somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অামার সুদীর্ঘতম বন্ধুত্বের ইতিকথা

২১ শে জুন, ২০১৫ রাত ৯:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোট্টবেলায় আমার সবচাইতে কাছের বন্ধুটির কোলে বসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি আমার কয় বছরের বড়?” তিনি আমার এরকম বেয়াড়া প্রশ্নে একটু হকচকিয়ে গেলেও হেসে ফেলে বললেন, “২৭ বছর।” সেই থেকে জানলাম, আমার সবচাইতে নির্ভরতার আশ্রয়টির সাথে আমার বয়সের ব্যবধান মাত্র ২৭ বছর। আমার পরম সৌভাগ্য তার সাথে আমার বন্ধুত্ব জন্মসূত্রে। আমার এই বন্ধুর একটি বিশেষত্ব হল-তিনি আ্মার কাছে হারতে ভালবাসেন। মনে আছে, যখনই বাসায় কোন নতুন বই কেনা হত, বাবা বইটা এনেই আমার হাতে দিয়ে বলতেন, "এই বইটা তুমি যদি আগে পড়ে ফেলতে পার, তাহলে এটাতে তোমার নাম লিখে দেব।" চ্যালেঞ্জের সেই শুরু। বলা বাহুল্য, আমিই জিততাম। একের পর এক বইয়ে আমার নাম লেখা হত। আমা্র কালেকশন বেড়েই চলত। আমি ভাবতাম, বাবা আমার সাথে প্রতিযোগিতায় পারলেন না। কী আনন্দ! সেদিনের ছোট্ট শ্যামা জানত না যে তার প্রতিযোগীটি জিততে মোটেও আগ্রহী নয়। পরাজয়েই তার আনন্দ।
আমার জন্য কোন বই নিষিদ্ধ ছিল না। লাইব্রেরির প্রতিটা বই আমি নির্বিচারে পড়তে পারতাম। একবার বাবা বাসায় আনলেন সুনীলের “ছবির দেশে কবিতার দেশে” বইটা। বাবা আমাকে দেখানোর আগেই আমি উল্টেপাল্টে দেখে নিয়েছিলাম। ফরাসী শিল্পীদের আঁকা অনেক ন্যুড ছিল তাতে। স্বীকার করি, ক্লাসে ফোরে পড়া শ্যামা সেদিন বইটা দেখে যত না অস্বস্তিতে পড়েছিল, তার চেয়ে বেশি তার মধ্যে আগ্রহ জেগেছিল। বইটা আরো ভাল করে দেখার আগ্রহ। বাবা যথারীতি সেদিনের কেনা সবকটা বই আমার হাতে দিলেন। বিশেষ করে ওই বইটা দিয়ে বললেন, “এই বইটা পড়লে তুমি ফরাসী আর্ট সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবে। আমি তো পড়ার সময় পাই না বেশি। তুমি পড়, আর কী পড়লে সেটা আমাকে গল্প করে শুনিয়ো। আমি তোমার কাছ থেকে শিখতে পারব। বাবা আমার কাছ থেকে শিখবে! ব্যস, আমাকে আর পায় কে? সোৎসাহে পড়তে শুরু করলাম। প্রতিদিন চোখ বড় বড় করে তাকে শিল্পী পল সেজান, রেনোয়া, কামিল পিসারোদের স্ট্রাগলের গল্প শোনাতাম। ঘুনাক্ষরেও সেই মুহুর্তে বুঝি নি, ভদ্রলোক কী সুকৌশলে আমার ফোকাসটা শিফ্ট করে দিয়েছেন।
নিন্দুকেরা বলে, আমি নাকি এই মানুষটার প্রশ্রয়েই বাঁদর থেকে বাঁদরতর হয়েছি। সেই নিন্দুকদলের প্রধান হলেন আমার মা। অবশ্য নিন্দা করার কারণও আছে। পৃথিবীতে কোন বাবা তার সন্তানকে স্কুল ফাঁকি দিতে উৎসাহ দেয় না। ব্যতিক্রম আমার বাবা। আমি পুরো ইউনিফর্ম পরে রেডি। জুতোর ফিতে বাঁধছি। বাবা বলে উঠতেন, “আজ আর স্কুলে যাস না, মা। আজ আমার ছুটি। তুইও বাসায় থাক।” ওই কথাটা শুনে আমার আহ্লাদ এবং মায়ের রাগ- দুটোই বাঁধনছাড়া হয়ে যেত।
