somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শেখ মিজান
অন্যায় অপশক্তির বিরুদ্ধ্যে সোচ্চার কন্ঠধ্বনি, মুক্তবাক, স্বাধীন চিন্তা, প্রগ্রেসিভ রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে সামাজিক বৈপ্লবিক পরির্তন চাইযুক্তিহীন কথা মূল্যহীন। কিছু কিছু লোক আছে যারা অযুক্তিক অসত্য কথা বলে বেড়ায়। এদের কথার মূল্য খুবই কম। যুক্তি যু

ভূমিকম্প; ধর্ম ও বিজ্ঞানের মতামত

০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৮:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভূমিকম্প কেন হয়?

ক) ইসলাম ধর্মমত খ) বিজ্ঞানের ক্ষুদ্রবিশ্লেষণ।

ক) ইসলাম ধর্মে কি বলেছেন:

-----আবু হুরাইরা (রা.) কতৃক বর্ণিত, আল্লাহর নবি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে কিন্তু তার খিয়ানত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না), জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত বিদ্যা অর্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু তার মায়ের সাথে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে নিবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দিবে, মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে, জাতির সবচেয়ে দূর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসক রুপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি জনগণের নেতা হবে, একজন মানুষ যে খারাপ কাজ করে খ্যাতি অর্জন করবে তাকে তার খারাপ কাজের ভয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হয়ে যাবে, মদ পান করা হবে (বিভিন্ন নামে মদ ছড়িয়ে পড়বে), শেষ বংশের লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দিবে, এমন সময় আসবে যখন তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে তখন একটি ভূমিকম্প সেই ভূমিকে তলিয়ে দিবে (ধ্বংস স্তুপে পরিণত হবে বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে)। [তিরমিযি কতৃক বর্ণিত, হাদিস নং – ১৪৪৭] এই হাদিসের মাঝে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহ মহানের পক্ষ থেকে জমিনে কখন ভুমিকম্পের আজাব প্রদান করা হয় এবং কেন প্রদান করা হয়।



আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে উঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরণের ভূমিকম্প অনুষ্ঠিত হয়। তখন এই ভূমিকম্প মানুষকে ভীত করে। তারা মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করে, পাপ কর্ম ছেড়ে দেয়, আল্লাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং তাদের কৃত পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মুনাজাত করে। আগেকার যুগে যখন ভূমিকম্প হত, তখন সঠিক পথে
পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকেরা বলত, ‘মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন।

ধর্মিয় বিশ্লেষকদের মতে- বান্দার ওপর আজাব কেনো আসে?
হজরত আলী রা. হতে বর্ণিত রাসুল সা. ইরশাদ করছেন, যখন আমার উম্মত যখন ১৫ টি কাজে লিপ্ত হতে শুরু করবে তখন তাদের প্রতি বালা মসিবত আপাতিত হতে আরম্ভ করবে। কাজগুলো হলো-
১. গনিমতের মাল ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হবে।
২. আমানতের সম্পদ পরিণত হবে গনিমতের মালে।
৩. জাকাত আদায় করাকে মনে করবে জরিমানা আদায়ের ন্যায়।
৪. স্বামী স্ত্রীর বাধ্য হবে।
৫. সন্তান মায়ের অবাধ্য হবে।
৬. বন্ধু-বান্ধবের সাথে স্বদব্যাবহার করা হবে।
৭. পিতার সাথে করা হবে জুলুম।
৮. মসজিদে উচ্চস্বরে হট্টোগোল হবে।
৯. অসাম্মানী ব্যক্তিকে জাতির নেতা মনে করা হবে।
১০. ব্যক্তিকে সম্মান করা হবে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য।
১১. প্রকাশ্যে মদপান করা হবে।
১২. পুরুষ রেশমি পোশাক পরবে।
১৩. গায়িকা তৈরি করা হবে।
১৪. বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হবে।
১৫.পূর্ববর্তী উম্মতদের (সাহাবা, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িন) প্রতি অভিসমাপ্ত করবে পরবর্তীরা।
এই কাজগুলো যখন পৃথিবীতে হতে শুরু হবে তখন অগ্নীবর্ষী প্রবল ঝড়, ভূমিকম্প ও কদাকৃতিতে রূপ নেয়ার অপেক্ষা করবে। এখন একটু চিন্তা করা উচিত যে আমরা এগুলোর মাঝেই লিপ্ত রয়েছি। আর যখন আমাদের উপর মুসিবত আসে তখন প্রকৃতির বা মানুষের বা অন্যান্য জিনিসের দোষ দেই। আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত যে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন আমরা হই তা আসলে আমাদের গুনাহের কারণেই এতো আজাব।

পবিত্র কোরানের ক'টি আয়াতে ভূকম্প সম্পর্কে-
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগ মানুষের পাপের কারণেই আপতিত হয়, ইরশাদ হয়েছে:
ﻭَﻣَﺎ ﺃَﺻَﺎﺑَﻜُﻢْ ﻣِﻦْ ﻣُﺼِﻴﺒَﺔٍ ﻓَﺒِﻤَﺎ ﻛَﺴَﺒَﺖْ ﺃَﻳْﺪِﻳﻜُﻢْ ﻭَﻳَﻌْﻔُﻮ ﻋَﻦْ ﻛَﺜِﻴﺮٍ
‏( ﺳﻮﺭﺓ : ﻯﺭﻮﺸﻟﺍ 30


