somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি “হাস্যচ্ছলে” বলা কথা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটি “হাস্যচ্ছলে” বলা কথা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

মুহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশের কতটা ক্ষতি করেছেন, তার পূর্ণ মূল্যায়ন হয়তো এখনই সম্ভব নয়; সময়ই সে হিসাব দেবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের বিতর্কে না গিয়ে এখানে আমি তাঁর একটি আপাতদৃষ্টিতে “হাস্যচ্ছলে” বলা মন্তব্যের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই—যে মন্তব্যটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক এবং যার প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশকে বহন করতে হতে পারে।

তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ জালিয়াতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।”

এই বক্তব্যটি জনপরিসরে আলোচনার পরিবর্তে ফোটোকার্ড, রসিকতা ও মিমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অথচ বিষয়টি মোটেও তুচ্ছ নয়। কারণ একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির মুখ থেকে উচ্চারিত কোনো বক্তব্য ব্যক্তিগত মত হিসেবে বিবেচিত থাকে না; তা রাষ্ট্রের অবস্থান হিসেবেই আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিফলিত হয়।

ধরা যাক, বক্তব্যটি আংশিক সত্য। এমনকি কেউ যদি এটিকে পুরোপুরি সত্য বলেও মেনে নেন- তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়: একজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্বের পক্ষে নিজের দেশের জনগণ সম্পর্কে এমন সার্বজনিক মন্তব্য করা কতটা দায়িত্বশীল? এর দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে কি আমরা যথেষ্ট সচেতন?

এই বক্তব্যের পেছনে একটি সুপরিচিত মানসিক কাঠামো কাজ করে—যাকে সাধারণভাবে “এনজিও মানসিকতা” বলা যায়। দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশের অনেক এনজিও নেতা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহায়তা অর্জনের লক্ষ্যে নিজেদের দেশ ও জনগণকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন। এতে বিদেশি দাতাদের কাছে নিজেদের স্বচ্ছ, সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়- এমন একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। এটি অনুমান নয়; বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠিত একটি প্রবণতা।

কিন্তু সমস্যা হলো- মুহাম্মদ ইউনুস আর দশজন এনজিও নেতার মতো নন। তিনি একজন নোবেলজয়ী, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন মানুষ। তাঁর বক্তব্যের ওজন সাধারণ মন্তব্যের চেয়ে বহু গুণ বেশি।

এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। যখন এমন একজন ব্যক্তি বলেন বাংলাদেশের মানুষ জালিয়াতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দেশের সার্টিফিকেট, একাডেমিক নথি, ব্যবসায়িক দলিল কিংবা গবেষণাকর্ম- সবকিছুই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চায়, যারা স্কলারশিপ, গবেষণা বা আন্তর্জাতিক পেশাগত সম্পর্ক গড়তে চায়—তাদের জন্য এই বক্তব্য একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একটি শ্রেণি রয়েছে- বিশেষত কিছু শিক্ষিত প্রবাসী- যারা মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রায় অলৌকিক মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। তারা অনেক আগেই দেশ ছেড়েছেন; ফলে দেশের ভাবমূর্তি বা ভবিষ্যৎ তাদের ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তাদের কাছে জাতীয় সম্মানের চেয়ে ব্যক্তিগত অবস্থান ও পরিচয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে তারা প্রায়ই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন- যার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিচলিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু যারা এই দেশেই বাস করে, এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগোয়, এখানেই সন্তান বড় করে এবং ভবিষ্যৎ গড়ে- তাদের জন্য এ ধরনের মন্তব্যের মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ।

হাস্যচ্ছলে বলা একটি বাক্য কখনো কখনো একটি জাতির কাঁধে দীর্ঘদিনের বোঝা চাপিয়ে দেয়। সেই বাস্তবতা অনুধাবন করতে না পারাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৪
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মন বাগানে ফুটে আছে রঙবাহারী ফুল=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:০৫



তুমি তো আর করলে না যাচাই, মন আমার মন্দ কী ভালো,
প্রেম কথনে ভরালে না মন, ভালোবেসে করলে না মনঘর আলো;
মনের শাখে শাখে ঝুলে আছে মধু মঞ্জুরী ফুল,
কী মুগ্ধতা ছড়িয়ে পাপড়ির... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেলে আসা শৈশবের দিনগুলি!

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:২১


চট্টগ্রামে আমার ছোটবেলা কেটেছে নানুর বাড়িতে। চট্টগ্রাম হলো সুফি আর অলি-আউলিয়াদের পবিত্র ভূমি। বেরলভী মাওলানাদের জনপ্রিয়তা বেশি এখানে। ওয়াহাবি কিংবা সালাফিদের কালচার যখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম তেমন চোখে পড়েনি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

“Epstein “ বুঝতে পারেন ! কিন্তু রাজাকার,আলবদর,আলশামস আর আজকের Extension লালবদর বুঝতে পারেন না ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:০৮

মূলত এটি একটি ছবি ব্লগ। এক একটি ছবি একটি করে ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কস্টের অধ্যায়।

এপস্টেইন ফাইল দেখে আপনারা যারা বিচলিত, জেনে রাখুন ভয়াবহ আরেক বর্বরতা ঘটেছিলো ৭১এ এদেশেই, আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×