somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি বেকার উপাখ্যান

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


চাকরীর পরীক্ষাটা খুব একটা ভাল হয়নি। না টেকার সম্ভাবনাই বেশি। একেবারে উদ্দেশ্যহীন নয় তবুও খানিকটা মন খারাপ করে পকেটে হাতদুটো পুরে দিয়ে হাটছিলাম।হতাশা নয়, হতাশা বিষয় টা আমার ভেতর এখন খুব একটা কাজ করে না। তবে আগে একসময় বড্ড হতাশাগ্রস্থ ছিলাম। রাতদিন হতাশায় মগ্ন থাকতাম। এখন আর খুব একটা হতাশ হই না। বেঁচে আছি এতেই অনেক সন্তুষ্ট আমি। রাতে খাবার টা সেরে একা রেল স্টেশনে বসে থাকার অভ্যাস অনেক দিনের। ভাগ্যহীন সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের শীতের রাতে ছেড়া কাথা মুরি দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখতাম আর ভাবতাম নিজের অবস্থান টা। মনে মনে বলতাম, ভালোই তো আছি। দুটো টিউশনি আর হাজার পাঁচেক টাকা মাইনে। খারাপ কি? অন্তত চারদেয়ালের ভেতর একটা ভাঙাচোরা ছাদের নিচে তো ঠাই হয়, কিন্তু ওদের তো তাও হয় না। এসব নিয়ে চিন্তা করতে করতে কাটিয়ে দিতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু এখন আর খুব একটা চিন্তা করা হয় না। চিন্তার নাকি বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। বাস্তবে না ঘটা যে কোন ঘটনাই মূল্যহীন। অন্তত অস্তিত্ববাদীরা তো তাই বলে। ওই রেল স্টেশনে শুয়ে থাকা মানুষরাই আমাকে হতাশা থেকে খানিকটা মুক্তিতে সহায়তা করেছিল। এ দিক দিয়ে আমি ওদের প্রতি কৃতজ্ঞই বটে।
হাঁটতে হাঁটতে একেবারে বাসার সামনে চলে এলাম। এ শহরেই একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে আমি থাকি। তাতে অবশ্য রান্নাঘর ও বাথরুম এটাচড। এ শহরে আমার কোন বন্ধু নেই। যাদের সাথে সখ্যতা ছিল তারাও এখন সবাই চাকরী ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। সামাজিক অবস্থানের প্রতিযোগিতায় ওরা মত্ত। আমি ওদের সাধুবাদ জানাই। আমি অবশ্য ওদের মত হতে পারিনি কিংবা হতে চাইনি অথবা না হতে পেরে আমি ওদের দল থেকে ছিটকে গিয়ে এখন হতাশায় এমন কথা বলছি। না না হতাশা নয় হয়তোবা হিংসা, অবশ্য ব্যাপারটা হিংসা হবার সম্ভাবনাও কম কারণ আগে আমি অনেক হিংসা করতাম তাই হিংসার অনুভুতিটা আমার জানা আছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে স্কুলের ফার্স্ট বয় মকবুলকে আমি অনেক বেশি হিংসা করতাম,কিছুতেই ওকে টপকানো সম্ভব হতো না। আমার মনে আছে কায়সারকে আমি অনেক বেশি হিংসা করতাম কারণ ও আমার চেয়ে খেলাধুলায় অনেক বেশি ভাল ছিল। এখন অবশ্য খুব একটা হিংসা করা হয় না। রাতে এলাকার মাঠটায় একা শুয়ে থাকতাম আর আকাশের প্রজ্বলিত নক্ষত্রদের কথা ভাবতাম। শুনেছি সূর্যের থেকেও অনেকগুণ বড় নক্ষত্রের অস্তিত্ব আছে। ওদের তুলনায় তো আমি একেবারে অনু পরমানুর থেকেও ক্ষুদ্র একটি সত্ত্বা , আমার হিংসা করার মত আছেই বা কি?
বাসায় এসে হাত মুখটা ধুয়ে সবজি আর ডাল ভাত দিয়ে দুপুরের খাওয়া টা সেরে নিলাম। শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজটা পড়ছিলাম ঠিক তখনই মোবাইলটা বেজে উঠলো। দেখলাম ছোট মামা ফোন করেছেন।
- আসসালাম ওয়ালাইকুম মামা।
- -আলাইকুম আসসালাম, মিঠু তোমার জন্য একটা সুখবর আছে।
- মামা এক মিনিট অপেক্ষা করুন।
- কি?
- অনেকদিন সুখবর পাই না । তাই সুখবর টা পাবার আগে একটু ওযু করে আসি।
- -ধুর মিয়া , তুমি ইদানিং দেখতেসি সব কিছুতেই একটু বেশি বেশি কর। পাগল হবার আগের লক্ষন। ওযু পরে করলেও চলবে আগে আমার কথা টা শুনে নেও।
- জি মামা বলেন।
- একটা প্রাইভেট কম্পানিতে তোমার চাকরীর ব্যবস্থা করসি। একাউন্টেন্ট এর চাকরী। বেতন যদিও খুব একটা বেশি না তবে বেতন বর্ধনশীল, দিন যত যাবে বেতন তত বাড়বে।
- আলহামদুলিল্লাহ মামা, এই দুঃসময়ে বড্ড একটা সুখবর দিলেন। বেতনের দরকার নাই মামা একটা সামাজিক তখমা তো গায়ে লাগলো।
- হুম উচিত কথা বলেছ মিঠু। রাতে একফাকে বাসায় আইসো।
- জি মামা আমি রাতে টিউশনি টা শেষ করেই আপনার সাথে দেখা করব।
- তাইলে এখন রাখলাম?
- জি মামা, আসসালাম ওয়ালাইকুম।