(আর তোমাদের প্রতি যে মুসিবত আপতিত হয় তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন।)
[সূরা আশ-শুরা:৩০]

অন্য এক আয়াতে এসেছে:
ﻣَﺎ ﺃَﺻَﺎﺑَﻚَ ﻣِﻦْ ﺣَﺴَﻨَﺔٍ ﻓَﻤِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﺻَﺎﺑَﻚَ ﻣِﻦْ ﺳَﻴِّﺌَﺔٍ ﻓَﻤِﻦْ ﻧَﻔْﺴِﻚ
‏( ﺳﻮﺭﺓ : ﺀﺎﺴﻨﻟﺍ 79
(তোমার কাছে যে কল্যাণ পৌঁছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তোমার কাছে যে অকল্যাণ পৌঁছে তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে।...) [সূরা আন-নিসা:৭৯] অতীতের সত্য অস্বীকারকারী জাতিদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
) ﻓَﻜُﻠّﺎً ﺃَﺧَﺬْﻧَﺎ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻪِ ﻓَﻤِﻨْﻬُﻢْ ﻣَﻦْ ﺃَﺭْﺳَﻠْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺣَﺎﺻِﺒﺎً ﻭَﻣِﻨْﻬُﻢْ ﻣَﻦْ
ﺃَﺧَﺬَﺗْﻪُ ﺍﻟﺼَّﻴْﺤَﺔُ ﻭَﻣِﻨْﻬُﻢْ ﻣَﻦْ ﺧَﺴَﻔْﻨَﺎ ﺑِﻪِ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽَ ﻭَﻣِﻨْﻬُﻢْ ﻣَﻦْ ﺃَﻏْﺮَﻗْﻨَﺎ
ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻟِﻴَﻈْﻠِﻤَﻬُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦْ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﺃَﻧْﻔُﺴَﻬُﻢْ ﻳَﻈْﻠِﻤُﻮﻥَ‏( ﺳﻮﺭﺓ
: ﺕﻮﺒﻜﻨﻌﻟﺍ 40
(অতঃপর এদের প্রত্যেককে নিজ নিজ পাপের কারণে আমি পাকড়াও করেছিলাম; তাদের কারও উপর আমি পাথরকুচির ঝড়
পাঠিয়েছি, কাউকে পাকড়াও করেছে বিকট আওয়াজ, কাউকে আবার মাটিতে দাবিয়ে দিয়েছি, আর কাউকে পানিতে ডুবিয়ে
দিয়েছি। আল্লাহ এমন নন যে, তাদের উপর যুলম করবেন, বরং তারা নিজেরা নিজদের উপর যুলম করত।) [ সূরা আল
আনকাবুত:৪০]


পরিচ্ছদঃ ১৫/২৭. ভূমিকম্প ও কিয়ামতের নিদর্শন সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে।
১০৩৭. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহ্! আমাদের শামে (সিরিয়া) ও ইয়ামনে বরকত দান করুন। লোকেরা বলল, আমাদের নজদেও। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আল্লাহ্! আমাদের শামদেশে ও ইয়ামনে বরকত দান করুন। লোকেরা তখন বলল, আমাদের নজদেও। রাবী বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেনঃ সেখানে তো রয়েছে ভূমিকম্প ও ফিত্না-ফাসাদ আর শয়তানের শিং সেখান হতেই বের হবে (তার উত্থান ঘটবে)। (৬০৯৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৯৭৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৯৮০

প্রসঙ্গত সমাজিদক দু একটা কু সংস্কার উল্লেখ করতেই হচ্ছে-
ছোটবেলায় গল্প শুনতাম, পৃথিবীটা একটা বড় ষাঁড়ের শিংয়ের মাথায়। ষাঁড়টা যখন এক শিং থেকে অন্য শিংয়ে পৃথিবীটা নিয়ে যায় তখন সবকিছু কেঁপে ওঠে। আর ভাবতাম, এজন্যই ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পের কারণ এটা নয় বটে, তবে পৃথিবীর গভীরে ঠিকই একটা পরিবর্তন হয়।


খ) বিজ্ঞান কী বলে ভূকম্পন সম্পর্কে :

এবার বিজ্ঞান মতে ভূকম্পের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি।

সাধারণত তিনটি প্রধান কারণে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে…
১. ভূপৃষ্ঠজনিত
২. আগ্নেয়গিরিজনিত
৩. শিলাচ্যুতিজনিত


ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে ভূপৃষ্ঠের নীচে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় রয়েছে কঠিন ভূত্বক। ভূত্বকের নীচে প্রায় ১০০ কি.মি. পূরু একটি শীতল কঠিন পদার্থের স্তর রয়েছে। একে লিথোস্ফেয়ার (Lithosphere) বা কঠিন শিলাত্বক নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের পৃথিবী
নামের এই গ্রহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কঠিন শিলাত্বক (লিথোস্ফেয়ার)সহ এর ভূপৃষ্ঠ বেশ কিছু সংখ্যক শক্ত শিলাত্বকের প্লেট (Plate) এর মধ্যে খন্ড খন্ড অবস্থায় অবস্থান করছে। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে এই প্লেটের চ্যুতি বা নড়া-চড়ার দরুণ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ-
আরও বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বিজ্ঞানীদের:
আয়নোস্ফেরিক সায়েন্স হল সেই বিজ্ঞান, যা প্রায় নির্ভুল ভাবে বলে দিতে পারে, কোন অঞ্চলে ভূকম্পন হতে চলেছে। কম্পনের অন্তত ৭২ ঘণ্টা আগে সেই আভাস দিতে পারেন আয়নোস্ফেরিক সায়েন্সের বিশেষজ্ঞরা।

আফটারশক হয় কী ভাবে?


বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, একটা বড় ভূমিকম্পের প্রভাবে ভূগর্ভের বিভিন্ন প্লেট অস্থির হয়ে পড়ে। প্লেটে প্লেটে ঘর্ষণ বাড়ে, তাদের অবস্থান বদলায় ঘন ঘন। ফলে তামাম এলাকা বেশ কিছু দিন পর্যন্ত হামেশা কাঁপতে থাকে। বড় ভূমিকম্প-পরবর্তী এ হেন লাগাতার কম্পনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াই হল ভূমিকম্পোত্তর কম্পন বা আফটারশক।

উদাহরণ হিসেবে ২০০৪-এর সুনামির প্রসঙ্গ আসছে। ভূ-বিশারদরা জানিয়েছেন, ওই বিপর্যয়ের এক মাস পর্যন্ত আন্দামানে ঘন ঘন আফটারশক হয়েছে। তবে সেগুলোর কম্পনমাত্রা রিখটার স্কেলে চার-পাঁচের বেশি ছিল না। কলকাতায় বসে টেরও পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভূ-বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, নেপালের ক্ষেত্রে শুধু যে আফটারশকের তীব্রতা অনেক বেশি হতে পারে তা-ই নয়, ওই তল্লাটে অদূর ভবিষ্যতে ৯ রিখটারের অতি প্রবল ভূমিকম্পেরও প্রভূত সম্ভাবনা।
কেন?

শঙ্করবাবুর ব্যাখ্যা: হিমালয়ে ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যে যে তিনটি ‘খোঁচা’ রয়েছে, তার মধ্যে প্রধান প্রান্তীয় (মেন বাউন্ডারি) খোঁচাটি সবচেয়ে অস্থির। শনিবারের ভূমিকম্প ঘটেছে সেখানেই, যার দরুণ সেটি আরও অস্থির হয়ে গিয়েছে। ফলে ওখানকার দু’টি প্লেটের মধ্যকার ছোট ছোট চ্যুতিগুলোতেও শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটতে শুরু করেছে। উপরন্তু আর কোথায় কোথায় ফাটল ধরেছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। ‘ওই সব ফাটলে যত শক্তি সঞ্চিত হবে, তত বাড়বে ভূমিকম্পের আশঙ্কা।’’—হুঁশিয়ারি শঙ্করবাবুর।


ভূমিকম্প এবং আফটারশকের মধ্যে পার্থক্য
ভূমিকম্পের পরপরই যে কম্পনগুলো অনুভূত হয় সেগুলোকেই আফটারশক বলা হয়। তবে আফটারশক আসল ভূমিকম্পের চেয়ে মৃদু হবে না তীব্র হবে সেটা নিশ্চিত নয়। তবে ভূমিকম্প আর আফটারশক কিন্তু একই জিনিস।

কেননা দুটিই কম্পন এবং ভয়াবহ। পার্থক্য শুধু আফটারশক পরে ঘটে। বিশেষজ্ঞরা ফোরশক (ভূমিকম্পের পূর্বে কম্পন) আর আফটারশকের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন। তবে আফটারশক মূল ভূমিকম্পের কিছু পরেই বা একদিন পরে এমনকি এক মাস পরেও হতে পারে।

আফটারশক কতটা শক্তিশালী হতে পারে?
ভূমিকম্পনের পূর্বে যে 'ফোরশক' হয় তা খুবই মৃদু, টেরই পাওয়া যায় না বলতে গেলে। কিন্তু ভূমিকম্প পরবর্তী আফটারশক মূল ভূমিকম্পের মতই খুব ভালোভাবে অনুভব করা যায়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রাও থাকে বেশি। এপ্রিলের ২৫ এপ্রিল তারিখ নেপালে ৭.৮ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে যা ভারত এবং বাংলাদেশেও অনুভূত হয়।

এর মধ্যে অনেকগুলো আফটারশক অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে বড়ো আফটারশক হয় ১২ মে। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৭.৩ (ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের সংবাদ অনুযায়ী)। বাকীগুলোর মধ্যে মাত্র ২টি আফটার শকের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার উপরে ছিল।

কেন আফটারশক ঘটে?
একটা জায়গায় ভূমিকম্প ঘটার কারণ একদিন বা দুইদিনে সৃষ্টি হয় না। অনেক বছর ধরে মাটির নিচের প্লেটগুলো স্থান পরিবর্তন করতে করতে একসময় বড় ধরণের একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তা নতুন একটি অবস্থানে আসে।

এই ঝাঁকুনির পর আর অনেকগুলো ছোট ছোট ঝাঁকুনির মাধ্যমে প্লেটটি তার নতুন অবস্থানে থিতু হয়। মূলত একারণেই মূলত আফটার শকগুলো আসে।

নেপাল বা হিমালয় অঞ্চলে যে টেকটোনিক প্লেটগুলো রয়েছে সেগুলো পৃথিবীর অন্যতম সঞ্চারণশীল প্লেট। প্রতিবছর ইন্ডিয়ান প্লেট ৪ সেন্টিমিটার করে ইউরেশিয়ান প্লেটের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। কন্টিনেন্টাল প্লেটের হিসেব অনুযায়ী, এটা খুবই দ্রুত।

