
একটা বয়েস গেছে, যেসময়ে সাহিত্যের কিছু চরিত্রের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। প্রেম, ভালোবাসা, না পাওয়ারও যে একটা চাপা কষ্ট থাকে, কিংবা থাকে পাওয়া জিনিসটাকে হারিয়ে ফেলার ভয় … এগুলো ভিজ্যুয়ালাইজ করা শুরু করি এই চরিত্র গুলোর মধ্য দিয়েই। যদি বলেন প্রেমের কথা, হ্যা … নিঃসন্দেহে প্রেমে পড়েছি। প্রেমে পড়েছি অঞ্জন দত্তের বেলা বোস,জয়িতা, রমা, মালা কিংবা নচিকেতার নীলাঞ্জনার। বেলা বোসের টেলিফোনের ওপাশ থেকে ফুপিয়ে কেদে ওঠাটা সেদিন আমাকেও ভাবিয়ে তুলেছিল। আজ যে চরিত্রটিকে নিয়ে লিখব সে ‘মাধবীলতা’… অনিমেষের মাধবীলতা। আমার কাছে সমরেশ মজুমদারের সবচে অদ্ভুত সৃষ্টি এটাই মনে হয়, ইভেন পুরো বাংলা সাহিত্যেও এজ ওয়েল, যদি আমি সাহিত্যে খুব একটা ডুবে থাকি না।তবে যতগুলো পড়েছি আমাকে মাধবীলতাই সবচেয়ে বেশি আকর্ষন করেছে।
আপনি চিন্তা করতে পারছেন একটা মেয়ে আপনার সাথে তর্ক করছে আপনার রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে, আবার সেটা যদি হয় কম্যুনিজমের মত গভীর একটা বিষয় …এবং রীতিমত আপনি থতমত খাচ্ছেন আপনার রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে !!! সে আপ্নাকে জিজ্ঞসা করছে ভিয়েতনামের যুদ্ধে ব্যাপারে, আপ্নার সাথে তর্ক করছে যে প্রেসিডেন্সি কলেজে বসে বিপ্লব মিছিল করলে ভিয়েতনাম বাসী আদৌ উপকৃত হবে কিনা। মেয়েটা একজন পোড়া কমিউনিষ্টকে প্রশ্ন করছে “আপ্নারা তো রামমোহ, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথদের reactionaris বলে মনে করেন… না? ”। আমি জোড়হাত করে বলছি ভাই, ব্যাপারটাকে বাস্তবে আমি কখনো শেপ দিতেই পারিনি। হতে পারে কারনটা আমার মফস্বল কেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভংগির জন্য তবে ভেতর থেকে বলছি মাইরি, আমার কেন জানি মনে হয় বুদ্ধি-বৃত্তির ব্যাপারটা মেয়েদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে কেমন জানি লোপ পেয়ে যায়। জানি অনেকে মনে মনে গাল-মন্দ দিবে, হয়ত নিজেও বুঝছি কথাটার কোন ভিত্তি নেই, ফাজলামির সুরেই বললাম। তবুও ব্যাপারটা কেন জানি এমনি দাড়িয়েছে। মেয়েদের ঝগড়ার ব্যাপারটা আমার বেশ ভাললাগে, ইভেন একবার আমার এক বিজ্ঞ সহপাঠিনী ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমাকে পুরো ব্যাচের ভিতরে ঝগড়ুটে উপাধিও দিয়ে দিয়েছিল। যাই হোক আপু সমাজের এই ঝগড়া কিংবা তর্কের কৌশলে আমি কন্ঠের কম্পাংক আর অবেগ-অনুভূতির চাপাচাপিই বেশি দেখেছি, বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগ সেখানে নেহাৎ কম থাকে। হ্যা বলা হতে পারে, টিভির টকশো বা বিভিন্ন রিয়েলিটি শো এর যে সকল মেয়েরা অংশ নেন তাদের কথা, আমি মনে করিয়ে দিই মাধবীলতা কিন্তু সেলেব্রেটি টাইপের কেউ নন, কলকাতার পাশ্ববর্তী কোন অর্ধ-নগরী থেকে রোজ ট্রেনে চেপে আসা খুব সাধারন একটা মেয়ে। যদি সেই চরিত্রটিকে ভিজ্যুয়ালাইজ করতে যায় তবে মেয়েটির চুল গুলো থাকবে বেনি করা, খোপা নয়, হাতে সস্তা চিকন কাচের চুড়ি কপালে লাল টিপ । লম্বা স্লিভের ব্লাউজ, ঘাড়ে সাদামাটা একটা ভ্যানিট ব্যাগ, পরনে একটা মাড় দেওয়া শাড়ী … সেটা আয়রন করা থাকেনা। পায়ের সেন্ডের টা দিয়ে অযত্নের কিছু পায়ের আংগুল উকি মারে, মুখে কেমন জানি একটা মলিনতা সবসময় ভর করে থাকে। না … মেয়েটির ভিতরে নিজেকে উপস্থাপনের কোন তাড়া নেই, নেই স্বচ্ছ কাপড়ের মধ্য দিয়ে শরীর কিংবা অন্তর্বাস প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা।
