
ঢাকা শহরের আজকের কোন এক জায়গায় ত্রান দানের চিত্র
ধরে নিন, কমপক্ষে আগামী ৭/৮ মাস যাবত পৃথিবীব্যাপী করোনা তার মৃত্যু ছোবল রাখবে, সারা বিশ্বে যেখানে এখন গড়ে প্রায় ৩০০০ মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানে আমি কোন দিনই বিশ্বাস করিনি চীনের উহানে মাত্র ৩৩০০ মানুষ মারা গেছে। আজকে মানব জমিনে একটা ফিচার আসছে যেখানে লিখছে ১২ দিনেই উহানে মৃত্যু হয়েছে ৪২০০০ (দেখুন করোনা: উহানেই মারা গেছেন ৪২,০০০ মানুষ!)। ইউরোপ আমেরিকায় প্রতিটা মানুষের জীবন হিসাব কিতাবের মাঝে থাকায় মৃত্যুর সংখ্যাটা মোটামুটি ধারনা পাওয়া যায়।
আমাদের দেশের মত দরিদ্র দেশে (যদিও এখানে এই দরিদ্র শব্দটি নিয়ে কনফিউশান আছে সরকারী ভাষ্যমতে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ তাও ২০১৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ) করোনা বড় ব্যাপার না, এখানে বড় ব্যাপার ক্ষুধা। এটা অবশ্য এই মুহুর্তে বিশ্বের দরিদ্র বা মধ্যম আয়ের দেশের জন্য না উন্নত দেশের জন্যও প্রযোজ্য। উন্নত দেশ গুলোতে সরকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার পৌছে দিচ্ছে। এদিকে আমাদের দেশে মহল্লা ভিত্তিক কিছু ত্রান দেয়া হচ্ছে তবে সেটাও অনেকটা ঢাকা ভিত্তিক, মফঃস্বলে কতটুকু আমার ধারনা নেই। কারন হোম কোয়ারেন্টাইনে নিম্ন আয়ের মানুষ গুলো রাস্তায় নামতে না পেরে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
পেটের ক্ষুধায় করোনা ভীতি অনেকটাই তিরোহিত। আপনি কি দেখছেন যখন কোন এলাকায় ত্রান দেবার ঘোষনা দেয়া হয় তখন কি অবস্থা তৈরী হয়? যদিও সরকার থেকে বার বার বলা হচ্ছে এক জায়গায় বেশী মানুষ যেন না আসে, কিন্তু কোথাও ত্রান দেবার কথা শুনলে সেখানে অসংখ্য মানুষ ভীড় করছে, এবং প্রয়োজনের তুলনায় সে ত্রান প্রায় অপ্রতুল। ভাগ্যবান যারা দুই/ পাচ কেজি চাল পাচ্ছে তারা দুই চারদিন না খেয়ে মৃত্যুকে ঠেকিয়ে দিচ্ছে, এটাই আত্মতৃপ্তি। আর যারা পাচ্ছে না, তাদের সজল চোখ গুলো দেখলে হয়ত মৃত্যুদুতেরও মায়া হবে। আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি যারা এই দুর্যোগের মাঝেও মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু যারা ত্রান নিচ্ছে তারা কতটুকু এই করোনা ভাইরাসকে কেয়ার করছে? দেখুন নীচের ছবি। আজকের ছবি। সঙ্গত কারনেই স্থানের নাম দিলাম না।

গত কাল নিউ ইয়র্কে এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে ফোনে আলাপ হচ্ছিল, এই দুর্যোগেও সে মজা করতে ছাড়ে না, অবশ্য আমার নিজস্ব বন্ধু সার্কেলের সবাই মজার। সে বলল, বুরুন্ডির প্রধানমন্ত্রীকে নাকি জিজ্ঞাস করা হয়েছে সারাবিশ্ব করোনা আক্রান্ত কিন্তু আপনার দেশ কিভাবে করোনা মুক্ত? (দেখুন বিশ্বে করোনা মুক্ত দেশের তালিকা করোনা ভাইরাস মুক্ত যে ৪২ দেশ ) জবাবে বুরুন্ডির প্রাধানমন্ত্রী বলে আমাদের করোনা টেষ্টের কোন উপকরন নাই, তাই কেউ করোনায় মারা যায় না। আরো মজার ব্যাপার জানুন পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার কিন্তু করোনা মুক্ত!!

