somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শের শায়রী
অমরত্বের লোভ কখনো আমাকে পায়না। মানব জীবনের নশ্বরতা নিয়েই আমার সুখ। লিখি নিজের জানার আনন্দে, তাতে কেউ যদি পড়ে সেটা অনেক বড় পাওয়া। কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আর কিছুই নেই।

ডাঃ ঐন্দ্রিল ভৌমিকের "মৃত্যুর রঙ কালো"

০১ লা এপ্রিল, ২০২০ সকাল ৭:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গল্প শুরুর আগেঃ

১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সালের মধ্যে প্লেগের এই মহামারীতে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় মারা গেছিলেন প্রায় কুড়ি কোটি মানুষ, যা ছিল এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের তিন ভাগের এক ভাগ। এই অঞ্চলের জনসংখ্যা এতটাই কমে গেছিল যে পরবর্তী চারশ বছর লেগেছিল আগের জনসংখ্যা ফিরে পেতে।

যদিও মানুষ তখনও জানতনা রোগটা প্লেগ এবং এর জন্য দায়ী ইয়ারসেনিয়া পেস্টিস বলে একটি ব্যাকটেরিয়া। আর এই রোগ ছড়ানোতে বড় ভূমিকা আছে ইঁদুর ও ইঁদুরের গায়ে একরকম মাছির। তারা এই রোগের নাম দিয়েছিল কৃষ্ণ মৃত্যু বা ব্ল্যাক ডেথ। তাদের ধারণা ছিল রোগটি ছড়ায় মিয়াসমা বা বিষ বাষ্পের মাধ্যমে।

এতদিন চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল ফেল কড়ি, মাখো তেল। এই প্লেগ মহামারীর সময়েই প্রথম সরকারি ডাক্তার দেখা গেল। তাঁরা বেতন পেতেন সরকারের থেকে। অথবা স্থানীয় লোকেরা চাঁদা তুলে তাঁদের বেতন দিত। বিচিত্র তাঁদের পোষাক, আরও বিচিত্র তাঁদের চিকিৎসা পদ্ধতি।

আমি গল্পওয়ালা। আর ইতিহাসের কচকচানির মধ্যে না গিয়ে বরঞ্চ এরকম একজন চিকিৎসকের দিনপঞ্জী থেকে কয়েকটা পাতা আপনাদের জন্য তুলে দিলাম।

******★*********



প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ সবার হয়না। বিশেষ করে যার উপর প্রতিশোধ নিতে হবে সে যদি সামাজিক অবস্থানে অনেক উঁচুতে থাকে।

আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ নিতে পারলাম না।


কাউন্টের দূর্গ থেকে আজ ডাক পেয়েছিলাম। কাউন্ট উইলফ্রেড। চিকিৎসকের পোষাক গায়ে চাপালাম। বড় অদ্ভুত এই পোষাক। মাথায় হ্যাট। গায়ে চামড়ার জ্যাকেট। চোখে রঙিন কাঁচের চশমা। সবচেয়ে অদ্ভুত হ’ল পাখির ঠোঁটের মত দেখতে মুখোশ। ঠোঁটের ভেতরে আছে নানা ঔষধি গাছগাছড়া, ফুল ও গন্ধতেল। নাকের ভেতরে থাকা এ উপাদানগুলো মিয়াসমা বা বিষবাষ্পকে ভেতরে প্রবেশে বাধা দেবে।



রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম, অসংখ্য মৃতদেহ চারদিকে ছড়িয়ে আছে। রোজই হাজার হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা পড়ছে। তবে সবাই যে মৃত, তা নয়। অনেকগুলি দেহই হামাগুড়ি দিয়ে এগোনোর চেষ্টা করছে। তাদের আঙুলের ডগা কালো। নাকের উঁচু অংশ কালো। কুঁচকিতে, বগলে বড় বড় আব গজিয়ে উঠেছে। আব ফেটে গিয়ে পুঁজ, রক্ত গড়াচ্ছে। আস্তে আস্তে সমস্ত শরীরটাই কালো হয়ে যাবে।

অনেকেই আমাকে দেখে কাতর স্বরে ডাকছে। এদের কাউকে বাঁচানোর ক্ষমতা আমার নেই। আমি আমার সীমাবদ্ধতা জানি। হাতুড়ে চিকিৎসক ছিলাম। এই মহামারি শুরু হতেই ভালো চিকিৎসকেরা মারা পড়েছেন অথবা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আমাদের মত অশিক্ষিত চিকিৎসকেরা এখন মানুষের বল ভরসা। এবং এর জন্য আমরা সরকার থেকে রীতিমতো মাইনে পাচ্ছি।