হাইস্কুলে ওঠার পর থেকে আমি আর জন্মে কোনদিন ফার্স্ট হই নি। আমার মায়ের দু:খের শেষ ছিল না। তার ধারণা, বাবার প্রশ্রয়েই আমার এই অবস্থা। মায়ের অভিযোগের চোটে বাবা আসলেন আমার পড়ার খোঁজ নিতে। এসে দেখলন, আমি তখন “জগৎ জীবন দর্শন” নামে একটা বই পড়ছি। অথচ ঠিক দশদিন পরে আমার ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষা। বাবা খুব বকলেন। বললেন, “দেখ, এটা খুব বাড়াবাড়ি। এই বই পড়ে তুমি তো এখন কিছুই বুঝবে না। অযথাই সময় নষ্ট না করে ক্লাসের পড়া পড়। আমার চোখ ফেটে জল আসল। বাবা কোনদিন আমাকে কোন বই পড়তে মানা করেননি। অথচ সেদিন কীনা আমার বোধশক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন! আমার নীরব কান্না দেখে বললেন, “তুই যদি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারিস, কী পড়েছিস, তাহলে তোকে আর কিছু বলব না।” ভাগ্য ভাল, আমি তখন লাইবনিজের মোনাডতত্ত্বটা মাত্রই শেষ করেছিলাম। যতটুকু পারি, বুঝিয়ে বললাম। Credit goes to Aminul Sir। অসম্ভব সহজ করে লিখেছিলেন। বাবা চুপ হয়ে গেলেন। বললেন, আমি সরি। তুই পড়। আমি আর কখনো কিছু বলব না।” বলা বাহুল্য, সেদিন বিজয় গর্বে আমি যত না খুশি হয়েছিলাম, তার চাইতে বেশি খুশি হয়েছিলেন পরাজিত মানুষটি।
আজকালকার ছেলেমেয়ে জন্মেই স্মার্টফোন দেখে। আমার জেনারেশনে ও জিনিস ছিল না। টিভিতে টেলিফোন নামে একটা বস্তু দেখতাম। ওটা দিয়ে নাকি কথা বলা যায়। চুয়াডাঙ্গার এক অজপাড়াগাঁয়ের তিন বছর বয়সী ছোট্ট মেয়েটি মাসের পর মাস তার ঢাকায় থাকা বাবার সাথে কথা বলার এক বিকল্প পথ বের করেছিল। একটা গাছের লতা ছিল একদম টেলিফোনের তারের মত। ওই লতা আর দুটো কাঠি দিয়ে সে বানিয়েছিল নিজের টেলিফোন। মা বাবাকে চিঠি লিখে এই কথা জানিয়েছিলন। সেবার বাবা একটা লাল রঙয়ের খেলনা টেলিফোন এনেছিলেন আমার জন্য। এর পর থেকে ওই খেলনা ফোনটা হাতে নিয়ে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে যেতাম। যখন জানতে চাইতাম- বাবার কথা শুনতে পাচ্ছি না কেন? মা বলতেন, “তুমি না পেলেও বাবা তোমার কথা শুনতে পাচ্ছেন।
বাবাকে স্মার্টফোন কিনে দেওয়ার দিন ঘটনাটা মনে পড়ল। আজ আমি নিজে নেক্সাস ৫ ব্যবহার করেও সেই লাল ফোনটার মত নিষ্পাপ আনন্দ পাই না।
মেয়ে হয়ে জন্মানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, বাবাকে একসময় সন্তান হিসেবে পাওয়া যায়। আমার সন্তানসম বাবাকে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০১৫ রাত ৯:২০
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×