"নীল ডাউন হইয়া পাছা উচা কইরা ধর, আমি ...পুট*র মধ্যে ছাড়া পিটাইয়া মজা পাইনা"।
উপরের কথাটা একজন শিক্ষকের কমন কথা। যারা বাধ্য হয়ে পাছা উচায়ে ধরতো তাদেরকে এই কথা বলতেন না। বাকী সব ষ্টুডেন্টের জন্য এই বাক্যটা উনি প্রত্যেকবার রিপিট করতেন। আর অমানবিক ভাবে পিটায়ে পশুর মত আনন্দ পেতেন। ১৯৯২ থেকে ২০০০+ সময়কাল পর্যন্ত যারা কুমল্লার ব্রাহ্মণপাড়া ভগবান সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়েছেন তাদের ভুলার কথা না। শিক্ষকের নামটা বলছিনা। কারন এই নামের অন্য ভালো মানুষগুলো মনে কষ্ট পাবেন। আর নামটা বলাও আমার মূল উদ্দেশ্য না।
ক্লাশ সিক্সে ভর্তী হলাম এই স্কুলে। প্রথম দিনই এই স্যার ক্লাশে ঢুকলেন এক মুঠ কাবলী বুট হাতে নিয়ে। গায়ে কটকটা লাল রঙের জরিওয়ালা শার্ট। কুৎসিত হাসি হাসতে হাসতে বুট চাবাতে লাগলেন। এমনিতেই গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরের স্কুলে পড়তে গিয়েছি। কলিজায় পানি নাই। ভাবলাম হাই স্কুলের শিক্ষরা কি এমন হয়!
রোল কল করলেন। বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের শুরুর আর শেষের পৃষ্টা বলে দিলেন। প্রায় ১০ পৃষ্ঠার মত হবে। বল্লেন, দাড়ি কমা শুদ্ধা মুখস্থ কইরা আইবি। যারা না পারবি ১০ টা কইরা ডাবল-জালি বেতের বারি পাছার মধ্যে নিবি। আমি... ছাড়া মজা পাইনা। সাথে গর্ব করে বল্লেন, সবাই উনাকে অংকের জাহাজ বলে। আমি "অংকে মাষ্টার্স" একটা ছোট গল্প লেখেছিলাম। নামকরনের ক্ষেত্রে এই অংকে জাহাজ শব্দটা আমার মাথায় ছিলো।
আমরা ছেলে-মেয়েরা একত্রে ক্লাশে বসতাম। দুই সারি ছেলে, এক সারি মেয়ে। পরের দিন ক্লাশে ঢুকলাম। সবার মনের মধ্যে আতঙ্ক। স্যার ক্লাশে ঢুকেই রোল কল করলেন। পশুর মত মুচকি মুচকি হাসছেন। যেন কিছু একটা অপেক্ষা করছে। রোল কল শেষ করেই বল্লেন, হে হে হে যাদের একটা দাড়ি, কমাতেও ভুল হইবো তারা তারাও দাড়া। আর বাকীরা বইয়া থাক। আমার পাশের ছেলেটা কিছুক্ষণ বসে থাকার পর, বিড়বিড় করে কি জানি আওরালো। তারপর ভয়ে তার কনফিডেন্স লেভেল মনে হয় একটু কমে গেলো। তাই শেষমেস দাড়িয়ে কাঁদতে লাগলো। পয়তাল্লিশ মিনেটের ক্লাশ। ক্লাশের কাউকেই বাদ দেওয়া হলো না। এমনকি মেয়েদেরকেও না।
হাতে গুনা কয়েকটা ছেলে-মেয়ে শুধু মাইরের বাইরে ছিলো।
আমি জানি একই স্কুলের আমার অনেক সহপাঠি আমার সাথে কানেকটেড। তারও এই লেখা পড়বে। বাড়িয়ে লিখলে নিশ্চয়ই তারা শুধরে দিবেন।