আফটারশক কি আগে থেকে জানা যায়?
নেপালে ৮০ বছর আগে একটি বিশাল ভূমিকম্প হয়েছিল। সে হিসেবে পরবর্তী বড় ভূমিকম্প কবে হতে পারে সে ব্যাপারে একটা আন্দাজ হয়তো করা যায়। কিন্তু অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত ভূমিকম্প কখন হতে পারে সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যায় না। সে হিসেবে আফটারশক কখন ঘটবে তাও নিশ্চিতভাবে বলা দুষ্কর।

তবে কোথাও একটা বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর সেখানকার মানুষদের সচেতন থাকাটাই ভালো, কেননা ভূমিকম্পের পরপরই আফটারশক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।


রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা
৫ - ৫.৯৯ মাঝারি
৬ - ৬.৯৯ তীব্র
৭ - ৭.৯৯ ভয়াবহ
৮ - এর ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ

ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!! ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.
সেদিন একজন এসে আমাকে জানাল ভূমিকম্প নিয়ে নাকি ফেসবুকে তুলকালাম কাণ্ড হচ্ছে। ফেসবুকের কাণ্ডকারখানা নিয়ে আমি খুব বেশি মাথা ঘামাই না, তবুও জানতে চাইলাম তুলকালাম কাণ্ডটা কী রকম। যে খবর এনেছে সে আমাকে জানাল, নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরেই আলোচনা হচ্ছে যে ভূমিকম্পটা নাকি বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসছে। শিলিগুড়ি হয়ে সেটা নাকি যে কোনো সময়ে বাংলাদেশে ঢুকে দেশটাকে তছনছ করে দেবে। আলাপ আলোচনায় শুধু আতংক আর আতংক।

শুনে আমার মনে হল ভূমিকম্প নিয়ে আমার কিছু একটা লেখা উচিৎ। আমি ভূমিকম্পের বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু আমি প্রায় পাঁচ বছর ভূমিকম্প এলাকায় ছিলাম। ছোট-বড়-মাঝারি অসংখ্য ভূমিকম্পের মাঝে টিকে থাকতে হয়েছে, তখন যে বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো হয়েছে সেটা এখনো আমার কাজে লাগে।

পিএইচডি শেষ করে আমি যখন পোস্টডক করার জন্যে লস এঞ্জেলস শহরের কাছে ক্যালটেকে যোগ দিয়েছি তখন প্রথমেই আমাকে জানিয়ে দেয়া হল এটা ভূমিকম্প এলাকা। খুব কাছে দিয়ে বিখ্যাত (কিংবা কুখ্যাত!) সান এন্ড্রিয়াস ফল্ট লাইন গিয়েছে সেখানে যে কোনো মূহূর্ত্তে রিখটার স্কেলে আট মাত্রা থেকে বড় একটা ভূমিকম্প হয়ে, কাজেই সব সময় সতর্ক থাকা ভালো। আমার ল্যাবরেটরির সামনেই আটতলা মিলিক্যান লাইব্রেরী, বিল্ডিংটা তৈরী করে সেটাকে নাকি ডানে বামে সামনে পিছনে দুলিয়ে দেখা হয়েছে আট মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে কী না! পৃথিবীর সবাই ভূমিকম্পের মাত্রা মাপার রিখটার স্কেলের নাম শুনেছে সেই স্কেলের নাম করণ হয়েছে ক্যালটেকের প্রফেসর রিখটারের নামে।

ভূমিকম্প নিয়ে কী কী সতর্কতা নেয়া উচিৎ শুনতে শুনতে আমিও সতর্ক থাকা শিখে গেলাম। বড় ভূমিকম্পে বিল্ডিং ধ্বসে তার নিচে চাপা পড়ে মারা যাবার যেটুকু আশংকা তার থেকে হাজার গুন বেশী আশংকা আচমকা কোনো ছোট খাট ভূমিকম্পে উপর থেকে কোনো ভারী জিনিষ মাথার উপর পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলা। তাই দেখতে দেখতে আমি সতর্ক থাকা অভ্যাস করে ফেললাম। মাথার উপরে কিছু রাখি না, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি দেয়ালে হুক দিয়ে বেঁধে রাখি। তখন একটা টাইম ্রজেকশান চেম্বার তৈরী করছিলাম, তার ভেতরে বিশেষ আইসোটপের যে গদাস তার দাম দুইশ পঞ্চাশ হাজার ডলার, ভূমিকম্পে চেম্বার উল্টে পড়ে গ্যাস বের হয়ে গেল সুইসাইড করতে হবে, তাই উপর থেকে ক্রেন দিয়ে চেম্বারকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখি।


আমার পুত্র সন্তানের বয়স তখন দুই বছর, সে বাসায় ঘুরে বেড়ায়। আচমকা ভূমিকম্পে তার উপর শেলফ, আলমারী কিংবা টেলিভিশন পড়ে যেন না যায় সে জন্যে সবকিছু দেওয়ালের সাথে বাঁধা।

