somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তারেক রহমানের হঠাৎ ‘জামায়াত-বিরোধী’ উচ্চারণ: রাজনীতির মাঠে নতুন সংকেত, নাকি পুরোনো সমস্যার মুখোশ?

০৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তারেক রহমানের হঠাৎ ‘জামায়াত-বিরোধী’ উচ্চারণ: রাজনীতির মাঠে নতুন সংকেত, নাকি পুরোনো সমস্যার মুখোশ?

বিএনপি রাজনীতিতে এক অদ্ভুত মোড়—অনেক বছর পর হঠাৎ করেই তারেক রহমান সরাসরি জামায়াতকে ঘিরে কিছু সমালোচনামূলক কথা বললেন। ফজলুর রহমান কিংবা কিছু সাবেক ছাত্রদল নেতার মুখে যেসব কথা এতদিন ‘ইঙ্গিতে’ শোনা গেছে, এবার তারেক রহমান নিজেই তা বলে ফেললেন।
কিন্তু সমস্যা হলো—এটা এতটাই ‘অস্বাভাবিক’ শোনালো যে, মনে হলো অনভ্যাসে গলার স্বরই ফেটে যাচ্ছে।

তারেক রহমানের বক্তব্য একদম খারাপ হয়নি। ধর্মীয় কুঁজো যুক্তি দিয়ে মানুষকে বেহেশতের টিকিট দেখানো যায় না—এই কথাটা ঠিক। তিনি বলেছেন, বেহেশত–দোজখের গ্যারান্টি দুনিয়ার কেউ দিতে পারে না, কেউ দিলে সেটা ‘শিরক’ পর্যন্ত হতে পারে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটিতে ভুল নেই—বরং যথেষ্ট শক্ত, যুক্তিসঙ্গত অবস্থান।

কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা—সেটা একেবারেই আলাদা।

বাঙালি বেহেশতের লোভে ভোট দেয় না—অন্তত গণমানুষের চরিত্র তা বলে না
তারেক রহমান যদি ভাবেন জামায়াত ভোট পায় শুধুই ধর্মের মোড়কে ‘বেহেশত-দোজখ’ দেখিয়ে—তাহলে তিনি ভুল দেখছেন।
বাংলাদেশে মানুষ ধর্মপ্রাণ—কিন্তু ধর্মীয় আবেগ যত আছে, তার চেয়ে বড় আছে ‘ব্যবহারিক জীবন’।
যে সমাজে:
** ঘুষখোর লোকের সামাজিক মর্যাদা আছে,
** নিয়ম-কানুন মানলে মানুষ হেরে যায় বলে ধরে নেয়,
** নিজের সুবিধার জন্য আইন ভাঙাকে অনেকেই ‘ইন্টেলিজেন্স’ মনে করে—
সেই সমাজে বেহেশতের লোভে ভোট দেবার ঘটনাটা খুবই সীমিত। আছে—কিন্তু ততটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর না।

বিএনপির আসল সংকট: নিজেদের ভেতরের দানব
মানুষ আজ জামায়াত নিয়ে যতটা সন্দিহান, তার চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ বিএনপির তৃণমূলের প্রতি।

গত এক বছরে মামলা বানিজ্য—যা BNP ক্ষমতার বাইরে থেকেও করতে শুরু করেছে—এটা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে।
টেম্পুস্ট্যান্ড থেকে বাসস্ট্যান্ড, এমনকি ময়লার গাড়ি—চাঁদাবাজির যে স্রোতধারা তৈরি হয়েছে, তা খুব অল্প সময়েই মানুষের চেহারা দেখে নিতে শিখিয়েছে।

লেখা বা বক্তৃতায় যতই তারা গণতন্ত্রের কথা বলুক, মাটির মানুষ দেখেছে—বিএনপির কিছু নেতা-মোড়লের মুখ পাল্টায় নাই। বরং সুযোগ পেলে আগের চেয়েও ভয়াবহ।
এটাই বিএনপির মূল ব্যথা।
এটাই তাদের পতনের ফাটল।
আর এখানেই জামায়াত নিরবে, ধীরে, শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে জায়গা তৈরি করছে।

