ করত। পূর্বে লোহিত সাগর থেকে শুরু করে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় এই খিলাফতের অধীনস্থ ছিল। এটি তিউনিসিয়াকে ভিত্তি করে গড়ে উঠে। এই রাজবংশ আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল শাসন করত এবং মিশরকে খিলাফতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। সর্বোচ্চ সীমায় পৌছার পর ফাতেমীয় খিলাফতের অধীনে মাগরেব, সুদান, সিসিলি, লেভান্ট ও হেজাজ শাসিত হয়। ফাতেমীয়দের দাবি অনুযায়ী তারা মুহাম্মদ (সা) এর কন্যা ফাতিমার বংশধর ছিল। তারা উত্তর আফ্রিকা জয় করে। কুতামা নামক বার্বা‌র গোষ্ঠীর মধ্যে ফাতেমীয় রাষ্ট্র আকার লাভ করে। ৯০৯ সালে ফাতেমীয়রা রাজধানী হিসেবে তিউনিসিয়ার মাহদিয়া নামক শহর গড়ে তোলে। ৯৪৮ সালে আল মনসুরিয়ায় রাজধানী স্থানান্তরিত করা হয়। ৯৬৯ সালে তারা মিশর জয় করে এবং ফাতেমীয় খিলাফতের রাজধানী হিসেবে কায়রো শহর নির্মাণ করা হয়। মিশর পুরো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হয়ে উঠে। রাজবংশ ও শাসকশ্রেণী ছিল শিয়া মতবাদের ইসমাইলি শাখা উদ্ভূত।

প্রাথমিক প্রতিষ্ঠায় বার্বা‌ররা অবদান রাখে এবং একে সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সাহায্য করে। পরবর্তীতে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে ফাতেমীয় খিলাফতের পতন ঘটতে থাকে। ১১৭১ সালে সুলতান সালাহউদ্দিন ফাতেমীয় খিলাফতের সমাপ্তি ঘটান। তিনি আইয়ুবীয় রাজবংশের সূচনা করেন এবং একে বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের সাথে যুক্ত করেন

এবার চলুন দেখি কে এই হাসান ইবনে সাবাহ?


Hassan-i Sabbah

“সারগোজাসত ই সাইয়্যেদেনা” সম্ভবতঃ এটাই হাসানের আত্মজীবনি, সম্ভবতঃ এই কারনে বললাম যে এ নিয়েও ঐতিহাসিকদের মাঝে কিছু দ্বিমত দেখছি। হাসান সাব্বাহ ১০৫০ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের কোম শহরে বারো ইমামে বিশ্বাসী এক শিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবে তার পরিবার ইরানের অন্যতম এক প্রাচীন শহর ‘রে’ তে স্থানান্তরিত হয়। সেখানেই হাসান তার পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে তার প্রাথমিক শিক্ষাদীক্ষা লাভ করেন। রে শহর ছিল ইসমাইলি ধর্মমত প্রচারের অন্যতম কেন্দ্র। ইসমাইলিদের মতবাদ সম্পর্কে হাসান আমির যারাব নামক ইসমাইলি মতবাদ দীক্ষা দানকারীর কাছে জ্ঞানলাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি আবু নাসের সরজ এবং রে শহরের অন্যান্য ইসমাইলি মতবাদ প্রচারকারীর কাছে এ বিষয়ে আরো শিক্ষালাভ করেন।

ফলস্বরূপ তিনি ইসমাইলি মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সতের বছর বয়সে তৎকালীন ইসমাইলি ইমাম ফাতিমিয় খলিফা আল-মুনতাসির এর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। এখানে একটা মজার মিথ আছে, কেউ কেউ বলেন নিজাম উল মুলক (হাসান ইবনে আলী ইবনে ইছহাক তুসী), ওমর খৈয়াম এরা নাকি হাসান ইবনে সাবার সহপাঠী ছিল, যা সম্পূর্ন কাল্পনিক কারন কিন্তু এটা অন্তত নিযাম উল মুলকের ক্ষেত্রে অসম্ভব ছিল কারন নিযামের জন্ম ছিল ১০১৮ সালে, ওমর খৈয়াম ১০৪৮ সালে আর সাবাহ ১০৫০ সালে। সেক্ষেত্রে খৈয়াম আর সাবাহ কাছাকাছি হলেও নিযাম কোন মতেই সাবাহর সহপাঠী হবার সম্ভাবনা নেই।


Hassan-i Sabbah

হাসান ইবনে সাবাহ প্রায়ই বলতেন জনা ছয়েক “বিশ্বাসী” পেলেই নিজেকে জগতের অধীশ্বর বানাতে পারবেন। তার সন্মন্ধ্যে প্রচলিত আছে, হাসানের উগ্রতা দেখে একদা তারা এক বন্ধু স্যাফরন আর বিশেষ মদের তৈরী ওষুধ খেতে দিয়েছিলেন তাকে- পাগলামির প্রতিষেধক হিসাবে, অনেক পরে হাসান যখন বিভিন্ন ভাবে সেই সময়ের আঙ্গিকে সফলতা লাভ করে নিজের ভবিষ্যতবানী সত্য প্রমান করে তার সেই বন্ধুকে একটা বার্তা পাঠিয়েছিলেনঃ “এখন তাহলে পাগল কে?”

