somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন নাবিকের গল্পঃ "সীমানা"

০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ১১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, নিকশ কালো অন্ধকার রাতের সাথে বৃষ্টির ঝিম ঝিম শব্দ। এইরকম বৃষ্টি ঝরা রাতে দোচালা টিনের ঘরে ঘুমানোর কি যে সুখকর সৃতি, যেন মায়াময় প্রকৃতির সুরেলা আহবান।তা যে কোন যন্ত্র সংগীত এর আদ্ধাতিক ক্ষমতা কে নিয়ে প্রশ্ন তোলে।হঠাৎ সাবিত্রীর ফোনে বৃষ্টির ঘোর থেকে বেরিয়ে আসলাম।ওর যে কি হয়,মাঝে মাঝে কারনে অকারনে রাত বিরাত ফোন করে বসে।আজকে আবার নতুন বাহানা,একটা  বৃষ্টির কবিতা শুনাতে হবে।বৃষ্টির ঘোর থেকে বেরিয়ে পরলেও এখন ও চোখজোড়া খুলতে পারিনি। একদম-ই চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না।যেন সহস্র তরুণীর বাধ ভাংগা আহবান এ ও চোখজোড়া খুলতে নারাজ।এই মুহূর্তে বৃষ্টির কোন কবিতাই মাথয় আসছে না।শুধু শ্রীকান্তের সেই বিখ্যাত গানটি মাথায় আসছে

 "আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ  বৃষ্টি, তোমাকে দিলাম................" 

বৃষ্টির আবেশ এর সাথে যন্ত্র সংগীত এর মুর্ছনা যে এতটা নিবিড় হতে পারে তা হয়তোবা এই গানটি না শুনলে বোঝা যেত না।যাইহোক, সাবিত্রী আমার খুব কাছের একজন বন্ধুর নাম,আমার ক্লাসমেট। ওর নামটা আমার-ই দেয়া।আমার খুব পছন্দের একটা নাম।আমি সব সময় ওকে সাবিত্রী বলেই ডাকতাম,কেন জানি ওকে দেখলেই সাবিত্রী নামটা খুব করে মনে পরত।দেখতে খুব যে সুন্দরী তা বলা যায় না।সাবিত্রী শ্যামা মেয়ে কিন্তু ওর চোখজোরা ছিল নীলাভ কালো টানা টানা।ওর সাথে আমার পরিচয় কলেজ জীবন এর শুরুতেই।আমাদের কলেজ জীবন এর পুরোটা সময় জুড়েই ছিল ও আর আমার বন্ধুতাপূর্ন দুস্টুমি তুখোড় আড্ডা আর সুস্বাদু ঝালমুড়ির মাঝে।

সাবিত্রী অনেক দুঃখী ছিল,ওর জমাট বাধা কষ্টগুলোর একমাত্র সংগী আমিই ছিলাম।সব সময় চাইতাম ওর মুখে হাসি দেখতে ওর কষ্ট গুলোকে ঘুম পারিয়ে রাখতে।ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে বেরুতাম মাঝে মাঝেই।অনেক সৃতিময় ছিল সেই দিনগুলি,বৃষ্টিতে ভেজা, ফাস্টফুড খাওয়া আর ও কত কি না করতাম।আমাদের বন্ধুত্ব দেখে কলেজের সবাই বাকা চোখে তাকাতো, হিংসা করতো,কিন্ত আমি তা কখনই গায়ে মাখতাম না।

একদিন ঘুরতে বেরিয়েছি, হঠাৎ করেই সাবিত্রী আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার ববন্ধুত্বপূর্ণ সব বিশ্বাস ভেংগে দিয়ে প্রপোজ করে বসে।আমি শুধু ওর দিকে তাকিয়ে কিছুই বলতে পারছিলাম না।ছল ছল চাহুনিতে যেন বিশ্বের সব ভালোবাসা উজার করার অপেক্ষা।

তারপর টানা দুইদিন ওর সাথে আমার কোন যোগাযোগ হয়নি।আমার কাছে যেন দুইদিন কে দুই বছর মনে হচ্ছিল। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে আমি কি করব।একদিক এ বন্ধুতা, ভালোবাসা আর অন্য দিকে ওকে হারানোর ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।তখন ই বুঝতে পেরেছিলাম যে ও আমার কতটা ভেতর এ প্রবেশ করেছে।আমি ওকে বুঝাতে চেয়েও পারিনি যে ওর আর আমার ধর্মের রথ ভিন্ন।আমরা চাইলেও এক সত্ত্বাতে বাধা থাকতে পারিনা। আমাদের দুজনার মাঝে রয়েছে বিশাল আকাড়ের সীমানা। কিন্ত ও কোন কিছুই বুঝতে নারাজ ছিল।সাবিত্রী আমাকে শুধু একটা কথাই বলেছিল যে,আমি তোর সাথে সারাটা জীবন কাটাতে চাই তা যে রাস্তায় হোক বা যে  ধর্মেই হোক না কেন।আমি পুরো বিস্মিত ছিলাম ওর ভালোবাসার পরিধি দেখে।ওর ভালোবাসা কে সম্মান জানাতে মাথা নত হয়ে এসেছিল।আর একটি বার ও চিন্তা না করে ওর হাতদুটো শক্ত করে ধরে বলেছিলাম ভালোবাসি। 