আমার এত সতর্কতা গেল না, হঠাৎ একদিন ভোর বেলা রিখটার স্কেলে ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হানা দিল, ভূমিকম্পের হিসেবে সেটা মাঝারী, কিন্তু তার কেন্দ্র (এপিসেন্টার) ছিল খুব কাছে তাই আমরা সেটা খুব ভালোভাবে টের পেলাম। ছোট ছেলেকে বগলে নিয়ে সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে ধরে দোতলা থেকে নেমে ছুটতে ছুটতে বাইরে এসে দাড়িয়েছি। বাড়ী ঘর কাঁপছে, মাটি যাচ্ছে, সব মিলিয়ে অতি বিচিত্র একটা অভিজ্ঞতা! আমি যথেষ্ট বিচলিত কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা সেটাকে বেশী গুরুত্ব দিল না। আমাদের গ্রুপের ইঞ্জিনিয়ার বলল, “কাজে আসছি, হঠাৎ মনে হল গাড়ীর টায়ারটা ফেটে গেছে। নূতন গাড়ী মুডটা অফ হয়ে গেল। পরে দেখি একটা ফালতু ভূমিকম্প!” এই হচ্ছে তাদের প্রতিক্রিয়া।

বড় ভূমিকম্প হলে পরের কয়েকদিন নিচে মাটি ক্রমাগত কাপঁছে। কাঠের বাসা, যত ছোট ভূমিকম্পই হোক সেটা গুটুর গুটুর শব্দ করে জানান দেয়। আমার দুই বছরের ছেলেটির তাতে মহাআনন্দ, সে উল্লসিত মুখে ছুটে এসে আমাকে জানায় “গুডু গুডু! গুডু গুডু!” আমি তার আনন্দে অংশ নিতে পারি না। মনে মনে শুধু হিসেব করি, এটি ছিল রিখটার স্কেলের মাত্র ছয় মাত্রার ভূমিকম্প, এটাতেই এই অবস্থা। লস এঞ্জেলসের বড় ভূমিকম্পটা হবে কমপক্ষে আট মাত্রার, অর্থাৎ এক হাজার গুন বেশী শক্তিশালী, সেটা যদি আসে তাহলে কী অবস্থা হবে? রিখটার স্কেলে এক মাত্রা বড় হওয়া মানে প্রায় ত্রিশ গুণ বড় হওয়ার। কাজেই দ্ইু মাত্রা হচ্ছে এক হাজার। আমি রাতে ঘুমাতে পারি না নিদ্রাহীন চোখে বাসার ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকি। ছোট বড় আফটার শকের গুটুর গুটুর শব্দ শুনি।

ভূমিকম্প নিয়ে কী কী সতর্কতা নেয়া উচিৎ শুনতে শুনতে আমিও সতর্ক থাকা শিখে গেলাম

তখন ইন্টারনেট ছিল না (গুজব এবং আতংক ছাড়ানোর জন্যে ফেসবুকও ছিল না)। তাই আমি একদিন ক্যালটেকের বুক স্টোর থেকে ভূমিকম্পের উপর লেখা একটা বই কিনে আনলাম। মানুষ যেভাবে ডিটেকটিভ উপন্যাস কিংবা ভূতের গল্প পড়ে আমিও বইটা সমান আগ্রহে শেষ করলাম। এজানা অচেনা রহস্যময় ভূমিকম্প নিয়ে আমার ভিতরে যে আতংক ছিল সেটা দূর হয়ে গেল। আমি আবার নাক ডেকে ঘুমাতে শুরু করলাম। ভালো ঘুমের জন্যে জ্ঞান থেকে বেশী কার্যকর আর কিছু হতে পারে না।

২.
ভূমিকম্পের বই পড়ে আমি প্রথম যে বিষয়টা জানতে পারলাম সেটি হচ্ছে আট মাত্রার ভূমিকম্প ছয় মাত্রার ভূমিকম্প থেকে এক হাজার গুণ বেশী শক্তিশালী। তার অর্থ এই নয় যে, সেই ভূমিকম্পটির তীব্রতা, কম্পন বা ঝাকুনি এক হাজার গুণ বেশী! তার অর্থ ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয় অল্প জায়গা জুড়ে, আট মাত্রার ভূমিকম্প হয় অনেক বেশী জায়গা জুড়ে। আমাদের পায়ের নিচে শক্ত মাটি দেখে আমরা ধরে নিই ভূমি হচ্ছে স্থির! আসলে ভূমি স্থির নয়, সেগুলো নানা ভাগে বিভক্ত এবং সেগুলো এদিক সেদিক নড়ছে।

আমরা যে ভূমিকম্পের ওপর আছি তার নাম ইন্ডিয়ান প্লেট। সেটা বছরে দুই ইঞ্চি করে উত্তর দিকে এগুচ্ছে এবং উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেটকে ধাক্কা দিচ্ছে। সেই ধাক্কায় মাটি উপরে উঠতে উঠতে হিমালয় পর্যন্ত তৈরী হয়ে গেছে! সব প্লেটেরই একটা পরিসীমা বা বাউন্ডারী থাকে, এই বাউন্ডারীতে ধাক্কাধাক্কি চলতে থাকে। তাই নিয়মিতভাবে এই বাউন্ডারীতে ভূমিকম্প হতে থাকে! সেই ভূমিকম্প এতই নিয়মিত যে, বিজ্ঞানীরা আজকাল মোটামুটি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন যে, রিখটার স্কেলে নয় মাত্রার ভূমিকম্প হয় আনুমানিক দশ বছরে একবার। আট মাত্রায় ভূমিকম্প হয় আরো বেশী, আনুমানিক প্রতি বছরে একবার।