গোড়াতে নিঃসন্দেহে ব্যাক্তিগত একটা আকর্ষনীয় শক্তি ছিল হাসান ইবনে সাবাহর এবং ভীষন বেপরোয়া ছিলেন, এই বেপরোয়া স্বভাবের কারনে খুব দ্রুত কাঙ্খিত কয়েকজন জনা ছয়েক মিত্র পেয়ে গেলেন। খুবই সরল একটা বিশ্বাস প্রচার করছিলেন তিনি, “সত্য বলে কিছু নেই, আর সব কিছুই জায়েজ।” অর্থোডক্স ইসলামের বেশ কিছু ট্রাডিশানের বিরুদ্ধে বিদ্রুপ করে সবার নজর কেড়ে নিয়েছিলেন।

অনুসারীদের যাজক, সহচর ও ফেদায়ী (ভক্ত) এই তিন ভাগে ভাগ করে তিনি এক গোপন গোষ্ঠী গড়ে তুলেন। এরাই তার সাফল্যের মুল চাবিকাঠিতে পরিনত হয়। এরা ছিল এ্যাসাসিন।

এ্যাসসসিন কারা? কিভাবে এই নাম আসল


Assassins

রক্তলাল কোমড় বন্ধনী আর চপ্পল সহ সাদা জোব্বা পরা এক জোড়া বাকা ছুড়ি এরা গোপনে শরীরে বহন করত। এরা সবাই ছিল তরুন বা সদ্য কৈশোরোত্তীর্ন। হাসান এই সব তরুন আর কিশোরদের ভাঙ আর মদের সাথে আফিম মিশিয়ে খাইয়ে গোপন কৌশলে দীক্ষা দেন, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা নিজেদের বোধ বুদ্ধি হারিয়ে তার (হাসানের) অস্ত্রে পরিনত না হয়। ফেদায়ীদের মনে এ বিশ্বাস তিনি বদ্ধমুল ভাবে ঢুকিয়ে দিতেন যে মৃত্যু অনন্ত আনন্দের উৎস। আর এই হ্যাশিস যার একটা ধারনা দেয় মাত্র। এই "হ্যাশিস" থেকে "হ্যাশাসিন" সেখান থেকে "এ্যাসাসিন" শব্দটির উৎপত্তি।



আলামুত পাহাড়ের “ঈগলের বাসা” নামক দূর্গে তিনি তার হেড কোয়ার্টার স্থাপন করেন। এখানে তিনি সাদ্দাদের বেহেশতের আদলে এক বেহেশত তৈরী করেন, পাহাড়ের ওপর দেয়াল ঘেরা বিচিত্র গাছপালা, সূর্যালোকে মদের ঝর্না, রেশমী কাপড়ের তাবু এবং কিয়স্কওয়ালা অনিন্দ্য সুন্দর উদ্যান আর দৃষ্টির আড়ালে থাকা বাদকদের দের মোহনীয় বাদ্য হ্যাশিসের প্রভাবে আচ্ছ্বন্য তরুন ফেদায়ীদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই এটা এক বেহেশত হিসাবে ধরা দিত।


Hashashin Eden

তাদের খেদমতে হাজির থাকত অপরূপ কিছু সুন্দরী, যাদের সাথে যথেচ্ছা যৌনাচার তাদের মনে বদ্ধমুল ধারনা দিত তারা বোধ হয় সত্যিকারের বেহেশতে আছে। মাদকের নেশায় অচেতন ফেদায়ীদের হাসানের বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দুই তিন দিন রাখা হত, এর পর তাদের মাদকের ঘোরে কয়েকদিন বেহেশতের সুখানুভুতি দিয়ে আবার আলামুত পাহাড়ের দূর্গে নিয়ে বলা হত বাস্তবিক ই তারা হাসানের আশীর্বাদে সত্যি সত্যি বেহেশতে যেতে পেরেছে তবে সেটা সাময়িক কারন ঐ বেহেশতে তারা পার্মানেন্টলি থাকতে পারবে এক মাত্র মৃত্যুর পর।