তবে এই মুহূর্তে আমি ওসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমি শুধু প্রতিশোধ নিতে চাই। দুবছর আগে এমনই এক বসন্তের দিনে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী এলাবেস্টরকে কাউন্টের লোকজন জোর করে তুলে নিয়ে গেছিল ঐ দূর্গের ভেতরে। আমাকে আধমরা করে ফেলে দিয়েছিল পাহাড়ের খাতে। এলাবেস্টর আর ফেরত আসেনি। দূর্গের এক কর্মচারীকে অনেক অর্থ ঘুষ দিয়ে খবর পেয়েছিলাম অকথ্য অত্যাচারের পরে সেদিন রাত্রেই এলাবেস্টরকে হত্যা করা হয়েছে।

তারপর থেকে আমি বেঁচে আছি একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রতিশোধ নিতে হবে। আজ তাঁর সূবর্ণ সুযোগ।

দুর্গের মূল ফটক দিয়ে যখন ঢুকছি, তখন আমার রক্ত নাচছে। কিন্তু স্বয়ং কাউণ্টের জন্যই যে আমাকে ডেকে আনা হয়েছে বুঝিনি।



একি চেহারা হয়েছে নারী লোলুপ কাউন্টের। কনুই অব্দি দুই হাত কালো। সারা গায়ে বড় বড় আব। যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমাকে দেখে বলল, “ডাক্তার আমাকে সুস্থ্য করে দাও। যত টাকা লাগে দেব।”

আমার কাছে বিষ আছে। খুব সহজেই বিষ প্রয়োগে কাউন্টকে হত্যা করা যায়। কিন্তু সেটা কাউণ্টের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে যাবে। ঈশ্বরই ওকে শাস্তি দেবেন। তিল তিল করে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। আমি নিজের চোখে সেই মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে পারব।

গম্ভীর হয়ে বললাম, “আপনি এক মনে ঈশ্বরকে ডাকুন। জীবনে যদি সৎ কার্য কিছু করে থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই আপনাকে রক্ষা করবেন।”

***
১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৩৫০
+++++++++++++++


এই দুদিনে কাউন্টের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আমি আব গুলো কেটে জোঁক দিয়ে বদ রক্ত চুষিয়েছি। কিন্তু তাতে উন্নতি বিশেষ হয়নি। আমি জানি উন্নতি হবেও না। একমাত্র মৃত্যুই এই রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে।

চিকিৎসকদের হাতে এই রোগের কোনও ওষুধ নেই। তার জন্যই যে যার মত পারছেন, চিকিৎসা করছেন।



ধারালো ছুরি দিয়ে রোগীর যেই আব গুলিতে সবচেয়ে বেশি ব্যথা হচ্ছে, তার উপরের চামড়া কেটে ফেলা হয়। এরপর সেখানে জোঁক লাগিয়ে দেয়া হয় যেন সেগুলো বিষাক্ত রক্ত চুষে নিতে পারে। রক্ত পান করতে করতে জোঁকগুলো যখন খসে পড়লে ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়।



অ্যাঞ্জেলিকা (সুগন্ধি লতাবিশেষ), জুনিপার, ডুমুর ফল, জাফরান এবং ভিনেগার মিশিয়ে ওষুধ বানানো হয়। এটা রোগীকে গরম গরম খাওয়ানো হয়।

অনেকে রোগীকে অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি নিয়ে বসিয়ে রাখেন। এভাবে প্রায় ঘণ্টা তিনেক রোগীকে রেখে দেয়া হয়, যাতে সে ঘামতে থাকে। তাঁদের ধারণা ঘামের সাথে রোগও শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। এরপর রোগীর পুরো শরীর মুছে তাকে আবার বিছানায় শুইয়ে দেয়া হয়।

অনেকেই ঘরে রোজমেরি, সেজ ও ল্যাভেন্ডার একত্রে ঝুলিয়ে রাখেন। এগুলোর সুগন্ধ মিয়াসমা বা বিষাক্ত বাতাসকে তাড়িয়ে দেয়।