কলেজ জীবন এর প্রত্যেকটা দিন ছিল আমাদের কাছে আনন্দময়। ঈদ,পূজো তে অনেক মজা করতাম আমরা।সাবিত্রী আমার জন্য পূজোতে নানা রকম রান্না করে খাওয়াতো।ও অনেক ভাল রান্না করতে পারতো, অনেক টেস্টি আইটেম সব।খুব তারাতারি যেন শেষ হতে লাগল দিনগুলি। এইস এস সি তে আমরা দুইজনেই খুব ভাল রেজাল্ট করলাম। সাবিত্রী ঢাকা ভার্সিটিতে টিকে গেল,ও যে কি খুশী হয়েছিল,আবার ওর মনটা ও অনেক খারাপ করে দিয়ে আমি চলে গিয়েছিলাম চট্টগ্রামে।মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং এ চান্স পাওয়াতে আমি আর অন্য কিছু চিন্তা করলাম না।দুচোখ এ তখন অনেক স্বপ্ন ছিল,মেরিন এ থেকে অনেক দেশ ঘুরতে পারব,অনেক সম্মান, অনেক বেশি মাইনে,আর ও কত যে স্বপ্ন।

এই প্রথম আমারা দুজন দুজনের কাছ থেকে এতটা দুরে, তারপরেও আমারা সব সময় চাইতাম কাছাকাছি থাকতে। একবার এক পহেলা বৈশাখ এ সাবিত্রী আমার জন্য একটা সুন্দর পাঞ্জাবি বানিয়েছিল নিজ হাতে।আর সেই পাঞ্জাবি নিয়ে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য সোজা চট্টগ্রাম, কোন কিছু না জানিয়ে, পাগলী ছিল একটা।কি যে সুন্দর ছিল পাঞ্জাবিটা।যেন বৈশাখ এর সব আনন্দ, সব রং আমার গায়ে এসে লুটোপুটি করছিল। 

ইন্টার্নশিপ করার জন্য আমাকে সিলেক্ট করা হয়েছিল ইউরোপিয় একটি কম্পানিতে,জয়েন করতে হবে তুরস্ক তে।এই খবর পাওয়ার পর প্রথম দিকে আমি খুব উচ্ছাসিত ছিলাম।জীবন এ প্রথম বারের মত দেশের বাহিরে যাচ্ছি,কিন্ত যেদিন আমার ফ্লাইট ছিল সেইদিন খুব খারাপ লাগছিল সাবিত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে।ও অনেক কেঁদেছিল আমাকে জড়িয়ে ধরে। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমি অনেক কিছুই ছেরে চলে যাচ্ছি, আমার সাবিত্রী, আমার মা,আমার বাংলাদেশ কে।তবে পৃথিবীর যে দেশেই যাইতাম আমি সাবিত্রীর সাথে,ফোন এ কিংবা ফেসবুক এ ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতাম,চ্যাটিং করতাম।ওর জন্য আমাকে প্রতিনিয়ত সুন্দর সুন্দর পিক দিতে হইত ফেসবুকে।

তখন ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাস।শিপ নিয়ে যাচ্ছি স্পেন থেকে কানাডা, প্রায় ২০ দিনের প্যাসেজ, যাইতে হবে আটলান্টিক এর গহিন সমুদ্ররাশি অতিক্রম করে।ঠিক ২৩ শে ডিসেম্বর এ পৌছে যাই কানাডায়।বেকানকওর সিটি শহর এর রাস্তা ধরে হেটে চলেছি সাবিত্রী কে ফোন করব বলে।প্রচুর তুষারপাত হচ্ছে,তাপমাত্রা -২৫।তুষার এ আমার সমস্ত শরীর প্রায় সাদা,হিম শীতল এ যেন পা দুটো থমকে দারিয়ে যাচ্ছে বারংবার, কিন্ত আমার যে সাবিত্রীর সাথে কথা বলতে হবে।কয়েকবার ফোন করলাম ওকে কিন্ত ওর ফোন বন্ধ।মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল।ম্যাসেজ করলাম কিন্ত কোন উত্তর নেই।