Murders for a False Paradise: The Hashshashins

ঈগলের বাসারা ওই উদ্যান বা বেহেশতের তুলনা চলতে পারে এমন সুখী মানুষের দেশ কোথাও নেই। সেখানে উদ্যানের তোরনের মাথায় লেখা ছিলঃ

ঈশ্বরের সাহায্যে
জগতের অধিশ্বর আইনের বিধান
ছিন্ন করেছেন। তার নামের (হাসানের)
তারিফ করো


এই সব তরুন দের কাছে হাসান যে কোন ইসলামের যে কোন ব্যাক্তির চেয়ে ক্ষমতাশালী পয়গম্বরের মত হয়ে ওঠেন। আত্মার মুক্তিদাতা হয়ে ওঠেন তিনি। সংগঠনের হাতে গোনা সামান্য কয়েকজন ব্যাক্তি তার উদ্দেশ্য ধরতে পেরেছিল – আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতা অধিকার এবং চলমান অবস্থা বিপর্যস্ত করে সম্পদ আহরন।

আলমুত দূর্গ বা ঈগলের বাসা দখল


Alamut Castle - Gate Of Alamut

এ সময় হাসান তার জন্য এমন এক জায়গার খোঁজ করতে থাকেন যেখানে তিনি তার কার্যক্রম আরো ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। খোঁজ করতে করতে তিনি ১০৮৮ সালে আলামত শহরের দেখা পান। এখানে হাসান তৎকালীন ফাতিমীয় খলিফার ইমাম হবার দাবি অস্বীকার করেন। তিনি নিজারের সমর্থক ছিলেন। এখানেই তিনি তার স্থায়ী কেন্দ্র গড়ে তুলে প্রকৃত ইমাম হিসেবে নিজারের উত্তরাধিকারকে সমর্থন প্রদান করতে আগ্রহী ছিলেন। আলামুতে একটি দুর্গ ছিল যা প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার লম্বা এবং পাঁচ কিলোমিটার চওড়া একটি উপত্যকার প্রতিরক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। কিংবদন্তী আছে যে, এক রাজা এখানে শিকার করার সময় এক ঈগলকে দেখে সেটিকে অনুসরণ করেন। কিছুক্ষণ পর সেটিকে উড়ে গিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় এক পাথরের ওপর বসতে দেখলে রাজা এটিকে এক শুভলক্ষণ হিসেবে নেন। এ জায়গার কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সে রাজা এখানে এক দুর্গ নির্মাণ করে সে দুর্গের নামকরণ করেন ‘আলামুত’ বা ‘ঈগলের বাসা’


hasan-i-sabah.com – "The Old Man of the Mountain"

প্রায় দু’বছর সেখানে অবস্থান ও ইসমাইলি মতবাদ প্রচারের মাধ্যমে তিনি ১০৯০ খ্রিস্টাব্দে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গের দখল নিতে সমর্থ হন। লোকমুখে প্রচলিত কথা অনুসারে হাসান দুর্গের মালিককে ৩০,০০০ স্বর্ণের দিনারের বিনিময়ে দুর্গ বিক্রি করে দেয়ার প্রস্তাব দেন। দুর্গের মালিক রাজি না হলে হাসান যুদ্ধ শুরু করেন এবং দুর্গের মালিককে পরাজিত করে দুর্গের দখল করেন। তিনি দুর্গের মালিককে এক ধনী জমিদারের নাম ও ঠিকানা লিখে একটি চিঠি দেন এবং তার কাছ থেকে তিনি তার পাওনা টাকা নিতে বলেন। কিংবদন্তী আরো বলে যখন সে জমিদার হাসানের সই সহ সে চিঠি দেখেছিলেন তিনি দুর্গের মালিককে বিস্মিত করে বিনাবাক্য ব্যয়ে তার পাওনা টাকা পরিশোধ করে দেন। আলামুট দুর্গ দখল করার বছরই হাসান অ্যাসাসিন বা গুপ্তঘাতকদের এ সংঘটি প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাসাসিনরা ছিলো শিয়া মুসলিমদের বিচ্ছিন্ন একটি অংশ। তিনি পাহাড়ি অঞ্চলের উপরের অংশের দখল পাওয়ামাত্র তিনি যুদ্ধ ও গুপ্তহত্যার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তৃতি ঘটানো শুরু করেন।