এছাড়াও মানুষেরা নিজের মত চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। কেউ আক্রান্ত স্থানে মুরগি ঘষছে যাতে রোগ নিরীহ প্রাণীর দেহে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। মুরগিতে কাজ না হলে পায়রা কেটে টুকরা টুকরা করে এর নাড়িভুঁড়ি সারা শরীরে মাখছে।



কেউ কৃষ্ণ মৃত্যুকে ঈশ্বরের অভিশাপ মনে করে নিজেকে ক্রমাগত চাবুক মারছে।

অনেকে ফোস্কা গলিয়ে সেখানে মানব মল, গাছের রজন ও মূল পিষে লাগিয়ে রাখছে। ধনী ব্যক্তিরা পান্না চূর্ণ করে সেটা তরকারি সিদ্ধ জলে মিশিয়ে এক ঢোকে গিলে নিচ্ছে।

মলমূত্রের গন্ধযুক্ত বাতাস মিয়াসমা বা দুষিত বাতাসকে তাড়িয়ে দেবে, এ আশায় মানুষজন পয়ঃপ্রণালীতে গিয়ে বসে থাকছে। এমনকি মানবমূত্র দিয়ে স্নান করছে।



কিন্তু কোনও চিকিৎসার ফলাফল সন্তোষজনক নয়। পোকা মাকড়ের মত মানুষ মরছে। দেশের আইন শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়েছে। চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, খুনোখুনিও যেন মহামারী হয়ে উঠেছে। কোনও এক যাজক বলেছেন, এই রোগের জন্য দায়ী ইহুদীরা। ব্যাস, লোকজন সংখ্যালঘু ইহুদী নিধনে মেতে উঠেছে। তাদের পিটিয়ে মারা হচ্ছে অথবা একটা ঘরের মধ্যে ইহুদীদের বন্দি করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তাই দেখে আনন্দে হাততালি দিচ্ছে।

আমি আরেকটি খাতায় সে সব বিস্তারিত লিখে রেখে যাচ্ছি। তাছাড়া চার্চ আমাদের অসুখে মৃত ব্যক্তির দেহ কাটা ছেড়া করার অনুমতি দিয়েছে। তার ফলাফলও আমি লিখে যাচ্ছি সেই খাতায়। যদি ভবিষ্যতের সত্যিকারের চিকিৎসকদের কোনও কাজে লাগে।



একটা অদ্ভুত জিনিস আমি লক্ষ করেছি। কৃষ্ণ মৃত্যু কোনও এলাকায় ছড়ানোর আগে সেখানে মেঠো ইঁদুরের মৃত্যু খুব বেড়ে যায়। বয়স্ক মানুষেরা আমার এই পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করেছেন। আমি ইঁদুরের দেহ কাটা ছেঁড়া করে আবের সন্ধান পেয়েছি। তাহলে কি মিয়াসমা নয়, ইঁদুর থেকেই এই রোগ ছড়ায়। ইহুদীদের না মেরে ইঁদুর মারলে কি এই মহামারী ঠেকানো যেতে পারে?

****
১৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৩৫০
++++++++++++++++

আজ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। কাউন্টকে দেখে চলে আসছি, একজন বৃদ্ধা দাসী এসে বলল, কাউন্টের স্ত্রী আমার সাথে দেখা করতে চান।

বৃদ্ধার সাথে দূর্গের অন্দর মহলে ঢুকলাম। আগে এটা ভাবাও অসম্ভব ছিল। কিন্তু রোগের কল্যাণে এখন বাঁধা নিষেধ শিথিল হয়েছে। আর স্বয়ং কাউন্টই মৃত্যু শয্যায়।

কাউন্টের স্ত্রীকে দেখে চমকে গেলাম। এরকম রূপসী মহিলা আমি আগে দেখিনি। যে সামনে থাকলে, চোখের পাতাও ফেলা কষ্টকর। ভাগ্যিস আমি এই বিচ্ছিরি মুখোসটা পরে আছি।

উনি বৃদ্ধাকে হাতের ইসারায় চলে যেতে বললেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার স্বামীকে কেমন দেখলেন?”



বললাম, “ভালো নয়। অসুখ অনেক ছড়িয়ে গেছে।”

মহিলার মুখের ভাব বিশেষ পরিবর্তন হল না। তিনি বললেন, “চিকিৎসকরা অন্যের কথা গোপন রাখেন। আমার জন্য গোপনে একটা কাজ করে দিতে পারবেন?”

