সকাল ৫টা বেজে ৫৫ মিনিটে আমার বড় ভাইয়া চোখ ডলতে ডলতে আমার রুমে এসে হাজির, বলল তুমি রেডি? গুড, আমি তোমাকে এয়ারপোর্ট ড্রপ করে দিচ্ছি। পৃথিবীতে যদি একটা দায়িত্ববান বড় ভাইদের লিস্ট করা হত তাহলে সন্দেহ নাই আমার বড় ভাইয়ের অবস্থান প্রথম দিকে থাকত। আল্লাহ বাচিয়েছে যে এই রকম কোন লিস্ট তৈরী করা হয় নাই। ব্যাপারটা অনেকটা "হাতি যদি জানত তার শরীরটা এত বড় তাহলে দুনিয়া ভেঙ্গে ফেলত" কন্সেপ্টের মত হত। জাস্ট ৬:১৫ মিনিটে আমরা স্টার্ট করলাম। লক্ষ্য করলাম সদাহাস্য শ্রদ্ধেয় বড় ভাবীর চেহারায় একটু দুখী দুখী ভাব। ভাবীকে বিদায় বলে যাত্রা শুরু। রমনা টু এয়ারপোর্ট গাড়ীতে আমি আর ভাইয়া পাশাপাশি বসে। অম্ল আর ক্ষার পাশাপাশি রাখলে বিক্রিয়া না হয়ে যাবে কই। শুরু হল বড় ভাইয়ার কিছু সাবধানী টিপস্ । এ ধরনরে টিপস আপনি বিটস্ ব্র্যান্ডের দামী হেডফোন দিয়ে ফুল ভিলউমে মমতাজের বুকটা ফাইটা যায় গান শুনলেও এড়াতে পারবেন না। যাই হোক যেহেতু এটা আমার প্রথমবার দেশের বাইরে যাওয়া না, তাই অল্পতে রক্ষা। ভাইয়াকেও বিদায় জানিয়ে আমি ঢুকে পড়লাম এয়ারপোর্টের ভিতরে। প্রায় বিশ বছর পর বিমান বাংলাদেশে উঠতে যাচ্ছি। একটু নস্টালজিক হয়ে গেলাম। ছোটবেলা আব্বার সাথে যশোর - ঢাকা - যশোর কতবার যে বিমান বাংলাদেশে ভ্রমণ করেছি তার ঠিক নাই। আমারা ভাইয়েরা গর্ব করে বলতাম, আমি সাতবার বিমানে উঠছি কেউ বলত আমি দশবার.... কেই বলত আমি ৫ বার উঠছি এবং ২ বার টিকেট কাটতে বিমান অফিস গিয়েছি।
বাংলাদেশী শ্রমিক ভাইদের বিশাল একটা টিম সারজাহ্ যাচ্ছে। তাদের কর্মকান্ড দেখেই বুঝা যাচ্ছে কত সহজ সরল এই ভাইয়েরা। যাই হোক ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করলাম। হাতে ঘন্টা খানেক সময় আছে। হঠাৎ এক প্রবাসী ভাই এসে বললেন, আমার ফরমটা পূরণ করে দেন তো। অনেকটা অর্ডার করলেন বললে ভুল হবে না। আমি অবশ্য রাগ করলাম না। তার পাসপোর্টটা চেয়ে ফরম পূরণ করতে লাগলাম। তিনি সারজাহ যাচ্ছেন। তাকে দেখে মনে হল - "আশাই মানুষকে বাচিয়ে রাখে"- এই লাইনটির ওপর ভরসা করেই মনে হয় বিদেশ যাচ্ছেন। ভদ্রলোকের সাথে আলাপের কিছু অংশ -
ভদ্রলোক: দেখছেন নি? এম আর ফি পাসফোট।
আমি: হু, দেখলাম।
ভদ্রলোক: পুনারো হাজার টাহা দিয়া সেরা দালাল ধইরা করাইছি। আর্জেন্ট, আমারডা আগে হইছে। জাদরেল দালাল। নাম সুলেমান, আমাগো এলাকার। বড় বালা পুলা।
আমি: এত সস্তায় কেমনে করাইলেন। সুলেমান সাহেব আসলেই কাজের।
ভদ্রলোক: সুলেমান আবার সাহেব হইল কবে? যাউক গা, সারজাহ্ যামু তাই বেশী টাহা লাগছে। মালোশিয়ান বা থাই ভিসা হইলে পাসফোট বানাইতে টাহা কম লাগে। টাহা কোনু ব্যাফার না। বুঝছুইননি।