হাসান ইবনে সাবার শিকার শুরু


Assassination of Nizamul Mulk

আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি তিনজন ফেদায়ীর একটি দল তৈরী করতেন। এবং হত্যা করা হত মসজিদে নামায পড়া অবস্থায় অথবা নামাযে আসা যাওয়ার পথে। প্রথম আততায়ী শিকারের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে ছুরিকাঘাত করত, সে ব্যার্থ হলে দ্বিতীয় জন এবং কোন কারনে দ্বিতীয় জন ব্যার্থ হলে তৃতীয় জনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাড়াত, যেখানে আততায়ী নিজের জীবন উৎসর্গকে ধর্মীয় পূন্য অনন্ত বেহেশত লাভের পথ হিসাবে দেখত। এই সব শিয়া ইসমাইলীয় আততায়ীরা মুহাম্মদীয় শহরের জনাকীর্ন পথে উটচালক, চাকর বা ভিস্তিওয়ালা যে কোন ছদ্মবেশে সাধারনের ভেতর মিশে যেত।

আধুনিক সুইসাইড বম্বারদের সাথে নিশ্চয়ই আপনি মিল পাচ্ছেন, কিন্তু মজার একটা ব্যাপার আছে এখানে হাসান আর বর্তমান এ্যাসাসিন বা সুইসাইড বম্বারদের মাঝে, বর্তমানে যারা সুইসাইড বম্বিং করে তারা প্রয়শঃ নিরীহ মানুষদের মাঝে নিজেকে হত্যা করে যতটা সম্ভব সাধারন মানুষ হত্যা করে, অন্য দিকে হাসানের আইডোলজি ছিল যদি একজন মানুষ কে হত্যা করে অনেক মানুষের যুদ্ধের প্রান রক্ষা করা যায় তবে ওই একজন কে হত্যা কর।

হাসানের প্রথম শিকার ছিল মহান সেলজুক উজির নিযাম উল মুলক ১০৯২ সালের ১৪ ই অক্টোবর। নিযামের মৃত্যুতে সেলজুক সাম্রাজ্যের ভাঙন ত্বরান্বিত করে। এর পর উত্তরের গাজী মওদুদ কে হত্যা করেন।

স্বাভাবিক হত্যাকান্ডের থেকে ড্যাগারের আতঙ্কই তখনকার বড় বড় আমীর ওমরাহদের আতঙ্কিত করত। যার কারনে তার আরোপিত চাঁদা দিতে খুব অল্প মানুষ ই গড়িমসি করত। স্বাভাবিক ভাবেই বহু আমীর ওমরাহ তার শত্রু হয়ে দাড়ায়। তাকে মুলাহিদ (ধর্মদ্রোহী) আক্ষা দিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে কিন্তু এ্যাসাসিন গুরু হাসান আল সাবাহ থাকেন ধরা ছোওয়ার বাইরে।


Salah ad-Din Yusuf

বিখ্যাত কুর্দ বীর সালাউদ্দীন এ্যাসাসিন গুরু শেইখ আল জাবাল কে ধরার জন্য ঈগলের পাহাড়ে হানা দিয়েছিলেন, বাস্তবতা হল সালাউদ্দীনকে হত্যার নিমিত্তে এই এ্যাসাসিনরা দুইবার আক্রমন চালিয়ে বিফল হলে সালাউদ্দীন রেগে গিয়ে আলামুত অবরোধ করে কিন্তু দখল নিতে পারে না, কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে সালাউদ্দীন যে শেইখ আল জাবাল কে ধরতে যায় সে হাসান আল সাবাহ না কারন হাসান মারা যায় ১১২৪ খ্রিষ্টাব্দে আর সালাউদ্দীনের জন্ম ১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দে। শেইখ আল জাবাল এ্যাসাসিনদের গুরুর একটা উপাধি মাত্র। সে অন্য গল্প হয়ত অন্য দিন বলব। যে মানুষটি সন্মুখ যুদ্ধে ভয় পায় না সেও কিন্তু মাথার ওপর মরন হয়ে ঝুলে থাকার ড্যাগারের মৃত্যু ভয় অস্বীকার করতে পারে না।

হাসান ইবনে সাবাহ বা শেইখ অব জেবালের মৃত্যু


Assassin fortress of Alamut. Persian miniature.