আমি অন্যমনস্ক ছিলাম। ভাবছিলাম, এমন রূপসী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কি করে একজন অন্য নারীর প্রতি আসক্ত হয়? তার উপর অত্যাচার চালিয়ে তাকে হত্যা করতে পারে?

মহিলা বললেন, “হেই ডক্টর, আপনি কি ভাবছেন? স্বামীকে গোপন করে কোন কিছু করা অন্যায়, বিশেষ করে স্বামী যখন মৃত্যু শয্যায়? তাহলে জেনে রাখুন আমার পতিদেবতা একজন জানোয়ার।”

আমি বললাম, “সেটা আমি আগে থেকেই জানি।”

মহিলাদের অসীম ক্ষমতা। বিশেষত তিনি যদি রূপসী হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহিলা আমার স্ত্রীর খবর জেনে ফেললেন। বললেন, “আপনার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার কিছুই করার ছিল না। এই ঘটনার পর আপনি আমায় সাহায্য করবেন কিনা জানিনা। আমি এখান থেকে পালাতে চাই। আমার জন্য নয়। এই শিশুটির জন্য।”

এতক্ষণে আমি পালঙ্কে নিদ্রামগ্ন শিশুটিকে দেখলাম।

মহিলা বলল, “যত অর্থ লাগে দেব। আমাকে একটা ঘোড়ার গাড়ি যোগাড় করে দিন। ব্রিস্টলের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে আমার অনেক আত্মীয় স্বজন থাকে। আমাকে ওখানে যেতেই হবে। না হলে এই দূর্গে বদমাইশ লোকের অভাব নেই। স্বামী মারা গেলেই তাঁরা সবাই মিলে আমাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাবে।”

আমি বললাম, “আপ্রাণ চেষ্টা করব।"

***

১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৩৫০
+++++++++++++++



সবাই পালাচ্ছে। বাড়িতে অসুস্থদের ফেলে রেখে যে যার জীবন বাঁচানোর জন্য পালাচ্ছে। কিন্তু কোথায় পালাবে। সমগ্র ইউরোপ মহামারির কবলে। এমন কি খবর পাচ্ছি আফ্রিকার উত্তরাংশে, চিন ও সুদূর ভারতবর্ষেও নাকি এই মহামারিতে জনপদের পর জনপদ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বরঞ্চ ঐ পালাতে চাওয়া লোকগুলি নতুন নতুন জনপদে মহামারি ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কাউন্টের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। জ্বরে বেঘোর হয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে প্রলাপ বকছে। আমি চাইছি ও আরও কটা দিন বেঁচে থাকুক। এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুক।



একটা এক্কাগাড়ি ঠিক করেছি। চালক বিশ্বস্ত। কিন্তু জানিনা শেষ অব্দি মরিয়ম তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে কিনা। সারাদেশেই আইন শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। প্রায় অর্ধেক লোক মহামারিতে মারা গেছে। বাকি অর্ধেক লোক যেন আতঙ্কে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। চুরি, ডাকাতি, খুনো খুনি, ধর্ষণ এসব খুব সাধারণ বিষয়। শাস্তি দেওয়ারও কেউ নেই। তাহলে কি মানব সভ্যতার শেষদিন এসে গেল। একি তাহলে প্রকৃতির প্রতিশোধ।

*****
১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৩৫০
++++++++++++++++

রাত বারোটার সময় নদীর ধারে মরিয়ম হাজির হলেন। ওনার মুখ রেশমী রুমালে ঢাকা। কোলে ঘুমন্ত শিশু। আমি মশাল হাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গায়ে আগে বলে রাখা কথামতো সবুজ জামা।

উনি আগে আমাকে প্রতিবারই দেখেছেন চিকিৎসকের উদ্ভট পোষাকে। মশালের আলোয় প্রথমবার আমার মুখ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বললেন, “আপনারতো বয়স খুবই কম। ডাক্তারের যে এত অল্পবয়স্ক হতে পারে জানতাম না।”

আমি বললাম, “তাড়াতাড়ি করুন। জায়গাটা ভালো নয়। একদল ইহুদী তাড়া খেয়ে নদীর ধারের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের এখানে পেলে ওরাও ছেড়ে কথা বলবে না।”

আমি মরিয়মের হাত ধরলাম। যেন সদ্য ফোঁটা চাঁপা ফুলের পাপড়ি। অনেকদিন বাদে কোনও নারীর হাত ধরে হৃদপিণ্ডের গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। মশাল নদীর জলে ছুঁড়ে ফেললাম।

মরিয়ম এক্কা গাড়িতে উঠলেন। এখনও আমার হাত ধরে রেখেছেন। বললাম, “এবার রওনা দিন। হাতটা ছাড়ুন।”



“যদি না ছাড়ি?”