ফোনটা রেখেই প্রথমে আমি যে কাগজে জাতীয় পত্রিকায় পাঠাবো বলে প্রতিবেদনটি এতদিন ধরে লিখছিলাম সেই কাগজটাকে ম্যাচের আগুনে পুড়িয়ে সে আগুন দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম । কম দামি সিগারেট, তবে যেহেতু চাকরি হয়েছে এর পর সিগারেটের স্ট্যান্ডার্ডটা একটু হাই না করলেই চলছে না। এখন শুয়ে শুয়ে পুড়িয়ে দেওয়া কাগজের ভেতর লিখে চলা কথা গুলো নিয়ে চিন্তা করছিলাম । মনে আছে ওতে অনেক প্রতিবাদের কথা লেখা ছিল, একজন বেকারের দুর্দশার কথা উল্লেখ ছিল। পুড়িয়ে দিলাম। ভালোই হয়েছে। এখন তো আমি চাকরীজীবি।
একঘুমে রাত দশটা বাজিয়ে দিলাম। টিউশানি তে যাবার আর প্রয়োজন নেই । মামার বাসায় আর যাওয়া হবে না আজ। অনেকদিন পর আজ বেশ স্বস্তির একটা ঘুম হল। মামাকে ফোন দিয়ে বললাম যে আজ আর আসা হবে না ।
বাসার নিচের দোকানে বসে একটা চা আর একটা সিগারেট খাচ্ছিলাম । ওমনি রতন পাগলার সাথে দেখা। এ এলাকায় সবাই ওকে রতন পাগলা বলেই চেনে। লোকটা আবার আমার সাথে খুব একটা পাগলামো করে না, তাই ওকে পাগলা বলে ডাকাটা যদিও আমার উচিত নয় । যাই হোক, আমার পাশেই এসে বসলো রতন।
-কি হে মিঠু সাব, আছেন কেমন?
- হ্যাঁ ভালো। একটা চা খান?
-তা খাওয়া যায় তবে তার আগে একটা কথা ছিলো।
-কি কথা?
- এই প্রথম তোমারে বেনসন খাইতে দেখতাসি। চাকরী হইসে মনে হয়?
- আরে আপনেরে মানুষ পাগল যে কেন কয় বুঝিনা ? আপনি তো একজন সুস্থ মানুষের থেইক্যাও বুদ্ধিমান। এইযে একেবারে শার্লক হোমস এর মত কইরা বুইঝ্যা ফালাইলেন যে আমার চাকরী হইসে।
- কোন শালা বাইঞ্চোদ আমারে পাগল ডাকে?
- না না কেউ ডাকে না।
- যে শালা ডাকে ও পাগল ওর গুষ্টি পাগল। খামুনা চা। গেলাম। আমার মাথা গরম হইয়া গেসে।

এই বলে রতন যথারীতি উঠে চলে গেল সোজা মাঠের দিকে। আমি যখন মাঠে একা একা শুয়ে তারা দেখতাম তখন মাঝে মধ্যে রতনও আমার পাশে শুয়ে আকাশ দেখতো, তারাদের দেখতো, নক্ষত্রদের দেখতো । এখন ওর এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে আর আমার অতীতে।
আমার ব্যক্তিগত ডাইরীর পাতায় প্রতিবাদী কলমের আস্ফালনে লেখা এমন অনেক কথাই আছে যা আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ ছিলো। সমাজ পালটে দেবার কথাও ওতে লেখা আছে। লেখা আছে রেল লাইনের বস্তিতে শুয়ে থাকা অগণিত মানুষের কথা। ওদের বেঁচে থাকার গান, কবিতা। আমার দুঃসময়ের সঙ্গীদের কথা , শহরতলীতে চড়ুই পাখির অস্তিত্ত্ব সংকটের কথা।
এবার ভেবেছি একটা নতুন ডাইরী কিনবো। পুরনোটাকে একটা ডাস্টবিনে ফেলে দেবো। ওটা রেখে এখন আর লাভ নেই, জৈবিক তাড়ণায় এমন অনেক কথাই তো মানুষ লেখে কিংবা বলে, সাময়িক ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বাস্তবে রূপ না পেলে তার কি লাভ? ভেবেছি এবার আমি স্বপ্ন দেখবো , উঁচু ইমারত গড়ার স্বপ্ন, একটা দামী গাড়ির স্বপ্ন।
প্রায় এগরোটা বাজে। রাতের খাবার টা মনু কাকার হোটেলে গিয়ে সেরে নেবার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম । মনু কাকার হোটেল যেতে রাস্তায় স্টেশনটা পড়ে। স্টেশনটা পেরিয়ে এসে খেয়াল হল আজ শুয়ে থাকা মানুষদের চোখে পড়েনি । রাস্তায় হঠাৎ রতন পাগলার সাথে আবার দেখা। আমাকে দেখে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল
- কি মিঠু সাব ,আইজ ইস্টিশনের গরীবগোরে চোক্ষে পড়ল না? পড়ব কেমনে তোমার তো কাম হইয়াই গেসে। যাই আরেক নতুন মিঠুরে খুজি গিয়া।
এই বলে মিঠু চলে গেল। একসাথে খাবার খাওয়ার প্রস্তাব দিলাম। কিন্তু পাগলা টা কেন জানি ‘নতুন মিঠু খুজি গিয়া’ ‘নতুন মিঠু খুজি গিয়া’ বলতে বলতে চলে গেল আমার কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে। আমিও হেটে চলে গেলাম মনু কাকার হোটেলে। রাতের খাবার টা বেশ জম্পেশ ভাবেই সেরে নিলাম। এবার আরেকধাপ শান্তির ঘুম দেব।
.......................................

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৫
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯



৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশ জুড়ে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তার ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। সংবাদমাধ্যম ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×