জামায়াত কেন সুযোগ পাচ্ছে—বাস্তব ব্যাখ্যা
জামায়াতের রাজনৈতিক দোষ, ইতিহাসবিরোধী অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের আচরণ—এসব তো রয়েছেই।
কিন্তু এর মাঝেও সমাজে তাদের একটা ‍ইমেজ—যা নিয়ে অনেকেই মুখে না বললেও স্বীকার করে—সেটি হলো:

** রাস্তাঘাটে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি নেই,
** তৃণমূলে ‘দলের নামে’ জায়গা দখল–জমি দখল কম,
** ছাত্রশিবিরের ছেলেরা চাইলে অন্য দলে গিয়ে দোষ চাপিয়ে নেয়—নিজেদের নামে ‘সামাজিক বিশৃঙ্খলা’ তৈরি করে না,
** এদের সংগঠনভিত্তিক শৃঙ্খলা এখনও অনেক শক্ত।
এটা জামায়াতকে ‘শুদ্ধ’ বানায় না—দূরে দূরে না।
কিন্তু নোংরা রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ তুলনা করে:
“কে আমাকে সরাসরি ক্ষতি করছে?”
এখানেই বিএনপি পিছিয়ে গেছে।
এখানেই জামায়াত ‘সুযোগ’ পাচ্ছে।

তারেক রহমানের কী করা উচিত?
তারেক রহমানের ধর্মীয় ব্যাখ্যা ভালো—যুক্তিপূর্ণও।
কিন্তু রাজনীতি শুধু ধর্ম দিয়ে বিশ্লেষণ করলে হবে না। কারণ সমস্যা ধর্মে নয়—সমস্যা তার নিজের ঘরের ভেতরে।

জামায়াতের বেহেশত-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেয়ে তারেক রহমানের জরুরি কাজ—

নিজের দলের ভেতরের দানবদের থামানো।
মামলা বানিজ্য, তৃণমূল চাঁদাবাজি, অদ্ভুত রাহাজানি—এগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ।
এটাই তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুযোগ।


যদি তিনি এগুলো মোকাবিলা করতে পারেন—তাহলে বিএনপি আবার দাঁড়াতে পারে।
যদি না পারেন—তাহলে যত ধর্মীয় যুক্তিই তিনি দিক, মানুষ বলবে:

“নিজের দলের শয়তান সামলাতে পারেন না—অন্যের বেহেশত নিয়ে কথা বলছেন কেন?”

শেষ কথা
তারেক রহমান আজকে যেটা শুরু করেছেন—এটা ভালোর দিকেই ইঙ্গিত। কিন্তু এটিকে কার্যকর করতে হলে তাঁকে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আগে ধরতে হবে।
বেহেশতের বাণিজ্যে জামায়াতকে হারানোর চেয়ে
বিএনপির ভেতরের ইবলিশদের বের করে দেওয়াই তার সবচেয়ে জরুরি কাজ।

সেটা করতে পারলে—তাঁর জন্য রাজনীতিতে পথ এখনও খোলা।
না পারলে—বাকি সব বক্তব্য শুধু শব্দ হয়ে মিলিয়ে যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১১:৩০
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একাত্তরের ইতিহাস অন্য কিছুর সঙ্গে মিলবে না, সত্যিই?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮


স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, একাত্তর কখনো অন্য কোনো ইতিহাসের সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাধীনতা বলতে আপনি কি বুঝেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৩


২০২৩ সালের কথা। আমরা কয়েকজন মিলে অনলাইনে একজন ইংরেজি স্যারের কাছে কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। একদিন ক্লাস চলছে, স্যার হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ছোটবেলায় যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:১৪



বিশেষ দিন গুলো শাহেদ জামালের জন্য কষ্টকর।
যেমন ইদের দিন শাহেদ কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? তার তো কেউ নেই। এমনকি বন্ধুবান্ধবও নেই। তার এমন'ই পোড়া কপাল মেসেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই যে জীবন

লিখেছেন সামিয়া, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



এই যে আমার জীবনে কিছুই করা হলোনা, সেটা নিয়ে এখন আর খুব বড় কোনো আফসোস করি না। জীবন আসলে নিজের মতোই চলতে থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠি, রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এঁনারা কিসের আশায় দালালি করে যাচ্ছেন?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:০৫



১. ১৫ আগস্ট টাইপ কিছু বা ৭ নভেম্বর টাইপ কিছু না ঘটলে আওয়ামী লীগ সহসা আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। জুলাই-এর মত কিছুও বার বার হয় না। তাই ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×