হাসান পাহাড়ের মাঝে কিছু দূর্গ স্থাপন করেছিলেন বা পুরানো দুর্গগুলোকে সংস্কার করে এক ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন যার কারনে তাকে “শেইখ আল জেবাল” বা “পাহাড়ের প্রবীন পুরুষ” নামে ডাকা হত। জীবনের শেষ দিকে হাসান এক বিচিত্র নতুন ইম্পোরিয়ামের ভিত্তি স্থাপনে সক্ষম হন, সমরকন্দ থেকে কায়রো পর্যন্ত যেখানেই পাহাড় ছিল সেখানেই তার রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল যদিও সে কোন সুলতান বা রাজা ছিল না কিন্তু তার সময় যে কোন সুলতানের থেকে বেশী প্রভাব রেখে গেছে তার অমর সৃষ্টি এ্যাসাসিনদের মাধ্যমে।


Archeologists in search of Hassan Sabah’s Tomb in Alamut fortress

হাসান সাব্বাহ যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে বলে অনুভব করছিলেন তখন তিনি তার সহকারী বুজুর্গ-উমিদকে তার উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনীত করে যান। তিনি আরো তিনজনকে তার সহকারী হিসেবে মনোনীত করে যান। কিছুদিন অসুস্থতায় ভোগার পর হাসান ১১২৪ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। তাকে আলামুটের অদূরে দাফন করা হয়। হাসান সাব্বাহর শুরু করা কাজ অ্যাসাসিনরা আরো দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে সফলভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। হাসানকে ইসমাইলিদের ত্রাণকর্তা বলে অভিহিত করা যায়। তার সমাধিতে প্রতি বছর অসংখ্য নিজারি ইসমাইলি জিয়ারত করতে যেত। মঙ্গোলরা ১২৫৬ খ্রিস্টাব্দে তার সমাধি ধ্বংস করে দেয়।

হাসান ইবনে সাবাহ প্রায় হাজার বছর আগে মারা গেছে, কিন্তু তার দেখানো পথ ধরে আজকে অনেক রাষ্ট্রই এ্যাসাসিনদের সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় লালন করে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে, আর ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা সেই এ্যাসাসিন হয়ে সারা পৃথিবীকে নরক বানিয়ে রেখেছে প্রতি মুহুর্তে সাধারন মানুষকে উৎকন্ঠায় রেখে।।

কৃতজ্ঞতাঃ Hassan-i Sabbah

Introduction to The Assassin Legends

হাসান-ই-সাব্বাহ: অ্যাসাসিনদের স্রষ্টা

THE ASSASSINS OF ALAMUT:

ফাতেমীয় খিলাফত

Death of Hasan bin Sabbah

Archeologists in search of Hassan Sabah’s Tomb in Alamut fortress

আরো অনেক অন্তর্জাল সহ "হ্যারল্ড ল্যাম্বের দ্যা ক্রুসেডস দ্যা ফ্লেইম অভ ইসলাম"
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ২:০৭
১৭টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিলেকোঠার প্রেম- ১৩

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৫


দিন দিন শুভ্র যেন পরম নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা শেষ। পড়ালেখাও নেই, চাকুরীও নেই আর চাকুরীর জন্য তাড়াও নেই তার মাঝে। যদি বলি শুভ্র কি করবে এবার? সে বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগ্ন দেহের অপূর্ব সৌন্দর্যতা বুঝেন না! বলাৎকার বুঝেন?

লিখেছেন মুজিব রহমান, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:৩৫


শৈল্পিক প্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নগ্নতাকে৷ ইউরোপে অন্ধকার যুগ কাটিয়ে রেনেসাঁ নিয়ে এসেছিল আধুনিক ও সভ্য ইউরোপ৷ রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরা দেদারছেই এঁকেছেন শৈল্পিক নগ্ন ছবি৷... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নবীকে ব্যঙ্গ করার সঠিক শাস্তি সে ফরাসি শিক্ষক কি পেয়েছে?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৫৩



গত কয়েকদিন আগে ফ্রান্সে কি হয়েছিল? একজন শিক্ষক ক্লাসে আমাদের নবীর ব্যঙ্গচিত্র দেখিয়েছিলেন, বলা হয়েছিল তার উদ্দেশ্যে ছিল বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে বুঝানো। এটার পর এক মুসলিম যুবক তার ধর্মীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবি ও পাঠক

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:৩১

কবিদের কাজ কবিরা করেন
কবিতা লেখেন তাই
ভেতরে হয়ত মানিক রতন
কিবা ধুলোবালিছাই

জহু্রি চেনেন জহর, তেমনি
সোনার পাঠক হলে
ধুলোবালিছাই ছড়ানো পথেও
মাটি ফুঁড়ে সোনা ফলে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

***

স্বরচিত কবিতাটির ছন্দ-বিশ্লেষণ

শুরুতেই সংক্ষেপে ছন্দের প্রকারভেদ জেনে নিই। ছন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় খাবার সমূহ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৩:৩৪



আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যেসব খাবার গ্রহণ করেছেন, তা ছিল সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। নবীজি (সা.) মোরগ, লাউ, জলপাই, সামুদ্রিক মাছ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×