হিসাবটি মনে রাখা বেশ সোজা, ভূমিকম্পের মাত্রা এক কমে গেলে তার সংখ্যা বেড়ে যায় দশ গুণ। অর্থাৎ সাত মাত্রায় ভূমিকম্প বছরে দশটি, ছয় মাত্রার ভূমিকম্প বছরে একশটি, পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প বছরে প্রায় এক হাজার, চার মাত্রার ভূমিকম্প বছরে দশ হাজার। এর চাইতে ছোট ভূমিকম্পের হিসেব নিয়ে লাভ নেই, সেগুলো ঘটলেও আমরা টের পাই না! কাজেই আসল কথাটা হচ্ছে বছরে সারা পৃথিবীতে ছোট বড় হাজার হাজার ভূমিকম্প হচ্ছে এবং সেগুলোর প্রায় বেশীরভাগ হয় পৃথিবী পৃষ্ঠের সঞ্চারণশীল ভূখণ্ড বা টেকটোনিক প্লেটের পরিসীমা বা বাউন্ডারিতে। সেজন্যে নেপাল সিকিম ভূটানে এত ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়।

আমাদের ভূখণ্ডের পরিসীমা বা ফল্টলাইনটা এই দেশগুলোর ভেতর দিয়ে গিয়েছে। আমাদের কপাল অনেক ভালো যে সেই ফল্টলাইন খুব যত্ন করে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে মায়ানমারের ভেতর দিয়ে নিচে নেমে গেছে। বড় ফল্টলাইনটা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে না গেলেও উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, তেঁতুলিয়ার খুব কাছে দিয়ে গিয়েছে দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটার থেকে কম। তাই যখন এই ফল্ট লাইনে ভূমিকম্প হয় বাংলাদেশের অন্য জায়গা থেকে সেভাবে টের না পেলেও উত্তরবঙ্গের মানুষেরা ভালোই টের পায়। বড় ফল্টলাইন থেকে ছোট অনেক শাখা প্রশাখা বের হয়, এবং আমাদের দেশে এ রকম কিছু ফল্ট লাইন থাকতে পারে, সেখান থেকে ভূমিকম্প হতেও পারে।


ভূমিকম্পটি এমন একটি ব্যাপার যে কোথায় হবে এবং কোথায় হবে না সেটি কেউ কখনো জোর দিয়ে বলতে পারবে না। আমি গত পঁয়তাল্লিশ বছরে আমাদের দেশের কাছাকাছি যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছে সেটি ভালো করে লক্ষ্য করেছি, ইচ্ছে করলে পাঠকেরাও এই ছবিটা দেখতে পারে।

এই ছবিটা এক নজর দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে আমাদের দেশের ভেতরে ভূমিকম্প হওয়ার থেকে অনেক বেশী আশংকা আশেপাশের দেশগুলোতে ভূমিকম্প হওয়া। (তবে বিশেষজ্ঞরা অবশ্যি ভয় দেখাতে ভালোবাসেন, তারা সব সময় বলছেন, আমরা খুব ঝুঁকির মাঝে আছি! আমি বিশেষজ্ঞ নই, তাই আমার কথা বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই, শুধু ছবিটি এক নজর দেখলেই হবে।)

তবে যে ঝুঁকিটির কথা কেউ অস্বীকার করবে না সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের কাছাকাছি যে বড় ফল্ট লাইন আছে সেখানকার বড় বড় ভূমিকম্পগুলোর ধাক্কা সামলানো। দূরত্বের সাথে সাথে কম্পনের তীব্রতা কমে আসে। দ্বিগুণ দূরত্বে গেলে চার গুণ কম্পন কমে আসে, দশগুণ দূরত্বে গেলে একশ গুণ কম্পন কমে আসে, সেটা হচ্ছে আমাদের ভরসা। নেপালের ভূমিকম্পটি বাংলাদেশ থেকে যথেষ্ট দূরে ছিল। তারপরেও আমরা সেটা খুব ভালোভাবে টের পেয়েছি যদি এটা আরো কাছাকাছি কোথাও হত, যেমন ভূটানের দক্ষিণে কিংবা আসামে, তাহলে দেশে অনেক বড় অঘটন ঘটানোর মতো তীব্রতা হতেই পারত।

(তবে ভূমিকম্পটি থেকে দূরে সরে গেলেই যে বিপনের আশংকা কমে যায় তা নয়, ১৯৮৫ সালে মেক্সিকো সিটিতে ভূমিকম্প প্রায় ৬৪ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, যদিও এপিসেন্টারটি ছিল প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে। তবে এটি অবশ্য সেখানকার খুবই চিবিত্র এক ধরনের ভূখণ্ডের কারণে, আমি যতদূর জানি আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতি মেক্সিকোর মতো নয়।)