আমি: হু। আপনার ফরম পূরণ শেষ। এই নেন আপনার দামী পাসপোর্ট। যত্ন করে রাখবেন।
ইতিমধ্যে ৫-৬ জন লোকের একটা লাইন হয়ে গেল। সবার ফরম পূরণ করে দিতে হবে। আমার অবস্থা অনেকটা- "হে আল্লাহ দড়ি ফেলো, দড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসি"। যা হোক কাউকে নিরাশ করলাম না। এবার প্রথম ভদ্রলোক যে কিনা সবার নেতা সে আমার কাছে আসল। হঠাৎ করে সে আমার টিশার্টের পকেটে হাত দিল এবং চলে গেল। আমি কিছু বুঝলাম না। একটু পর বুক পটেকে হাত দিয়ে দেখি ৭০০ টাকা। নিজেকে এত ছোট মনে হল তা লিখে বোঝানো যাবে না। ৭০০ টাকা হাতে নিয়ে নিজেকে ঘৃনা করতে ইচ্ছা হচ্ছে। হিসাবটা এবার মাথায় আসলো। সাতটা ফরম পূরন করে ৭০০ টাকা। ইনকাম খারাপ না। দৌড়াতে দৌড়াতে খুজতে থাকলাম এবং পেয়েও গেলাম। তাকে টাকাটা ফেরত দিলাম কিন্তু সে কিছুতেই নিবে না। বলে আফনেরে মিস্টি খাইতে খুশি হয়ে দিছি।নিজেকে সুলেমান সাহেব মনে হল। বললাম ওই মিয়াভাই বহুত হইছে, লন আপনার টাকা। সারজাহ্ হতে আসবার সময় দামী একটা পাসপোর্ট বানায় নিয়া আসবেন, যাতে বিবিসাহেবরে পরেরবার সাথে নিবার পারেন। বলে হাটা দিলাম, হাতে সময় কম। পেছন থেকে শুধু শুনতে পেলাম -"এই লুক দেহি ফুরাই বুকা..."।
ছোটবেলায় বিমান বালাদের দেখে মনে হত বড় হয়ে বিমানে জব করব। কিন্তু বিমান বাংলাদেশে উঠে হতবাক হয়ে গেলাম। কোথায় গেল সেই বিমান বালা। সময় বাড়বার সাথে সাথে বিমান বালারা সবাই আজ বিমান খালা হয়ে গেছেন। নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিলাম যে আমি বিমান বাংলাদেশে জব করি নাই। যাই হোক কলকাতা বিমান বন্দরে কেবল প্লেন থেকে নেমেছি আর পিছন থেকে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। ধুর আমি হেটে চলেছি। আবার ডাকলো। অবশেষে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা এসে বলল--
ভদ্রমহিলা: তুমি অমুেকর ছেলে না?
আমি: জ্বি।
ভদ্রমহিলা: আমি তোমার রোজী খালা। চিনসো?
আমি: ও, খালা। আম্মার কাছে আপনার কথা অনেক শুনছি। কেমন আছেন?
খালার সাখে মনে হয় জীবনে প্রথম কথা হল। খালারা ৪২ জনরে একটা টিম কলকাতা ঘুরতে এসেছেন। খালা প্রায় সবার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি যা না তার থেকে বেশী বেশী। এত গুলো মেয়ের সামনে কেউ প্রসংশা করলে আমি মানা করি কিভাবে? এরপর শুরু হল "খালা ম্যাজিক"। সবার সামনে খালা সুবর্ণ এক্সপ্রেস এর মত ননস্টপ বলেই চলল--
খালা: তুমিতো আমাদের চিন না। তোমার আম্মা আব্বা চিনে। তোমাকে অনেক ছোট দেখছি। তুমি তখনো জামা প্যান্ট পর না....( এই প্রথম মনে হল বিমানের খালা অনেক ভাল। বিশ্বাস করেন আমার এই অভ্যাস কখনো ছিল না, কসম)
আমি: খালা আমাকে মুম্বাইয়ের কানেক্টিংন ফ্লাইট ধরতে হবে। তাড়া আছে..