কোন সুখই চিরস্থায়ী না, আবার কোন দুঃখই চিরকাল থাকেনা। আজ হোক কাল হোক এই করোনা ভাইরাস নির্মুল হবেই ইনশাল্লাহ। তবে কবে হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কত জন বাচবে কত জন মারা যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আমার ওই বন্ধুর কাছ থেকেই শুনলাম, জ্যাকসান হাইটসের একটা মসজিদের ইমাম করোনায় আক্রান্ত হবার হবার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, এক পর্যায়ে রোগীর অবস্থা সিরিয়াস হলে তাকে ভেন্টিলেশানে (ভেন্টিলেটর হল ‘লাইফ সেভিং ডিভাইস’। একে বলা হয় সাপোর্টিভ চিকিৎসা। অনেক সময় রোগ জটিলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছলে দেখা যায় রোগী নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারছেন না। তাঁর শ্বাসযন্ত্র ঠিকঠাক কাজ করছে না। রেসপিরেটরি ফেলিওর হচ্ছে। তখন কৃত্রিম উপায়ে বাইরে থেকে মেশিনের সাহায্যে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখার চেষ্টা করা হয়। এটাই ভেন্টিলেশন। আর যে যন্ত্রের সাহায্যে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়, সেটি হল ভেন্টিলেটর) রাখা হয়। কিছুক্ষন পর ডাক্তার এসে তাকে জানায় “তোমার বয়স ৬৫+, তোমার থেকে কম বয়সীরা এই মুহুর্তে ভেন্টিলেশানের অপেক্ষায় আছে, অথচ আমাদের এই যন্ত্রের অপ্রতুলতা আছে, সর্যি ফর দ্যাট, গুড বাই”। ভেন্টিলেটর খুলে নেয়া হয়। এখানে আবার কেউ ধর্মীয় উদ্দীপনা খুজবেন না, ইউরোপ আমেরিকার অবস্থা এখন অনেকটা এই অবস্থাতেই আছে, পরিস্থিতির সাপেক্ষে বয়স বেশীদের চিকিৎসা না দিয়ে যাদের বেচে থাকার সম্ভাবনা বেশী তাদেরই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এই করোনা থমকে দিয়েছে সমস্ত অর্থনীতিকে। সারাবিশ্বের অবস্থা অল রেডি লেজে গোবর, করোনা নিয়ে হৈ চৈ বেশি হচ্ছে কারন এটা ইউরোপ আমেরিকাকে আক্রমন করছে। এই ভাইরাস যদি এশিয়া, আফ্রিকায় এভাবে মানুষ মারত তবে এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার প্রয়োজন ছিল না। এই দুই মহাদেশ মৃত্যুকে জীবনের অন্যতম সখা হিসাবে জানে, সমস্যা হল, ইউরোপ আমেরিকায় এই মহামারী দেখা দিল (আমাদেরকে আমি হিসাব দিয়ে বাদ দিয়ে নিচ্ছি মানে এশিয়া আফ্রিকা), এর লম্বা দায় টানতে হবে আমাদের মত গরীব দেশ গুলোর। কবে এর প্রকোপ কমবে জানি না, উন্নত বিশ্ব বা এশিয়ার সামর্থ্যবান দেশ গুলো এক্সট্রা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার এর পেছনে অতিরিক্ত ব্যায় করছে, সেক্ষেত্রে আমাদের মত সাহায্য প্রত্যাশী দেশ গুলো তাদের সাহায্য ছাড়া কিছু দিন কিভাবে চলবে?
মাত্র এক সপ্তাহ লক ডাউনেই বর্তমানে ত্রানের সহায়তা নিতে গিয়ে সমস্ত চিকিৎসা আইন কানুন ভেঙ্গে গেছে, মানুষ করোনা ছাড়াও অন্যান্য অষুখে যদি তার সাথে সামান্য জ্বর থাকে তবে বিনা চিকিৎসায় মরছে। এগুলো নিউজ পেপারে আসছে, ওদিকে হুশিয়ারি আছে করোনা্ নিয়ে কোন গুজব চলবে না। কোনটা গুজব আর কোনটা গুজব না পার্থক্য করাটাই বিরাট ব্যাপার। হাজার হাজার পিপিই আসছে, কিন্তু কয়জনে বুজতে পারে এই সব পিপিই সব ডিসপোজাবেল (যদি সেটা কারেক্ট পিপিই হয়েও থাকে)। মানে যে সব পিপিই পরে ডাক্তাররা চিকিৎসা দেবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর সেটা (প্রায় ক্ষেত্রেই ১২/২৪ ঘন্টা) আর সুরক্ষা দিতে সক্ষম না। আবার নতুন পিপিই লাগবে। এবং পিপিই নিয়ে কোন কম্প্রোমাইজ করার সুযোগ নেই, কারন এটা জীবন মরন প্রশ্ন। আপনি যে মাস্ক পরে করোনা ভাইরাস ঠিকিয়ে দিচ্ছেন ভেবে নিশ্চিন্তে মনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সেটা কি ভাইরাস প্রোটেক্টেড না ধুলাবালি প্রটেক্টেড (দেখুন করোনা মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরঞ্জাম সঙ্কট বাংলাদেশে)।
বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক অবস্থা সামনের দিন গুলোতে সব চেঞ্জ হয়ে যাবে। এমনিই মানুষ এখন আত্ম কেন্দ্রিক হয়ে আছে, সামনে আরো হবে। বিদেশ মুখাপেক্ষী আমাদের মত দেশগুলোর অবস্থা ভয়াবহ হবে, যদি করোনা থেকে বেচেও যান। একটা জেনারেশান লাগবে এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে। বানের পানির মত বিদেশ থেকে মানুষ গুলো দেশে আসছে যাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর একটা বিশাল জন গোষ্ঠী বেচে থাকত। লক ডাউনের নামে বিত্তবানরা কিছুটা সুরক্ষা পাচ্ছেন মানে যাদের টাকা আছে, কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় তাদের কি হবে ( দেখুন সাবেক এমপির ক্ষোভ)?
করোনা মোকাবেলার পাশাপাশি আমাদের এখনি ভাবতে হবে কিভাবে পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে আমরা তাল মেলাব, না হলে তখন ভাবতে বসলে এর চড়া মুল্য আমাদের দিতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