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পটি হয়েছিল চিলিতে ১৯৬০ সালে। রিখটার স্কেলে সেটি ছিল বিস্ময়কর ৯.৫। সেই ভূকম্পনে প্রায় ছয় হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। দেশটি তখন রীতিমতো পরিকল্পনা করে তাদের দেশের বিল্ডিংএর নিয়ম মেনে ভূমিকম্প সহনীয়ভাবে তৈরী করতে শুরু করে। ২০১৪ সালে তাদের দেশে যখন ভয়ংকর ৮.২ মাত্রায় একটা ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে তখন তাদের দেশে মানুষ মারা গিয়েছে মাত্র ছয় জন! নিয়ম মেনে বিল্ডিং তৈরী করলে কী লাভ হয় এটি তার একটা চমৎকার উদাহরণ। এর থেকে প্রায় ষাট গুণ ছোট ৭ মাত্রায় একটা ভূমিকম্পের কারণে ২০১০ সালে হাইতিতে মানুষ মারা গিয়েছে প্রায় তিন লক্ষ। দরিদ্র দেশে নিয়ম-নীতি না মেনে মিগজ বাক্সের মতো দুর্বল বিল্ডিং তৈরী করলে তার ফলাফল কী হতে পারে এটা তার একটা খুব করুণ উদাহরণ। কাজেই ভূমিকম্প নিয়ে কেউ যদি আমাকে একটা মাত্র মন্তব্যও করতে বলে তাহলে কোনো রকম বিশেষজ্ঞ না হয়েও আমি খুব জোর গলায় বলতে পারব যে, ঘনবসতি এলাকাগুলোতে আমাদের বিল্ডিংগুলো নিয়ম নীতি মেনে তৈরী করতে হবে।

৩.
ঠিক কী কারণ জানা নেই ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের ভেতরে এক ধরনের রহস্যময় আতংক কাজ করে। ভূমিকম্প শুরু হলেই মানুষ পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু করে। ২৮ এপ্রিল নেপালের ভূমিকম্পটির কারণে আমরা দেশে যে কম্পন অনুভব করেছি, সেই কম্পনে দেশের অনেক মানুষ দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটাছুটি করে আহত হয়েছে, কেউ কেউ মারাও গেছে।

ভূমিকম্পর খুঁটিনাটি জানার আগে আমি নিজেও একে যথেষ্ট ভয় পেতাম, এখন ভয় কমে গেছে কৌতূহল বেড়েছে অনেক বেশি। দেশের সবার অন্তত দুটি জিনিস জানা উচিৎ; একটি হচ্ছে, যখন এখানে ভূমিকম্প হয় তখন সবারই ধারণা হয় তাদের পায়ের নিচে যে মাটি সেই মাটিতে ভয়ংকর অশুভ একটা কিছু শুরু হয়েছে, এর থেকে বুঝি আর কোনো রক্ষা নেই! মূল ব্যাপারটা মোটেও সে রকম নয়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভূমিকম্পের কেন্দ্রটি বহু দূরে, সেখানকার ভূমিকম্পের ছোট একটা রেশ আমরা অনুভব করছি। ভয় না পেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় এটা ঘটে যেতে দিলে কিছুক্ষণের মাঝেই থেমে যাবে।

আজকাল তথ্যপ্রযুক্তির যুগ, কিছুক্ষণের মাঝেই ভূমিকম্পটির নাড়িনক্ষত্র ইন্টারনেটে চলে আসবে। ইউএসজিএসএর একটা অসাধারণ ওয়েব সাইট রয়েছে (earthquake.u5gs.gov); সেখানে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে যে কোনো ভূমিকম্প হলেই তার তথ্য কয়েক মিনিটেই চলে আসে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইউএসজিএসএর এই ওয়েবসাই খুলে বসে থাকলে কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা যাবে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একটা ভূমিকম্প হয়েছে। আমরা যদি নিজের চোখে দেখি, সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার ছোট বড় ভূমিকম্প হচ্ছে এবং পৃথিবীর মানুষ এর মাঝেই শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে। তাহলে আমার ধারণা, আমাদের এই যুক্তিহীন ভয়টা অনেক কমে আসবে। ভূমিকম্প হলে কী করা উচিৎ তার কিছু নিয়মকানুনও ঠিক করা আছে; সেগুলো জানা থাকলেও ভালো। আর কিছুু না হোক সেগুলো করার চেষ্টা করে একটু ব্যস্ত থাকা যায়।

ভূমিকম্প নিয়ে দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় আমরা একটু চিন্তা করে দেখতে পারি। সেটি হচ্ছে এই দেশে ভূমিকম্প মারা পড়ার থেকে গাড়ী চাপা পড়ে মারা যাওয়ার আশংকা অনেক বেশী। গাড়ী চাপা পড়ে বছরে চার হাজার থেকে বেশী মানুষ মারা যায়, ভূমিকম্পের কারণে বছরে চার জন মানুষও মারা যায় কী না সন্দেহ। তারপরেও ভূমিকম্পকে আমরা অসম্ভব ভয় পাই কিন্তু গাড়ীতে উঠতে বা রাস্তায় হাঁটাচলা করতে একটুও ভয় পাই না! শুধু গাড়ী এক্সিডেন্ট নয়, বন্যা ঘুর্ণিঝড়, এমনকি বজ্রপাতেও এই দেশে অনেক মানুষ মারা যায়, সেগুলো নিয়েও আমাদের কারো ভেতরে এতটুকু ভীতি নেই কিন্তু ভূমিকম্প নিয়ে আমাদের অনেক ভয়!

এই ভয়টি যুক্তিহীন, এটাকে লালন করে মনের শান্তি নষ্ট করার কোনো অর্থ নেই। পৃথিবীর সবাই জানে লস এঞ্জেলস এলাকায় যে কোনো মুহুর্তে একটা ভয়ংকর (প্রায় আট মাত্রার ) ভূমিকম্প হবে। আমি যখন লস এঞ্জেলস এলাকায় ছিলাম প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত সেটার জন্যে অপেক্ষা করেছি। তারপর পঁচিশ বছর প্রায় হয়ে গেছে, এখনো সেই ভূমিকম্পটি ঘটেনি। কবে ঘটবে কেউ জানে না। কাজেই ভূমিকম্পকে ভয় পেয়ে কোনো লাভ আছে?