খালা: তুমি আমার ইমিগ্রেশন না কি বলে ওইটা পূরণ করে দাও। সবসময় তোমার খালু থাকে এবার সে আসে নাই।
আমি কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি ফরম পূরন করে দিলাম। খালার সাথের অনেকে দাড়িয়ে আছে, ফরম পূরন করে দিতে হবে। একজনতো তার ফরম পূরন করার সময় বলেই ফেলল, আমি কিন্তু ঘটকালি করি। তোমার জন্য একটা মেয়ে দেখব? ১৮ ডিগ্রীর ঠান্ডা এসির হাওয়া সারজার ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের লু হাওয়া মনে হতে লাগল। একে একে আটজন খালা এবং দুইজন আপুর ফরম পুরণ করে দিলাম। মোট দশটা ফরম পূরণ করলাম কোন ধন্যবাদ বা টিপস্ নাই? ইস্ প্রবাসী ভাইজানরা হলে দশ জনের জন্য নিশ্চিত ১০০০ টাকা পেতাম। নিজেকে আতেল মনে হল। এখন বুঝতে পারলাম সুলেমান সাহেব অনেক স্মার্ট মানুষ। পনের হাজার টাকা দিয়ে এক পাসপোর্ট করেন এবং কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন ১০০%। খালারা সবাই দেখি সেলফি তুলতে ব্যস্ত। অবশেষে নিজের ও খালার ব্যাগ টানা শুরু করলাম। ইন্টারন্যাশনাল অ্যারাইভাল হতে বের হলাম। খালাকে বিদায় বলে হাটা শুরু করলাম। হঠাৎ খালা পেছন থেকে ডাক দিল। বলল তোমার সাথে একটা ছবি তোলা হযনি। তারপর ছবি তুললাম খালার সাথে। শেষে খালা বললেন তোমারতো আপন খালা নাই। আমাকে তুমি আপন খালা ভাববে। আমার কোন ছেলেও নাই, এই বলে আমাকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখলেন। আমি আমার লাগেজের ট্রলি নিয়ে এগিয়ে চললাম ডমেস্টিকরে দিকে। পেছন ফেরে দেখি খালা সহ প্রায় সবাই দাড়িয়ে আছেন। খালার চোখে পানি। আমার উদ্দেশ্য মুম্বাইয়ের ফ্লাইট ধরা। কিন্তু কোন এক কারনে মনে হল আমার নিজের গলা ধরে গেছে, পা আর এগোচ্ছে না। নিজেকে খুব একা মনে হচ্ছে। এ এক অন্য রকম অনুভূতি। ইচ্ছা হচ্ছিল চিৎকার দিয়ে খালাকে ডাক দিয়ে বলি, হ্যা খালা তুমি আমার আপন খালা।
বেলা ২ টা বেজে ৫৫ মিনিট। জেট এয়ারওয়েজেরে বিমানটি মুম্বাই বিমানবন্দরে অবতরন করল। মুম্বাই এয়ারপোর্টে এক লোককে দেখছি এর ওর কাছে ছোটাছুটি করছে। কেউ তার কথা শুনছে না। একবার মনে হল ধুর যারটা সে বুঝুক... পরক্ষনেই মনে হল দেখি সে কি বলে। লোকটা লিখতে পড়তে পারে না। কোলকাতায় বাড়ী। সৌদিআরব যাচ্ছে শ্রমিক হিসাবে। দিক হারিয়ে ফেলেছে। তার বোর্ডিং কার্ড দেখে তাকে বললাম চিন্তার কিছু নাই। এখনো তিন ঘন্টা বাকি আছে। তাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দ্রুত এয়ারপোর্ট হতে বের হলাম। ছেলেটা আমার হাত ধরে কেদে ফেলল। আমি মোবাইলে গুগল ম্যাপ ও জিপিএস সার্ভিসটা চালু করলাম। একটি প্রিপেইড ট্যাক্সি নিয়ে সোজা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। মুম্বাইয়ের সুনসান ফাকা রাস্তায় সাই সাই করে আমার ট্যাক্সি এগিয়ে চলছে। আশেপাশের কোন দৃশ্যই আমাকে আকর্ষন করছে না। আমার ক্ষুদ্র মন ভেবে চলেছে অনেক জটিল বিষয় নিয়ে। আমরা কি পারি না এই সুলেমানদের হাত থেকে আমাদের প্রবাসী ভাইদের বাচাতে? আমরা কি পারি না আমাদের এই সহজ সরল ভাইদের জন্য দেশে কোন কর্মসংস্থান করতে? ভাবতে ভাবতে অবুঝ চোখ আবছা হয়ে আসছে। আমি এগিয়ে চলছি হোটেলের দিকে। যেখানে আছেন আমার প্রানপ্রিয় বাবা। আব্বাকে আমার সুস্থ করে তুলতেই হবে। আমার উপর যে অনেক বড় গুরু দায়িত্ব পড়েছে। আমি যে আমার আম্মাকে কথা দিয়ে এসেছি, আমাকে যে আব্বার সাথে সেলফি তুলে আম্মাকে দেখাতেই হবে।
শাকিল আহমেদ পারভেজ
হোটেল ইম্পেরিয়াল প্যালেস
ইস্ট আন্ধেরী, মুম্বাই
২৩/০২/২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