আমাদের টিপিক্যাল চিন্তা ভাবনার বাইরে আরো যে আরেকটা ব্যাপার লক্ষনীয় সেটা হল অনিমেষ-মাধবীলতার প্রেমের শুরুটা। ধরুন আপনি রাজনীতি করেন না, তবুও দেশ নিয়ে আপ্নার একটা ইউনিক চিন্তা থাকাটাই স্বাভাবিক তেমনি প্রেম করুন বা না করুন , দু-একটা মতামত আপনার থেকেই যায়। সেই জায়গা থেকেই বলছি প্রেমের রেজিষ্ট্রি “প্রথাটার” আমি একদম বিপক্ষে, আচ্ছা “ভালোবাসি” বলতেই হবে ?? এটা কোন কথা !! এটা যেন একটা স্টাম্প পেপার দিয়ে দখল নিশ্চিত করা হল একেবারে। আর তাছাড়া এই জিনিসটা একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে বলে কিভাবে আমি ভেবেই উঠতে পারিনা
অনিমেষকে মাধবীলতা তাদের সম্পর্ক শুরুর আগে থেকেই প্রশ্ন করত “আপনি কি নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করেন ? ”। এখানে তার সুচারু একটা পর্যবেক্ষন ক্ষমতার নমুনা পাওয়া যায়। কারন অনিমেষ মাধবীলতার গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ও ভালোবাসত আবার শ্রেণীসংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি নিয়ে ভারী লেকচারও দিত। পরে অনিমেষকে মাধবীলতা উপাধি দিয়েছিল ‘রোমান্টিক বিপ্লবী’। আবার এই স্পষ্টভাষী জেদি মেয়েটাই একসময় লক্ষীটাইপের হয়ে গেল, সে ভালোবাসল অনিমেষকে… শুধু মন দিয়েই নয়, শরীর দিয়েও। কোথাও যেন পড়েছিলাম যে মেয়েটা একটা ছেলেকে মন দিতে পারে, তাকে খুব সহজেই শরীর টাও দিতে পারে। সমরেশ মজুমদার ঐ বাক্যটার একটা ছাপ রেখেছেন কালবেলাতে। বিবাহ বহির্ভূত ভাবে তাদের একটা শারিরীক সম্পর্ক ও তৈরী হয়, যার ফসল ছিল তাদের সন্তান অর্ক। পরে নক্সাল সন্ত্রাসী হিসেবে ধরা পড়ে অনিমেষ, আর অন্তসত্তা অবস্থায় জীবন যাপনের চরম একটা লড়াই করে মাধবীলতা। একসময় অনিমেষ মুক্তি পেল… পংগু অবস্থায়। আর সেই প্রতিবন্ধী অনিমেষ আর অর্ককে নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিল বেলঘোরিয়া থেকে ট্রেনে চেপে আসা এম.এ পাশ সাদাসিদা মাধবীলতা নামের মেয়েটি।
না… আমি ভুলে যায়নি আমি উপন্যাসের একটি চরিত্রকে নিয়ে লিখছি। কিন্তু স্বপ্ন কিংবা কল্পনার কি কোন সীমা থাকে বলুন ? কোন রশি থাকে তাকে লাগাম দেবার জন্য ? তেমনি সমরেশ মজুমদারের চিত্রায়িত এই চরিত্রটিও আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। হয়ত খুজে বেড়িয়েছি স্বপ্নের মাধবীলতাকে… হাতড়ে বেড়িয়েছি ঐ গুনগুলোকে। না পায়নি, মাধবীলতারা বোধহয় উপন্যাসেই সীমাবদ্ধ। তাদেরকে নিয়ে বোধহয় স্বপ্নই দেখা যায়, স্বপ্ন দেখাবার জন্যই তাদেরকে জন্ম দেন সমরেশ মজুমদাররা।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ২:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