মানিক নামের একটা ছেলের কথা খুব মনে পড়ে। মোটাসোটা গড়ন। দেখলেই মনে হয় তার চৌদ্দ গোষ্ঠির কেউই কোনদিন স্কুলে আসে নাই। মাথায় তেলটেল মেখে, ময়লা একটা জামা পড়ে ক্লাসে আসতো। কিন্তু ছেলে বড় ভোলাভালা। এই ছেলেটা বহু মাস কাটায়ে দিলো স্যারের মাইর খেয়ে খেয়ে। কোন দিনও পড়া সে মুখস্থ করে আসতে পারতো না পৃষ্ঠা মেপে। মাঝেমাঝে মুখস্থ করতো ঠিকই কিন্তু ভয়ে তা ভুলে যেত ক্লাশে এসে। আমার মনে আছে, মানিককে যখন মারতে তখন লাফ দিয়ে লাফ দিয়ে মাইর দিতো। আর বলতো, ইশশিরে, তোরে পিটাইয়া মজা পাইরে.. মজারে মজা...। স্যারের পিটার ভয়ে ছেলেটা আর স্কুলেই আসলোনা কোনদিন।
কয়দিন পর শুরু করলেন আরেক জুলাম। ব্যাকরনের সাথে অংক ক্লাশও তিনি নিতেন। অংক দিয়ে দিতেন অনেকগুলো। করে আনতে না পারলে প্রতি অংকে পাঁচ টাকা জরিমানা। তখন হাত খরচই পাই প্রতিদিন দুই টাকা। দুপুরের টিফান দুইটা সিঙ্গারা হয়ে যায় এতে। এই মহান শিক্ষকের ক্লাশে কোন দিন পড়াশুনা হতো না। পৃষ্টা মেপে পড়া দিতেন, অংকের হোম ওয়ার্ক দিতেন। যারা না পারবে তারা পিটানি খাবে, যারা না করে আনবে তারা জরিমানা দিবে। জরিমানাটা অবশ্য বেশীদিন চালাতে পারেন নাই। কারন আত্মঘাতী টাইপ এক ষ্টুডেন্ট আমাদের ব্যাচ এর। সে নাকি একদিন স্যারের সাইকেল থামিয়ে দুইখানা চড় মেরে দিয়েছিলো রাজপথে। এরপর এই ছেলে আর কোনদিন স্কুলে আসে নাই।
যাই হোক অনেক বল্লাম। এর পর বলতে গেলে হয়ত এত বছরের পুরনো ঘিন্নাগুলো একটু বেশীই বড় করে বলা হয়ে যেতে পারে।
এত কথা কেন বল্লাম? আজই একটা রিপোর্ট দেখলাম, বিশ্বের এক হাজার ইউনিভার্সিটির মধ্যেও বাংলাদেশের কোন ইউনিভার্সিটির নাম নেই। যাদের স্কুলে ঐ শিক্ষকের মত শিক্ষক থাকে। ক্লাশে কোনদিন পড়াশুনা হয়না, শুধু বেতের বারি আর পড়া দেওয়া। পড়ানোও না, পড়া আদায় করাও না। তাদের মত ছাত্রদের কাছে কতটাই আশা করা যায়। আর শিক্ষাব্যাবস্থার কথা না হয় নাই বল্লাম। কারন অতটা শিক্ষিত আমি নই।
মানিক ছেলেটা আমার বন্ধু ছিলোনা। জাষ্ট ক্লাশমেট। বাড়ী নাইঘর গ্রামে ছিলো এতটুকু মনে আছে। আসলে তখন বাড়ী থেকে দুই কিলোমিটার দূরের একটা স্কুলে গিয়ে পড়ার মত মানসিক চাপটাই অনেক বড় ছিলো। বন্ধু পাতানির মত মনের অবস্থা ছিলো না। কিন্তু এতটা বছর পর মনে হচ্ছে, আহারে মানিকটাকে যদি আমার বন্ধু করতাম তাহলে হয়ত তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে মাইর না খাওয়ার মত পজিশানে নিয়ে যেতে পারতাম। তাহলে সে স্কুলভীতি নিয়ে পড়াশুনা ছাড়তোনা।
বিদ্র: আমাকে কোনদিনই পড়াশুনার জন্য ঐ স্যারের মাইর খেতে হয় নাই। তবে ক্লাশ এইটে যখন পড়ি তখন রেডিও বাংলাদেশের একটা মাসিক পত্রিকার আমি সাবস্ক্রাইবার ছিলাম। এই একটা ম্যাগাজিন উনি চেয়েছিলেন। আমি দেইনি বলে আমাকে বেদম মাইর মেরেছিলেন। বহু দিন পিঠের ও ... 'র ফাঁটা দাগ কেউ দেখে ফেলবে ভেবে খালি গা হইনি।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০১৪ বিকাল ৫:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