“কি পাগলামো হচ্ছে!”

“পাগলামো নয়। আপনিও চলুন আমার সাথে। আমি একা মেয়ে। কোথায় ভেসে যাব ঠিক নেই। আপনি সেই ঝড় আটকাতে পারবেন। কথা দিচ্ছি আপনার স্ত্রীর সাথে যে অন্যায় হয়েছিল, ভালোবাসা দিয়ে আমি তা ভুলিয়ে দেব।”

শেষ কথায় আমার ঘোর কেটে গেল। এত সহজে সেই অভাগিনীকে ভুলে যাব আমি। একজন স্বর্গের অপ্সরার জন্য আমি ভুলে যাব সেই সাধারণ দেখতে মাটির মেয়েটিকে। বললাম, “আপনি মারাত্মক লোভ দেখাচ্ছেন। কিন্তু তা সম্ভব নয়।”

“কেন?” মরিয়ম আরও জোরে আকড়ে ধরলেন আমার হাত।

“কারণ...” করুন হেসে বললাম আমি, “কারণ... আজ সকালেই আমার কুঁচকিতে কালো মত বেশ বড় একটা আব হয়েছে।”



সাথে সাথে মহিলা আমার হাত ছেড়ে দিলেন। চিৎকার করে চালককে বললেন, “গাড়ি ছোটাও।”

মনে মনে হাসলাম। তুমি ভালোবাসতে জানো না রূপসী। ভালোবাসা অত সহজ নয়। সামান্য মিথ্যে কথাতেই তুমি অমন চমকে উঠলে?

আমার এখন অনেক কাজ। বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকলাম। আবার চিকিৎসকের ঐ উদ্ভট পোষাক গায়ে চাপাতে হবে। তারপর বাড়ি বাড়ি যাব। বলব রোগাক্রান্ত মানুষটিকে আলাদা ঘরে রাখতে। ডাক্তার ছাড়া তার ঘরে যেন কেউ না ঢোকে। আরও বলব, ইহুদীদের মেরে কোনও লাভ নেই। বরঞ্চ তোমরা সবাই মিলে ইঁদুর মারো। মেরে মেরে মেঠো ইঁদুরের বংশ শেষ করে দাও। তাহলে হয়ত ঠেকানো যাবে এই মহামারীকে।

আমি চিকিৎসক। সকলে পালিয়ে যাক, আমাকে শেষ অবধি থাকতে হবে রোগীদের পাশে।

ভোর হয়ে এসেছে। হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেলাম কচি কণ্ঠের গান
“Ring-a-ring-a-roses
A pocket full of posies,
Ashes! Ashes!
We all fall down…”

গোলাপি দাগ চাকা চাকা (প্লেগের প্রথম লক্ষণ)
পকেট ভর্তি সুগন্ধি ফুল, (মিয়াসমার প্রভাব কাটাতে)
ছাই... ছাই...
আমাদের কারো নিস্তার নাই।


(লেখাটি ভারতীয় লেখক ডাঃ ঐন্দ্রিল ভৌমিকের লেখা, এত অসাধারন গল্প মহামারীর ওপর আমি পড়ি নি। সবার সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে না পেরে দিয়ে দিলাম)

ছবিঃ অন্তর্জাল
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০২০ সকাল ৯:২৬
৩২টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন মসজিদের কাজ শুরু করলাম

লিখেছেন প্রামানিক, ২৫ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

আলহামদুলিল্লাহ্, নতুন মসজিদের কাজ আজ থেকে শুরু হলো। আজ সকাল দশটায় গ্রামের কয়েকজন ধর্মপ্রাণ উদ‍্যোগী মানুষ নিজ উদ‍্যোগেই মাটি কেটে দিয়েছে।

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর পূর্বে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসাহাসি থেকে সাফল্যের ইতিহাস: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৫২



এক সময় অনেক সমালোচনার মুখে ছিল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (সাবেক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১)। তখন অনেকেই বলেছিল, এত টাকা খরচ করে এসব করে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু আজ ধীরে ধীরে সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×