Los Angeles city - 111
পৃথিবীর সবাই জানে লস এঞ্জেলস এলাকায় যে কোনো মুহূর্তে একটা ভয়ংকর (প্রায় আট মাত্রার ) ভূমিকম্প হবে

‌‍
বরং এটাকে নিয়ে গবেষণা করে অনেক লাভ আছে। আমার ছাত্রছাত্রীরা তাদের আন্ডার গ্রাজুয়েট প্রজেক্ট হিসেবে ভূমিকম্প মাপার সিসমোগ্রাফ বানিয়েছে। অনেকগুলো বানিয়ে পুরো দেশে ছড়িয়ে ছিটিতে দিয়ে আমরা ইচ্ছে করলে সারা দেশকে চোখে চোখে রাখতে পারি। আমাদের দেশের ভেতরে কোথায় কোথায় ফল্টলাইন আছে সেগুলো খুঁজে বের করতে পারি। ভূমিকম্পের আগে, ভূমিকম্প চলার সময় এবং ভূমিকম্প শেষে কী কী করতে হবে সেই বিষয়গুলো স্কুল কলেজের সব ছেলেমেয়েদের শেখাতে পারি। (সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থলে এর উপরে বিশাল একটা বিল বোর্ড ছিল। হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা সেটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিয়েছে। কারণ সেই বিলবোর্ডটিতে আমার একটা বিশাল ছবি ছিল।)

এই দেশে ভূমিকম্প নিয়ে অনেক গবেষণা করা সম্ভব, সত্যি কথা বলতে কী, কোনো রকম যন্ত্রপাতি ছাড়াই সিলেটে আমার ঘরে বসে একবার আমি খুব চমকপ্রদ একটা এক্সপেরিমেন্ট করে ফেলেছিলাম। পদ্ধতিটা জানা থাকলে অন্যেরাও সেটা চেষ্টা করে দেখতে পারে।

ভূমিকম্প হলে তার কেন্দ্র থেকে দুই ধরনের তরঙ্গ বের হয়। একটা তরঙ্গ শব্দের মতো, মাটির ভেতর দিয়ে সেটা দ্রুত চলে আসে, এটার নাম প্রাইমারী বা সংক্ষেপে পিওয়েভ। দ্বিতীয়টি হচ্ছে সেকেন্ডারী বা এসওয়েভ, এটা হচ্ছে সত্যিকারের কাঁপুনি যেটা আমরা অনুভব করি। এর গতিবেগ পিওয়েভ থেকে সেকেন্ডে প্রায় দশ কিলোমিটার কম।

কাজেই দূরে যদি কোথাও ভূমিকম্প হয় তাহলে প্রথমে পিওয়েভ এসে একটা ছোট ধাক্কা দেয় এবং সেকেন্ডে প্রায় দশ কিলোমিটার পিছিয়ে থাকা এস ওয়েভ একটু পরে এসে ঝাকাঝাকি কাঁপাকাপি শুরু করে দেয়। কাজেই পিওয়েভ আসার কতো সেকেন্ড পর এসওয়েভ এসে আসল ঝাঁকুনি শুরু করে সেটা জানলেই আমরা ভূমিকম্পের কেন্দ্রটি কতদূরে সেটা বের করে ফেলতে পারি। যত সেকেন্ড পার্থক্য তাকে দশ দিয়ে গুণ করলেই দুরত্ব বের হয়ে যায়।

আমি একদিন আমার অভ্যাস অনুযায়ী মেঝেতে বসে সোফায় হেলান দিয়ে কাজ করছি, হঠাৎ একটা ছোট ঝাঁকুনি টের পেলাম। আমার মনে হল এটা সম্ভবত কোনো একটা ভূমিকম্পের পিওয়েভ। আমি সাথে সাথে ঘড়ি দেখা শুরু করলাম। প্রায় তিরিশ সেকেন্ড পার হবার পর যখন কিছুই হচ্ছে না এবং আমি প্রায় হাল ছেলে দিয়েছি তখন হঠাৎ করে এসওয়েব এসে মূল ভূমিকম্প শুরু করে দিল। যখন আশেপাশের ফ্ল্যাটের মানুষজন আতংকে চিৎকার করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, তখন আমি ঘরের ভেতরে বসে আনন্দে চিৎকার করে বলছি, ‘কোনো ভয় নেই! এই ভূমিকম্পের এপিসেন্টার তিনশ কিলোমিটার দূরে।”

বলাই বাহুল্য, নিজের আবিষ্কারে আমি নিজেই মোহিত।

ভূমিকম্প নিয়ে এখনো অনেক রহস্য অজানা। ভয় পেয়ে সেই রহস্যকে দূরে সরিয়ে না রেখে সবাই মিলে তার রহস্য ভেদ করাটাই কি বেশী অর্থপূর্ণ কাজ নয়? বাংলাদেশের মানুষ সব রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারে, এই ভূমিকম্পকে কেন শুধু শুধু ভয় পাব? প্রয়োজনে অবশ্যই আমরা এর মুখোমুখি হতে পারব।

শেখ মিজান
০৪/০১/২০১৭

সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ১:০৯
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×