পরে সাবিত্রীর এক ক্লোজ ফ্রেন্ড কে ফোন করে যা শুনলাম তাতে আমার হার্ট বিট প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগার।আমি বিশ্বাস ই করতে পারছিলাম না যে সাবিত্রী নামের মেয়েটি আর এই পৃথিবীতে নেই।আমার দুচোখ দিয়ে গরিয়ে পরতে থাকল অশ্রুধারা।সেই তুষার এর মাঝেই রাস্তারধারে বসেছিলাম সারাটা রাত্রি। যেন সমস্ত পৃথিবী মুখ গোমরা করে বসে পরেছিল আমার সামনে। 

আমাদের রিলেশনের কথা ওর বাবা-মা জেনে যাওয়ায় ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিল,কিন্তু সাবিত্রী হাজার ও চেষ্টা করে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছিল না আমি নেটওয়ার্ক এর বাইরে অথৈই সাগরে ছিলাম বলে।তাই বিয়ের দিন রাত এ সাবিত্রী ডিসিশন নিতে বাধ্য হয়েছিল আমাকে ছেরে চিরতরে চলে যাওয়ার।

মাঝে মাঝে বড্ড অপরাধী মনে হয়,ঐ দিনগুলি তে ওর পাশে থাকতে পারিনি বলে।নিজের অজান্তেই হয়তোবা আজ আমি নিজেই দোষী।খুব জানতে ইচ্ছে করে সাবিত্রীর শেষ মূহুর্তের আর্তনাদগুলো যা আজ ও আমাকে কাঁদায়।জানতে ইচ্ছে করে ওর চাওয়া গুলো,কষ্টগুলোর কথা,জানতে ইচ্ছে করে ওর সত্তা কে যা সমার্পন করতে পারেনি আমার কাছে। নাকি, অভিমান করেছিল আমার উপর ? খুব জানতে ইচ্ছে করে সাবিত্রীর শেষ দিনগুলির পার করে দেয়া সময়ের অভিপ্রায় কে।

আমি আজও খুঁজে বেড়াই আমার নিজের আমি কে।হাটতে চাই পুরনো সেই রাস্তায় যেখানে তুমি দারিয়ে আছো।আমার ইচ্ছে করে ব্যবচ্ছেদ করতে ধর্মের সীমানা নামক অভেদ্য আস্তরণ কে।নিজেকে মাঝে মাঝেই আবিস্কার করি ফুরিয়ে যাওয়া বিকেলগুলোতে,আর দারিয়ে থাকি অচেনা কালো সূর্যাস্তের সাক্ষী হব বলে।

জানো সাবীত্রি,এখন ও টুপ টুপ করে বৃষ্টি পরে রোজ রাতে,কিন্ত তুমি তো একদিন ও কবিতা শুনতে চেয়ে আমাকে আর ফোন কর না।জানো তোমার জন্য না দু'লাইন বৃষ্টির কবিতা লিখেছি। তুমি শুনবে না ?

"আজি অঝোর বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে,
পৃথিবীর সব ক্লান্তি।
তুমি আছো,তুমি নেই,
তাইতো আমার কান্না,
বৃষ্টি হয়ে ভুলে গেছে,
এ ধরার সব শান্তি ।                                
তুমি আসবেনা জানি,                          
ভিজবে না ওই বৃষ্টিতে আর।
কিন্ত মেঘের কান্না যে
ভুলে থাকা বড় ভার।"
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ১১:৫৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় এআই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সরকার

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫৬


ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করা গেছে, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। অন্তত প্রযুক্তির দিকে তাকালে এমনটাই মনে হচ্ছে। যে আওয়ামী লীগ এতদিন মানুষের ভোট, মতামত, রাজপথ, রাষ্ট্রযন্ত্র সবকিছুর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে ইসলামপন্থা বনাম গণতন্ত্র: মানুষ যখন নাগরিক থেকে অনুসারী হয়ে উঠছে!

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩


কিছুদিন আগেও আমরা বলতাম, "দয়া করে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মেশাবেন না"। সরল এই কথাটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বোধ ছিল - ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনীতি এক জিনিস নয়। গত দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন নেই! আপনি কি মনে করেন?

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪



বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে স্থানীয় সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর লক্ষ্য অনুযায়ী আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টোকাই থেকে হিরো"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৬



টোকাই থেকে হিরো! বাংলা ছবির  অশ্লীল যুগে মুক্তি পাওয়া এক ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র। ছবিতে প্রেক্ষাপটে অনেকটা এইরকম - বস্তিতে বেড়ে উঠা; মানুষের লাথি- উষ্টা খেয়ে বড় হওয়া এক টোকাই (ছবির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখরিত জীবনের চলার পথে, ব্লগের মুখরিত দিন

লিখেছেন মেহবুবা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


ব্লগ স্কুল, মজারু
ছোটন চলে স্কুলেতে বই শ্লেট হাতে ,
বদরুল ভাই কাঁদছে ভীষন যাবে সাথে সাথে,
চান্কু হল লক্ষ্মীছাড়া পান্কু হয়ে ঘোরে ,
চিটি যাবে সবার আগে উঠল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×