দিনটি ছিল সোমবার।
২০০৬ সালের ঐ দিনটির কথা মনে পড়লেই আজও নিজের ভেতরটা কেমন জানি এক অজানা ভয়ে আঁতকে উঠে। শহীদ স্মৃতি কলেজে তখন Inter 1st year -এ পড়ি। বলে রাখি আমাদের কলেজ ছিল combine কলেজ তাই ১৫০ জন ছাত্র- ছাত্রীকে একসাথে ক্লাস করতে হতো।
ফিরে আসি আসল কথায়-
আমাদের কলেজের বাংলা শিক্ষিকা এবং ইংরেজি শিক্ষক একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। জীবনের অনেকটা সময় তারা অতিবাহিত করেছেন একই ক্যাম্পাসে, হেটেছেন পাশাপাশি, শুনিয়েছেন একে অপরকে জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ আর প্রকাশিত- অপ্রকাশিত নানা কবিতা। লিখেছেন মনের মানুষটিকে নিয়ে লাল মলাটের ডায়েরি যাকে নিয়ে রচনা করবেন স্বপ্ন-সুখের নীড়, যার চোখে চোখ রেখে কাটিয়ে দিবেন নিদ্রাহীন রাত , যার বুকে মাথা রেখে আস্বাদন করবেন স্বর্গ-সুখ।
কিন্তু সময় আর বাস্তবতার সামনে হেরে যান আউলিয়া স্যার(ছদ্মনাম)। হারিয়ে যায় তার প্রিয় মানুষটি যাকে নিয়ে ছিল তার সকল স্বপ্ন, সকল আশা-ভরসা, ছিল সকল চাওয়া-পাওয়া। সবকিছু হয়ে যায় অতীত, রয়ে যায় স্মৃতি।
অন্য আরেকজনের সাথে চিরদিনের তরে আবদ্ব হয়ে রীতিমত সাংসারী হয়ে উঠেন বাংলা ম্যাডাম। কিন্তু বড়ই একা হয়ে পড়েন আমাদের আউলিয়া স্যার। ভাগ্যক্রমে চাকরিটাও হয়ে যায় একই কলেজে। আর কষ্ট কুরে কুরে খেতে থাকে স্যারের প্রতিটা মুহূর্ত। তাইতো স্যার আর ম্যাডাম দেখা হলেই কি এক অজানা দূর্বোধ্য ভাষায় কি যেন বলতেন তা তাদের দুজন ছাড়া পৃথিবীর আর কারো বুঝার কোনো উপায় ছিল না।
আর আমরা ছিলাম বার জনের একটা গ্রুপ। আমাদের চলাফেরা, পড়ালেখা, আড্ডামারা সবকিছু ছিল একসাথে। বসতাম একসাথে আর ক্লাসে ঐ সবকিছু বেশি বেশি করতাম যে কাজ গুলো ছিল একান্তই করতে মানা। আর হাসির বন্যা বসিয়ে দিতাম যদি ক্লাসে ব্যতিক্রম কিছু ঘটতো।
আমাদের কলেজে একজন ম্যাডাম থাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হতো Roll Call করার সময়। সবাই ভুল করে yes sir বলে ফেলতাম আর এই বিষয়টা নিয়ে ছিল ম্যাডামের যত এলার্জি। আর প্রচন্ড রাগও করতেন। তাই ম্যাডাম ক্লাসে আসতেই আমরা yes madam শব্দটা মুখস্থ করা শুরু করতাম। আবার স্যারের ক্লাসটা ছিল ম্যাডামের ক্লাসের টিক পরের ক্লাসটি। আর স্যারকে খেপানোর জন্য স্যারের ক্লাসে অনেকে Yes madam বলে roll call এর সময়ে response করতো।
অন্যান্য দিনের মত মুখস্ত বিদ্যাটা কাজে লাগিয়ে দিলাম ম্যাডামের ক্লাসে। কিন্তু ধরা খেয়ে গেলাম স্যারের ক্লাসে আর মুখস্ত বিদ্যার কুফলটা হাতে-কলমে পেয়ে গেলাম। তারপর যে ঘটনা ঘটল তা সত্যিই খুব ভয়াবহ। কারন ঐদিন স্যারের মনটা ছিল ভীষণ রকমের খারাপ।
Roll call শুরু হল।
-269
-yes madam
....................তখনই বুঝতে পারলাম আজ কপালে দুর্দশা আছে। কারন আমার রোল নাম্বারটাই ছিল ২৬৯।
-270
-yes sir
-269 কে?
-জ্বী স্যার বলে ভয়ে ভয়ে দাড়ালাম।
-সামনে আস।
বুকটা কেমন জানি দুরুদুরু কাঁপছে আর ভাবছি "খাইছে আজকে আমারে......।" স্পষ্টই দেখতে পেলাম স্যারের চোখ থেকে যেন আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে। পাশ থেকে আমার এক ফ্রেন্ড বললো-"যাও আজকেই বুঝতে পারবি স্যার পোলা না মাইয়া"
সীট থেকে দাড়িয়েই বললাম- sorry sir. স্যার ভুল হয়ে গেসে।কিন্তু বিধি বাম, স্যার আমাকে ক্ষমা করলেন না। অবশেষে আমাকে সামনে নিয়ে গেলেন।
আমি ধরেই নিয়েছিলাম স্যার হয়তো লাথিই মারে নাকি। কিন্তু স্যার তা করলেন না। ডাস্টার টা হাতে নিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে এক পশলা ঝারলেন। চারদিকে দেখলাম সুনশান নীরবতা। সবাই শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
আর আজও অমাবস্যা পূর্নিমায় ব্যথায় টন টন করে আমার ব্যথিত অঞ্চল। চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই এক পেয়ালা লজ্জা মিশ্রিত বিভীষিকাময় ঘটনার প্রতিচ্ছবি...........................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


